English Version   
আজ শনিবার,২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং, ৮ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ, ৩রা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী

আজকে

  • ৮ই আশ্বিন, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ
  • ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
  • ৩রা মুহাররম, ১৪৩৯ হিজরী
 

সোশ্যাল নেটওয়ার্ক

 

শীর্ষখবর ডটকম

রায় নিয়ে তোলপাড়, কিন্তু কেন?

Pub: বুধবার, আগস্ট ১৬, ২০১৭ ৬:৫৮ অপরাহ্ণ   |   Modi: বুধবার, আগস্ট ১৬, ২০১৭ ৬:৫৮ অপরাহ্ণ
 
 

শীর্ষ খবর

শুভ কিবরিয়া:সম্প্রতি সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। ৭৯৯ পৃষ্ঠার এই রায় প্রকাশিত হবার পর এই রায়ের অনেক বক্তব্য নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এই রায়ের ফলে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অভিশংসন প্রক্রিয়া সংসদের হাত থেকে চলে গেছে। সেটা সংসদ সদস্যদের উষ্মার একটা বড় কারণ। ২০০৪ সালের ৫ জানুয়ারি ১০ম সংসদ নির্বাচনে, যে নির্বাচন ছিল ভোটারবিহীন, একতরফা এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুল সংখ্যক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার নির্বাচন, সেই নির্বাচনে গঠিত সংসদে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সদস্যরাই বিপুল আকারে উপস্থিত। ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের কারণে উচ্চ আদালতের বিচারক অভিশংসন প্রক্রিয়া সংসদের হাত থেকে চলে যাবার ফলে সবচেয়ে ক্রুদ্ধ হবার কথা আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্যদের। বাস্তবেও তাই ঘটেছে। এই রায় নিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়াই সবচাইতে বিক্ষুব্ধ এবং কোথাও কোথাও সমস্ত নীতি-নৈতিকতাও লংঘন করেছে ।

 

অন্যদিকে, এই সংসদে যেহেতু বিএনপির কোনো উপস্থিতি নেই, এবং বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে, কাজেই আওয়ামী লীগ ক্রুদ্ধ হয়, এ রকম যে কোনো কার্যকারণে বিএনপির খুশি হবার নিয়ম। এবারও তাই ঘটেছে। এই রায়ের পর বিএনপিকে উল্লসিত দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, এই রায়ের বিষয়ে সরকার, আওয়ামী লীগ দল, আওয়ামী সমর্থিত বুদ্ধিজীবী-পেশাজীবী, আওয়ামী সমর্থক সবার কঠিনতর উষ্মার বড় কারণ হচ্ছে এই রায়ে অনেক বিষয় তাদের কাছে ‘অপ্রাসঙ্গিক’ এবং ‘আপত্তিকর’ মনে হয়েছে।
বিশেষত এক ব্যক্তির দ্বারা দেশ স্বাধীন হয় নাই এ রকম মন্তব্য রায়ে আছে বলে তাদের মনে হয়েছে। দেশ স্বাধীন করার ব্যাপারে ‘ফাউন্ডিং ফাদারস’দের ধারণার কথা এই রায়ে বলা হয়েছে। সেটাও আওয়ামী মনস্তত্ত্বের বর্তমান অংশকে দারুণতরভাবে আঘাত করেছে। রায়ে শাসকদের ‘আমিত্ব’- বিষয়েও ইঙ্গিত দেয়া আছে। সেটাও শাসকদের বেদীমূলকে আহত করেছে।

 

সে কারণেই শাসকদল আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ফ্রন্ট্রে, সরকারি ফ্রন্টে এবং আইনি ফ্রন্টে যুগপৎভাবে এই রায়ের বিরুদ্ধে এবং প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাদেরই নিয়োগ দেয়া প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে হঠাৎ কেন এই সাঁড়াশি আক্রমণ শুরু করল শাসক দল? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যে আগামী দিনের রাজনীতির একটা ইঙ্গিত আছে।
সেই ইঙ্গিত খোঁজার আগে আমরা খুঁজতে পারি সরকারের কাছে প্রধান বিচারপতি ক্রমশ অপছন্দের হয়ে উঠছেন কেন?

 

এক. ইতোপূর্বে সুপ্রিমকোর্ট চত্বরে স্থাপিত ভাস্কর্য অপসারণ নিয়ে ইসলামপন্থিদের মাঠে নামিয়ে প্রধান বিচারপতিকে বেকায়দায় ফেলার একটা চেষ্টা সরকারি তরফে দেখা গেছে। প্রধান বিচারপতি বুদ্ধিমত্তার সাথে কিছুটা আপস করে সেই বিপত্তি এড়িয়েছিলেন। সেই ঘটনার গভীরে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যায় প্রধান বিচারপতির কার্যক্রম ক্রমশ রুষ্ট করেছে সরকার ও তার বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে।

 

দুই. গত অর্ধদশকে ধরে উচ্চ আদালত বা বিচার বিভাগ তার স্বাধীনসত্তা ফিরে পাবার জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে এক ধরনের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিচার বিভাগকে কিছুটা গৌরবের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি সরকার যারা চালায় সেই বেসামরিক আমলাতন্ত্র, এমনকি সামরিক আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক আমলাতন্ত্রকেও দারুণতর নাখোশ করেছে ও করছে। সেটাও প্রধান বিচারপতির বিষয়ে রুষ্ট হবার একটা বড় কারণ।

 

তিন. এই সরকার যেসব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রেখেছে তার মধ্যে একটা বড় পথ জুডিশিয়াল অ্যাক্টিভিজম। বিচারালয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে প্রতিহত করার একটা স্বাচ্ছন্দ্যময় উপায় ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে এই সরকার। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, এয়োদশ সংশোধনী বাতিল করার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে দারুণতরভাবে কোণঠাসা করা গেছে। আদালতের রায়কে ব্যবহার করে বেগম জিয়াকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে উচ্ছেদ এবং সেই বাসা ধুলিস্যাৎ করা গেছে। মওদুদ আহমদকে বাসা থেকে উচ্ছেদ ও সেই বাসা ভাঙা সম্ভব হয়েছে।
আদালতের এই ব্যবহার ক্রমশ আদালতের শক্তিকেও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই আদালত ওয়ারেন্স অব প্রিসিডেন্ট পুনর্নির্ধারণ করে দিয়েছে। জেলা জজদের সচিবের মর্যাদা দিয়েছে। এই আদালত বেসামরিক আমলাতন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনকে বেআইনি বলেছে। যদিও উচ্চ আদালতে সেই রায়ের নিষ্পত্তি অপেক্ষমান। এই আদালত নিম্ন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা ও চাকরিবিধিমালা নির্ধারণের জন্য সরকারকে দৌড়ের উপর রেখেছে।

 

আদালতের এই ক্ষমতায়ন যতক্ষণ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করেছে ততক্ষণ সরকারের কাছে তা ভালো ঠাওর হয়েছে। কিন্তু যখনই তা বর্তমান সরকারের শাসন ইচ্ছায় বাধা ঠেকেছে তখনই আদালতের এই ক্ষমতায়নকে সরকার শত্রুভাবাপন্ন হিসেবে নিয়েছে।
চার. সরকারের ভেতরের যে সরকার থাকে, তার নাম আমলাতন্ত্র। বিশেষত সিভিল সার্ভিসের আমলাসকল বিচার বিভাগের এই ক্ষমতায়নকে থ্রেট ভাবা শুরু করেছে। নির্বাহী বিভাগের এই ভাবনা সরকারি দলের থিঙ্ক ট্যাঙ্ককেও ভাবিয়ে তুলেছে। আর তাই এ বিষয়ক সমস্ত দুশ্চিন্তার আধার ও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে প্রধান বিচারপতিকে পথের কাঁটা হিসেবে ভাবা হচ্ছে । ষোড়শ সংশোধনীর আপীল বিভাগের রায় উপলক্ষ মাত্র। এটা না হলেও অন্য কোন উপলক্ষ ধরে হলেও প্রধান বিচারপতিকে টার্গেট করতো সরকার।

 

০২.
বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হয়ে ওঠেনি। সরকার বদলের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখানে সুস্থির নয়। জন্মলগ্ন থেকে সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশ সঠিক পথ মেনে চলেছে এটা বলা যাবে না। এখানে আদালতের সমর্থন পেয়ে সামরিক শাসন দুর্বল গণতন্ত্রকে উপড়ে ফেলেছে। দুর্বল গণতন্ত্র কখনো কখনো জনগণের ওপর ভরসা না করে নিজেই স্বৈরাচারি হয়ে উঠতে চেয়েছে।
এখানে গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিকতার অভাবে গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে সামরিক শাসনও জায়গা পেয়েছে। সব শাসকের কালেই সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র তো বটেই এখানকার আদালতও সেই শাসকের অবৈধ ইচ্ছেকে বৈধতা দিতে কসুর করেনি। মানুষের মনে আকাঙ্ক্ষা আছে প্রকৃত গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠা পাক, কিন্তু এখানকার রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো তার জন্য যোগ্য হয়ে ওঠেনি। ব্যক্তি পুজা আর স্বার্থপরতা এখানে সমার্থক হয়ে ওঠায় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রনৈতিক প্রতিষ্ঠানও দাঁড়ায়নি।
এই দুর্বলতার মধ্যেই ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির অস্বাভাবিক নির্বাচন হয়েছে। ঘটেছে দেশে অনেক যুগান্তকারি ঘটনা। যার নেতৃত্ব দিয়েছে অনেকক্ষেত্রে দেশের বিচার বিভাগ। আগামী দিনে বিচার বিভাগের স্বাধীন বিকাশ এইধারায় এগিয়ে গেলে আমাদের শাসন বিভাগের সাথে তার সংঘাত অনিবার্য। সেই আতঙ্কও সরকারকে পেয়ে বসেছে।

 

০৩.
সরকার যেভাবে নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় বসেছে তাতে এই সরকারকে জনগণের শক্তির সরকার বলা যায় না। এক ধরনের গায়ের জোরের প্রবণতা এই সরকারের অভ্যন্তরে ও অন্তরে বিরাজমান। ব্যালটের শক্তিতে সরকার ভরসা পায়নি ২০১৪ সালে। আগামী দিনেও জনগণের ব্যালটে সরকারের ভরসা কম। এই মনস্তত্ত্বে বসে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে পরিকাঠামোগত পরিবর্তন আনতে চেয়েছে ও চাইছে।
রাজনীতির বইয়ের পাতা বদলে ফেলে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে ‘উন্নয়নের মূলমন্ত্র, শেখ হাসিনার গণতন্ত্র’। এই চিন্তা ও চেষ্টার মধ্যে সত্যিকার গণতান্ত্রিক চেতনা যতটা না তার চাইতে ‘শক্তি’ নির্ভরতা অনেক বেশি। এই ‘শক্তি’র ভিত্তি নানারূপ। কখনো প্রশাসন, কখনো বন্ধু রাষ্ট্র, কখনো ‘উচ্চ আদালত’। তাই সরকারকে সব সময় একটা টেনশনের মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠায় খুব একটা কামিয়াব হতে পেরেছে তা বলা যাবে না। দ্রব্যমূল্য, জ্বালানিমূল্য, সড়ক পথ, পরিবহন খাত, সর্বত্র সরকারের সুশাসন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কাজেই সরকার কিছুটা সন্ত্রস্ত আদালতের দিকে চেয়ে। সম্প্রতি বাসাবাড়িতে জ্বালানি গ্যাসের মূল্য কমাতে বাধ্য হয়েছে সরকার আদালতের নির্দেশে। এগুলো লক্ষণমাত্র।

 

কিন্তু আগামী দিনে রাজনীতি যে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে, সেখানে সরকার নিয়ে যারা অসন্তুষ্ট, সর্বত্র একটা বড় ঐক্য গড়ে দিতে পারে আদালতের যে কোনো নির্দেশনা। যেমন ষোড়শ সংশোধনীর রায়ের পর আদালতের পক্ষ নিয়েছে সরকার বিরোধী সমগ্র অংশ। এই ঘটনা সরকারের জন্য স্বস্তির তো নয়ই বরং রীতিমত আশঙ্কার। সরকারের অস্থির ও বিচলিত আচরণ তার প্রমাণ।
শুভ কিবরিয়া : সাংবাদিক, কলামিস্ট; নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক।
kibria34@ gmail .com

Print Friendly, PDF & Email
 
 

শীর্ষ খবর/আ আ

 
 
সংবাদটি পড়া হয়েছে 1147 বার
 
 

সর্বশেষ সংবাদ

 
 

সর্বাধিক পঠিত

 
 
 
 

জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:


কপিরাইট ©২০১০-২০১৬ সকল সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত শীর্ষ খবর ডটকম

প্রধান সম্পাদক : ডাঃ আব্দুল আজিজ

পরিচালক বৃন্দ: সামছু মিয়া,
মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ফোন নাম্বার: +447536574441
ই-মেইল: info.skhobor@gmail.com