English Version   

আমরা ভয়ের কাছে পরাস্ত হলে গণতন্ত্র হোঁচট খাবে

জানুয়ারি ১১, ২০১৭ ৮:২৮ অপরাহ্ণ

 

শীর্ষ খবর:

আট বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে শিকাগো নগর থেকে হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করেছিলেন বারাক হোসেন ওবামা। ২০১২ সালের নির্বাচনে পুনরায় বিজয়ী হওয়ার পর শিকাগোর লেকসাইড কনভেনশন সেন্টারসংলগ্ন ম্যাককর্মিক প্লেসে তিনি ভাষণ দিয়েছিলেন দেশবাসীর উদ্দেশ্যে। গত ১০ জানুয়ারি রাতে সে স্থানে দাঁড়িয়েই প্রায় ৪০ মিনিট ধরে আবেগঘন বিদায়ী ভাষণ দিলেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। তার আবেগময় বক্তব্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ২০ হাজারের বেশি আমেরিকান এবং টিভি’র সামনে দাঁড়ানো লোকজনকেও স্পর্শ করে। ভাষণে ওবামা তার আট বছরের শাসনামলের স্মৃতিচারণ করেন এবং অর্জিত সাফল্যগুলো তুলে ধরেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের আরো উন্নয়নে ভেদাভেদ ভুলে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ থাকার ও যেকোনো মূল্যে গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, আমরা ভয়ের কাছে পরাস্ত হলে গণতন্ত্র হোঁচট খাবে। কাজেই আমাদেরকে সব সময় সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। খবর সিএনএন, বিবিসি ও এনআরবি নিউজের।
তার এই বিদায়ী ভাষণ শোনার জন্য রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে যায়। ভাষণ শুনতে লোকজনকে বিভিন্ন কাবে টেলিভিশনের সামনে ভিড় করতে দেখা যায়। হাড় কাঁপানো শীত উপেক্ষা করে অনুষ্ঠানে জড়ো হওয়া মানুষদের অনেকেই বিনামূল্যের টিকিট হাজার ডলারের বিনিময়ে কালোবাজার থেকে সংগ্রহ করেছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার ফলে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের ভেঙে পড়া মনোবল চাঙ্গা করতে বক্তব্যের শুরুতেই ওবামা তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকার ও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু করা বক্তব্যে ওবামা বলেন, আমেরিকার উন্নয়ন-অগ্রগতি অব্যাহত রাখতে সবাইকে কাজ করতে হবে। দূরে ঠেলে দিতে হবে যাবতীয় হতাশা। ‘হ্যাঁ, আমরা পারি’ স্লোগানে শুরু আট বছরের ব্যবধানে আজ বলতে দ্বিধা নেই যে, আমরা পেরেছি। আমরা পারব। তবে সুদিনের পথে এগিয়ে যেতে হয়েছে দুই পা এগোনোর পর এক পা পিছিয়ে। তবুও আমরা থেমে থাকিনি। সবার সহায়তায় আমরা সব কাজে সফল হতে পেরেছি। সহায়তার এই দিগন্ত আরো প্রসারিত করতে নতুন প্রজন্মকে তৈরি করতে হবে।
ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে পাশে নিয়ে ওবামা বলেন, ‘ভালো ও কল্যাণকর যা কিছু অর্জিত হয়েছে তার কৃতিত্ব সবার। সবার আন্তরিক সহায়তার জন্যই ভালো কাজ করা সম্ভব হয়েছে। সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে কোনো কিছুই আটকে থাকে না, অনেক সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হয়। তার শাসনামলে অর্জিত সাফল্যের ফিরিস্তি দিতে গিয়ে ওবামা অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মন্দা মোকাবেলা, স্বাস্থ্যসেবার সংস্কার, ওসামা বিন লাদেনকে হত্যাসহ উগ্রবাদীদের দমন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় পদক্ষেপ, জ্বালানি সঙ্কট মোকাবেলায় সময়োপযোগী উদ্যোগ, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বাইরের শক্তির হামলা প্রতিরোধ, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করার কথা উল্লেখ করেন।
ভাষণের একপর্যায়ে ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা ও তার দুই মেয়ে মালিয়া ও শাশার নাম উচ্চারণ করেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন ওবামা। আবেগাপ্লুত হয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে চোখ মুছতে থাকেন তিনি। বার বার দুই ঠোঁট ভিজিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। তার সামনে দর্শক সারিতে বসা স্ত্রী মিশেল ওবামা। গভীর কৃতজ্ঞতা জানান তার প্রতি। তার পাশে বসে মেয়ে মালিয়া পিতার এমন দৃশ্য দেখে সেও কাঁদছে। তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন মিশেল ওবামা। তবে আরেক মেয়ে শাশা অনুষ্ঠানে ছিলেন না। ওবামা ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে স্মরণ করলেন ভাই বলে। পুরো অনুষ্ঠানজুড়েই মুহুর্মুহু করতালিতে ওবামাকে অনেকবার বক্তব্য থামিয়ে দিতে হয়।
ওবামা বলেন, আমরা সব কাজেই সফল হতে পারব, যদি আমাদের গণতন্ত্র সচল থাকে, যদি আমাদের মনোবল ভেঙে না যায়। জাতীয় স্বার্থে আমরা যদি দল-মতের ঊর্ধ্বে থাকতে পারি। আমাদের এই দেশের প্রতিষ্ঠাতা ও পূর্বসূরিরা শিখিয়েছেন, গণতন্ত্রের অভিযাত্রার স্বার্থে সমঝোতা করতে। সেটি জাতীয় স্বার্থে আমরা সব সময় করেছি।
ওবামা বলেন, গণতন্ত্র সঠিকভাবে এগিয়ে চলতে পারে সবার অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারলে। বিশেষ করে সবাইকে কর্মসংস্থানের পথে টানতে পারলে। আট বছর আগে আমি যখন দায়িত্ব নিই, সে সময় অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। টালমাটাল অবস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে টেনে তুলতে সবার সহায়তা আমাকে উৎসাহ দিয়েছে। তবে আমরা যেখানে পৌঁছার কথা, সেখানে এখনো যেতে পারিনি। আমাদের সে পথে ধাবিত হতে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে।
ওবামা বলেন. আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আইনকে সমুন্নত রাখতে হবে সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে চাকরিতে নিয়োগ, গৃহায়ন, শিক্ষা ও ফৌজদারি আদালত পরিচালনায় কোনো ধরনের বিমাতাসুলভ আচরণ প্রশ্রয় দেয়া চলবে না। আমাদের সংবিধানেও তা নিশ্চিত করা হয়েছে। নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নেও সব সময় একই আওয়াজ ধ্বনিত হয়। ওবামা বলেন, তবে শুধু আইন করে লাভ হয় না। সব জনগোষ্ঠীকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়। ওবামা বলেন, শরণার্থী, ইমিগ্রেশন, প্রত্যন্ত এলাকার গরিব বাসিন্দা, সমকামী ও মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গরা মনে করতে পারেন, তারা সব অধিকার পাচ্ছেন, বাস্তবে অনেক সময়েই তা ঘটে না। ওবামা বলেন, আমাদের চারপাশে কোনো-না-কোনো ধরনের বৈষম্য চলছে। তা হতে পারে স্কুল, কলেজ, ধর্মীয় উপাসনালয় কিংবা কর্মস্থল। সব কিছুকেই পরাস্ত করতে হবে মানবতার আলোকে।
ওবামা বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনাকালে উদ্যমী তরুণসমাজের অকুণ্ঠ সমর্থন ও রণাঙ্গনে আমেরিকান সেনাদের দেশাত্মবোধের যে ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করেছি, তা আমাকে অভিভূত করেছে। তিনি বলেন, এটি আমার পরম সৌভাগ্য যে, আপনাদের জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়েছি। তবে আমি থামব না। সব সময় আপনাদের পাশেই থাকব। সিটিজেন হিসেবে এ জাতির জন্য করণীয় সব কিছু করে যাবো। এখন আপনারা যারা যৌবনে কিংবা বয়সে প্রবীণ হলেও হৃদয়ে উদ্যম লালন করেন, আমি আপনাদের প্রতি আহ্বান রাখতে চাই, আট বছর আগে আপনারা যেভাবে আমায় কাছে রেখেছিলেন। আমি আপনাদের আত্মবিশ্বাসী হতে বলছি, পরিবর্তনের যে ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে, তার প্রতি আস্থা রেখে নিজে এবং এ জাতিকে পরিবর্তনে সোচ্চার থাকুন। ভাষণের শেষ পর্যায়ে এসে তার প্রশাসনের সব কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ জানান ওবামা।
তুমুল জনপ্রিয়তা নিয়ে ক্ষমতায় এলেও রক্ষণশীলদের তীব্র বিরোধিতার কারণে বারবার ওবামার সংস্কার পদক্ষেপ হোঁচট খেয়েছে। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমাজ ও রাজনীতি এখন সবচেয়ে বেশি বিভক্ত। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল ও উদারনৈতিক ঘরানার বিভেদ ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ওবামা তার বক্তব্যেও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে এখনো বর্ণবৈষম্য বিদ্যমান। মুসলিম আমেরিকানসহ যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার মার্কিন সংবিধানে সমুন্নত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
যৌবনে পদার্পণের সময় শিকাগোতে বসতি শুরু ওবামার। এরপর এই সিটির মানুষের সাথে মিশে গিয়ে তাদের অধিকার-মর্যাদা নিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন ওবামা। সিটির প্রতিনিধিত্ব করার পথ ধরে তিনি ইলিনয় থেকে সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন। সিনেট নির্বাচনের প্রাক্কালে ২০০৪ সালে বোস্টনে অনুষ্ঠিত ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জাতীয় সম্মেলনে ওবামাকে বক্তব্য প্রদানের সুযোগ দেয়া হয়। সে বক্তব্যেই তার রাজনৈতিক জীবনের পরিচিতি ঘটে জাতীয় পর্যায়ে। সেই যে শুরু, ওবামাকে আর থামতে হয়নি। সিনেটর নির্বাচিত হওয়ার পরই ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম আফ্রিকান-আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। শিকাগো তাকে সব কিছু দিয়েছে বলে বিদায়ী ভাষণের স্থান হোয়াইট হাউজের পরিবর্তে শিকাগোকে বেছে নিয়েছেন।
১৭৯৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটন শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরের যে পথ দেখিয়ে গেছেন, তা আজো বহমান। ক্ষমতা হস্তান্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কখনো ব্যত্যয় ঘটেনি এই আমেরিকায়। তারই ধারাবাহিকতায় প্রেসিডেন্ট ওবামাও ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন। ৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পপুলার ভোটে হিলারি কিনটন এগিয়ে থাকলেও ইলেকটোরাল ভোটে জয়ী হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরাজিত হিলারি কিনটনও ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে হাজির হবেন।

Print Friendly
 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1024 বার
 
 
শীর্ষ খবর/আ আ

 
 
 

ফেইসবুক লাইকবক্স

 
 
 
 
 
 
  • প্রতিশোধ

    বদরুন নাহার পলী: সালিশ – রশীদ কি হইছে…... ২০.০১.২০১৭, ২:০১:৩৩

 
  • ঝকঝকে চামচ…

    চামচ তো নিত্যদিনের সঙ্গী। প্রয়োজনের খাতিরে তো বটেই, শৌখিনতার প্রকাশেও কখনো কখনো ব্যবহৃত হয় এটি। নানান উপাদানের তৈরি চামচ আমরা ব্যবহার করছি…... ২২.০১.২০১৭, ৩:০৫:৫৭

 
 
 
 
 

ক্যালেন্ডার

 
 
 

জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:


কপিরাইট ©২০১০-২০১৬ সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত শীর্ষ খবর ডটকম

সম্পাদক মন্ডলীর সভাপতি ডাঃ আব্দুল আজিজ
সম্পাদক তোফায়েল আহমদ খান সায়েক

ফোন নাম্বার: +447536574441
ই-মেইল: info.skhobor@gmail.com
ই-মেইল: info@sylheteralap.com