English Version   

কফিনে শেষ পেরেকটা আপনিই ঠুকলেন?

এপ্রিল ১৯, ২০১৭ ৭:১১ অপরাহ্ণ

 

শীর্ষ খবর:

সাদিয়া নাসরিন:ভাস্কর্য, শোভাযাত্রার হিন্দুত্ব মুসলমানিত্ব, তিস্তা, দেশ বিক্রি এসব গোলমালের আড়ালে কিন্তু বিরাট একট ঘটনা ঘটে গেছে। যতোটা শোরগোল হওয়ার কথা ছিলো ততোটা না হলেও ঘটনা কিন্তু ঘটে গেছে। সেক্যুলার বাংলাদেশের কফিনে শেষ পেরেকটা ঠুকে দিয়ে কট্টর ইসলামপন্থী কওমি মাদ্রাসাকে নিঃশর্তভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়ে গেছে। এবং তা হয়েছে উদার গণতান্ত্রিক সেক্যুলার আওয়ামী লীগ সরকারের হাত ধরে।

গত মেয়াদে এই সরকার কওমি মাদ্রাসার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অংশগ্রহণে একটা নীতিমালা করতে গিয়ে ও তাদের হুমকির কারণে তা স্থগিত করেছে। তাদের প্রধান বক্তব্য সরকার ও প্রসাশনের কোন রকম নিয়ন্ত্রণ তারা মানবে না। এবং শেষ পর্যন্ত সেই কমিশন অকার্যকর রেখেই তারা সরকারকে বাধ্য করলো কওমি সনদের স্বীকৃতি দিতে; কিংবা সরকার এই গোষ্ঠীকে খুশি করতে নিজেই সক্রিয় হয়ে এই স্বীকৃতি দিলো।

দাওরায়ে হাদীস এখন থেকে স্নাতকোত্তর এর সম মান পাবে। তারা নিজেরাই নিজেদের মতো পরীক্ষা নেবে, পাশ করবে এবং একখানা মাস্টার ডিগ্রী তাদের মাথার রুমালের সাথে বেঁধে বাড়ি ফিরে যাবে। বাড়ি বাড়ি ওয়াজ করে, কোরবানীর চামড়া চেয়ে, মিলাদ পড়ে আর হুজুরদের জীবন নির্বাহ করতে হবে না।

তারা এখন থেকে সরকারি বেসরকারি চাকরি করার সুযোগ পাবেন। মূলধারার প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাবেন। তারপর কি হবে? দেশের ভিতরে সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্ত একটি গোঁড়া মৌলবাদী প্রশাসন এই শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ করবে! তারপর কি হবে? কল্পনা করতে থাকুন প্রিয় পাঠক, এই ফাঁকে আমরা একটু কওমির ভেতরে থেকে ঘুরে আসি।

কি পড়ানো হয়, এই কওমি শিক্ষা বোর্ডে? এই সব মাদ্রাসায় কাদের বই পড়ানো হয়? ইহলৌকিক জীবন ও বাস্তবতার সাথে তার সম্পর্ক কি? সেই বিষয়ে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। মুফতি মিযানুর রহমান সাইদ এর ভাষ্যমতে, ‘কওমি মাদ্রাসার আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠাতা আল্লাহর রাসুল এবং এর বাহ্যিক প্রতিষ্ঠাতা দারসে নিজামি। সুরা জুমার তিন নং আয়াতই এই মাদ্রাসার সিলেবাসের মূল উৎস।

মূলত আকিদা, ইবাদত, আখলাক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাষ্ট্র পরিচালনা, এই ছয়টি বিষয়ের উপর কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস প্রতিষ্ঠিত। দাওয়া শরীফ থেকে আধুনিক শিক্ষা বেশি দেওয়া সম্ভব হয় না। ফেকাহ বিভাগ থেকেও কম শিক্ষা দেওয়া হয়।

ব্যবসা, সুদবিহীন ব্যবসা বা সুদের সমস্যা এসব অর্থ ব্যবস্থার মধ্যে এসে যায়। এছাড়া ইসলামী রাজনীতি এবং রাষ্ট্রনীতি পড়ানো হয়। প্রাথমিক স্তরে সীমিত পরিসরে বাংলা, ইংরেজি, অংক, গণিত, ইতিহাস ও সমাজ পরিচিতি শিক্ষা দেয়া হয়। তবে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ খুব বেশী নেই।’

কওমিদের দাবী অনুযায়ী, একমাত্র কওমি মাদ্রাসাই সঠিক মুসলমান গড়ার কারখানা বা ‘জান্নাতের বাগিচা’, আর বাকি সকলেই বাতিলপন্থী। এখন এই ‘সঠিক মুসলমান গড়ার কারখানা’ যখন রাষ্ট্রিয় শিক্ষা সনদ এর সম মান পায় কোন ধরনের পরীক্ষা নিরিক্ষা ছাড়াই, তখন তাদের সেই দাবী ও নিশ্চয়ই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়!

যেখানে আলেয়া মাদ্রাসার শিক্ষার মান নিয়েই প্রশ্ন আছে, প্রশ্ন আছে তাদের শিক্ষা কারিকুলাম এবং জাতীয় চেতনাবোধ নিয়েও, সেখানে এরকম সংকীর্ণ কট্টর একমুখি শিক্ষাব্যবস্থাকে মূলধারার সম মানের স্বীকৃতি দিয়ে যে ক্ষতি বাংলাদেশের করা হলো, তা কি বিএনপি জামাতের শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণের যে এজেন্ডা তার চেয়ে ভিন্ন কিছু?

একটি মাল্টিডিসিপ্লিন্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী পাশ করে বের হলে তাদের মধ্যে কিছু ডাক্তার, কিছু ইঞ্জিনিয়ার, কিছু আইনজ্ঞ, কিছু অর্থনীতিবিদ, কিছু সমাজবিজ্ঞানী, কিছু পদার্থবিদ, কিছু রসায়নবিদ, কিছু গণিতজ্ঞ, কিছু প্রযুক্তিবিদ, কিছু গবেষক, কিছু আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদ, কিছু সমরবিদ, কিছু ইসলামিক বিশেষজ্ঞ সহ অন্যান্য ধর্মীয় বিশ্লেষকও তৈরী হয়। এঁরা সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখেন।

কিন্তু একটি কওমি মাদ্রাসা থেকে বছরে পাঁচ হাজার ছাত্র পাশ করে বের হলে তাদের সকলেই শুধু আরবী ও ইসলাম (কট্টর ইসলাম) বিষয়ে জানে। এমন কি কোরআনের যেসব আয়াতকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করতে হয়, যেসব আয়াত বিশ্লেষণের জন্য গণিতের জ্ঞান দরকার হয়, সৌরজগত নিয়ে চিন্তা ও গবেষণার দরকার হয়, সেই পর্যায়ের পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার ব্যবস্থাটুকুও কওমি শিক্ষাব্যবস্থায় নেই। কারণ, কওমি মাদ্রাসাগুলো গড়ে উঠেছে মূলত পরকালীন সাফল্য এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিকে সামনে রেখে কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফেকাহ বিজ্ঞানে বিশেষজ্ঞ তৈরির উদ্দেশে।

এরকম বাস্তবতায় কওমি মাদ্রাসার ধর্মান্ধ একচোখা মানুষগুলোকে আধুনিক শিক্ষায় সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারীদের সঙ্গে সমান যোগ্য হিসেবে বিবেচনা করে সম মান দেওয়াতে ইমিডিয়েট যে সমস্যা তৈরী হবে তা হলো, চাকরির বাজারে যোগ্যতার লড়াইয়ে টিকতে না পেরে এই কওমি সম্প্রদায় চাকরিতে কোটার দাবী নিয়ে হাজির হবে। সেই দাবীও সরকারকে মেনে নিতে হবে।

তারপর বিজ্ঞান, ইংরেজী, গণিত, অর্থনীতি, সমাজনীতি, আইন, প্রযুক্তি কিংবা চলমান শিক্ষা বর্জিত ‘জান্নাতের বাগিচা’ থেকে ফোটা ফুলগুলো এই সনদের জোরে আমাদের প্রশাসনে, প্রতিরক্ষায় ঢুকে পড়বে, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার দায়িত্ব নেবে এবং পুরো দেশটাই জান্নাতের বাগিচা বানাবে। তার নমুনা তো আমরা দেখেছি যখন এই কওমি-প্রধান আল্লামা শফি ও চরমোনাইর পীরের সুপারিশে জাতীয় পাঠ্যক্রম, পাঠ্যসূচী থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার সব পাঠ বাদ দিয়ে শিশুর মনস্তত্ত্বে ঢুকে গেছে ওড়নার পাঠ।

এই যে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাম্প্রদায়িকীকরণ করে এর রাজনৈতিক ফায়দা তোলার সংস্কৃতি, তার উৎস তো সেই ৭৫ পরবর্তি ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতির বিকাশের আড়ালে। যে রাজনীতির প্রধান কুশীলব এবং সুবিধাভোগী হয়ে জিয়াউর রহমান এবং তার গড়া রাজনৈতিক দল বিএনপি’ রাষ্ট্রক্ষমতায় নিয়ে এসেছিলো জামাতকে।

তারপর তো সুপরিকল্পিতভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় সাম্প্রদায়িকতার ক্যান্সার ছড়িয়ে এমন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়ানো হয় না, বঙ্গবন্ধুর নাম নিষিদ্ধ হয়ে যায়, ‘পাক হানাদার’ ‘রাজাকার’ ‘আলবদর’ এই শব্দ গুলো উচ্চারণ করা হয় না। সেই ধারাবাহিকতায় স্বৈরাচার এরশাদের আমলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণার পরই হঠাৎ করে বাংলা আরবী আর ইংরেজীর মিশেল দিয়ে এক অদ্ভুত রকমের ‘কিন্ডারগার্টেন’ বা কেজি স্কুল চালু হয়ে গেল ঝাঁকে ঝাঁকে।

সেসব স্কুলে সুন্দর ফুটফুটে সব বাচ্চারা অ্যাসেম্বলি করে না, জাতীয় সংগীত গায় না, হিন্দু-মুসলমানের বিভাজনে পড়ে যায় নজরুল রবীন্দ্রনাথ। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লার গল্প পড়ানো হয়, কিন্তু পড়ানো হয় না মাস্টার দা সূর্যসেন, প্রীতিলতা আর ক্ষুদিরামের বীরত্বের ইতিহাস।

অন্যরকম বর্ণপরিচয় ছাপানো হলো পাঠ্যপুস্তকে, ‘অ-তে অজু কর পাক হও/ আ-তে আলকোরান হাতে লও।’ আপাতত নিরীহ এই বর্ণ পরিচয় জনপ্রিয় হয়ে গেল নব্য ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ হওয়া এই বাংলাদেশে। ক্রমান্বয়ে ঈ-তে ঈগল রূপান্তরিত হলো ‘ঈদ’/ এ-তে একতারা হয়ে গেলো এবাদত। ম-তে মসজিদ, দ-তে দোয়া আর ত-এর তসবি ছড়িয়ে গেলো আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশের বর্ণমালায়। এই বর্ণমালা মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে জন্ম নেয়া সেক্যুলারিজমের কথা বলে না।

এই বর্ণমালা আর বাংলা আরবীর পাঁচমিশালি শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে আমাদের শিশুদের মনোজগতে সাম্প্রদায়িকতার ক্ষত থেকে জঙ্গিবাদ আর ধর্মীয় সন্ত্রাসের ক্যান্সার হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমণ ছড়াতে ছড়াতে এই ক্যান্সার যখন বাংলাদেশের মগজকে গ্রাস করে ফেলল, তখন এই আমরাই এই দেশটাকে তুলে দিয়েছিলাম তার হাতে।

ভেবেছিলাম, এখনো সব শেষ হয়নি। ধংসের উপকূলে দাঁড়িয়েও আমরা বিশ্বাস করেছিলাম একমাত্র তিনিই পারবেন বাংলাদেশের শরীর খুবলে খুবলে খাওয়া এই ক্যান্সার নির্মুল করতে। তাঁর সাথে ছিলো মহাকাব্যিক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জেগে ওঠা লক্ষ কোটি আলোর তারুণ্য।

কিন্তু না, এই পোড়া দেশে ভোটের রাজনীতিই সব আলো গ্রাস করে ফেলে। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের চেতনায় যে মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেছিলেন জিয়া, এরশাদ, সেই কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিলেন তিনিই, যাঁর হাতে ছিলো এই বাংলাদেশ। তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

অতঃপর সব আশা গিয়েছে ফুরায়ে। ধর্মান্ধ রাজনীতির বলি হয়ে গেছে শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠ্যপুস্তক আর আমাদের শিশুদের ভবিষ্যত। এখন কেবল পেছনে যাত্রা এক অনন্তের আঁধারে। এই আঁধার আর কাটার নয়।

সাদিয়া নাসরিন : কলাম লেখক।

Print Friendly
 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1046 বার
 
শীর্ষ খবর/আ আ

 

ফেইসবুক লাইকবক্স

 
 
 
 
 
 

সম্পাদকীয়

 
 
 
 
 
  • দ্রুত লম্বা চুল পেতে হেয়ার মাস্ক

    নানা উপায়ে যত্ন নেয়ার পরও চুল আশানুরূপ লম্বা হচ্ছে না- এমন অভিযোগ থাকে বেশিরভাগ নারীরই। নানা কারণেই চুলের বৃদ্ধি মন্থর হতে পারে।…... মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৫, ৯:৫৬:১৮

 
 
 
 
  • তোমার কাছে যাব

    সাবিকুর নাহার শোভা কেবল ইচ্ছে করে, তোমার কাছে…... রবিবার, এপ্রিল ৩০, ১১:৫৮:০৯

 

ক্যালেন্ডার

 
 
 

জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:


কপিরাইট ©২০১০-২০১৬ সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত শীর্ষ খবর ডটকম

প্রধান সম্পাদক : ডাঃ আব্দুল আজিজ
পরিচালক বৃন্দ: সামছু মিয়া,তোফায়েল আহমদ

ফোন নাম্বার: +447536574441
ই-মেইল: info.skhobor@gmail.com
ই-মেইল: info@sylheteralap.com