ঋণ ক্যাটাগরিতে বাড়ছে লে অফের অসন্তোষ

Pub: Tuesday, April 28, 2020 2:26 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশ ব্যাংক শিল্প কারখানারগুলোর সহজ শর্তে ঋণ সংক্রান্ত যে নীতিমালা জারি করেছে তাতে ‘ক্যাটাগরি’ জটিলতা তৈরি হয়েছে। জারি করা নীতিমালায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন ‘এ’ ক্যাটাগরির বিদেশি এবং ‘বি’ ক্যাটাগরির দেশি ও বিদেশি যৌথ বিনিয়োগকারী শিল্প কারখানার মালিকরা। ৮টি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল, অর্থনৈতিক অঞ্চল, হাই টেক পার্কের দুই’ ক্যাটাগরির দেড় শতাধিক শিল্প কারখানা সমূহ ‘লে-অফ’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হওয়ার প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আর এর সুযোগ নিতে পারে বিরোধীদল। পর্যবেক্ষক মহল এমনটাই বলছেন|

সূত্র জানায়, দেশে প্রায় ৪ হাজার শিল্প কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৮টি রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইজেড)ও হাইটেক পার্কে এ, বি ও সি  ক্যাটাগরি ৪৭৪টি পোশাক ও সংশ্লিষ্ট কারখানা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং  প্রবিধি ও নীতি বিভাগ গত ১৫ এপ্রিল একটি নীতিমালা সিডিউল ব্যাংক সমূহে প্রেরণ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরি কারখানা সমূহ এ করোনা পরিস্থিতিতে সরকারের ঘোষিত সহজ শর্তের ঋণ পাবে না। শুধু মাত্র ‘সি’ ক্যাটাগরি দেশি বিনিয়োগকারিরা এ সুবিদা পাবে। এতে ক্ষুদ্ধ হয়েছে ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির বিনিয়োগকারিরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ‘এ’ ক্যাটাগরির ফরেন এবং ‘বি’ ক্যাটাগরির জয়েন্ট ভেন্সার (দেশি বিদেশি)বিনিয়োগকারি অনেকে কারখানা ‘লে-অফ’ ঘোষণার আবেদন করেছে। অনেকে চিন্তা-ভাবনা ও পরিস্থিতি  পর্যবেক্ষণ করছেন। তারা বলছেন, এটি বৈষম্যমূলক। তাদের কারখানা গুলোতে সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করেন। সুযোগ-সুবিধাও বেশি পান শ্রমিকরা। কোটি কোটি ডলারের কার্যাদেশ বাতিল হয়ে গেছে। সরকার তাদের সহজ শর্তের ঋণ না দিলে লোকসান দিয়ে কারখানা চালু রাখা সম্ভব নয়। সে কারণে শ্রম আইন মেনে তারা ‘লে-অফ’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শ্রমিকদের ‘লে-অফ’ সুবিধা পাবেন।

নভেল করোনা ভাইরাস প্রার্দুভাবের কারণে সচল রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানের জন্য সহজ শর্তে ঋণ বা বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানে বাংলাদেশ ব্যাংক যে প্যাকেজ ঘোষণা করে তাতে বলা হয়, এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড), ইকোনমিক জোন (ইজেড)এবং হাই টেক পার্ক এর শুধু ‘সি’ টাইপ শিল্প প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন ভাতা প্রদান করা হবে।আবেদনের সময় সীমা ২৬ এপ্রিল শেষ হয়েছে। তবে ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির কারখানা সমূহও আবেদনপত্র জমা দিয়েছে বলে সূত্র জানায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা এই সুবিধা পাবে না। পুরো প্যাকেজটি ব্যাংক খাত নির্ভর করা হয়েছে। তারল্য বাড়াতে সিআরআর ও এসএলআর ছাড় দিয়েছে। ব্যাংকের কর্মকর্তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে না। এটি এ নীতিমালায় প্রমাণিত হয়েছে। অনেক বিষয় খোলাসা করা হয়নি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক রাজীব দাশ সুজয় ব্রেকিংনিউজকে জানান, বিকেএমই ও বিজিএমইএ সদস্যভুক্ত যেসব কারখানা রয়েছে তারা যদি শ্রমিকদের বেতন পরিশোধে সরকারের কাছে ঋণের আবেদন করে তারা সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা পাবে। তিনি বলেন, পোশাক কারখানাগুলো ব্যাংক থেকে স্বাভাবিক সময়ে ১১ থেকে ১২ শতাংশ সুদে  ঋণ নিচ্ছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এখন ব্যাংক থেকে ২ শতাংশ সুদে এ ঋণ দিবে সরকার। আর সময়টা একটু বেশি হবে এইটুকু পার্থক্য।

রাজীব দাশ সুজয় আরো বলেন, এই প্যাকেজ শুধু ইপিজেড বা ইজেড এর জন্য না, এটা সবাই পাবে। তবে এখন শ্রমিকরা বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সকলের একাউন্ট খোলাও সম্ভব নয়। এই কারণে অনেক ফ্যাক্টিরি নাও পেতে পারে। শুধু ঋণ খেলাপিরা এই প্যাকেজের আওতায় আসবে না।

লে-অফ বিষয়ে রাজীব দাশ সুজয় বলেন, লে-অফ ওভাবে ঘোষণা করলে লে-অফ হয় না। লে-অফ ঘোষণা করলে প্রথমে শ্রম অধিদপ্তরকে জানাতে হবে। তারা সার্টিফাই করলেই লে-অফ হবে। এর আগে নয়। তবে কেউ যদি প্রকৌশলগত কারণে কারখানা সচল রাখতে না পারে, বা কর্মচারীদের বেতন দিতে না পারে তাহলে কারখানা লে-অফ করতে আইনে কোন বাধা নেই। সেক্ষেত্রে শ্রমিকের বেতন পরিশোধ করতে হবে শ্রম আইনানুয়ায়ী। 

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) পরিচালক অঞ্জন শেখর দাশ ব্রেকিংনিউজকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সার্কুলারটা প্রথম দিকে ছিলো প্রণোদনা। কিন্তু এখন প্রতিষ্ঠানের মালিকরা যেন শ্রমিকদের বেতন দিতে পারে তাই সহজ শর্তে ২ শতাংশ হারে ঋণ দিবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তিনি বলেন,  প্রথমে মনে করা হয়েছিল করছি এটা সব শ্রমিকরা পাবে। পরবর্তীতে জানা গেল মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে যাদের একাউন্ট আছে ওই সমস্ত কারখানা শ্রমিকরাই পাবে।

গণ লে-অফ বিষয়ে তিনি বলেন, কারখানাগুলো কাঁচা মাল নেই।বাতিল হয়ে কোটি কোটি ডলারের কার্যাদেশ। নতুন কার্যাদেশও নেই। সরকার থেকেও সহযোগিতা না পেলে লে-অফ করতে বাধ্য কারখানা মালিকরা।

এদিকে কার্যাদেশ না থাকা, শিপমেন্ট না হওয়াসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে দেশি-বিদেশি চট্টগ্রামের দুইটি ইপিজেডের ৬৯টি কারখানা মালিকরা করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে চলমান লকডাউনের মধ্যে অফ ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছে।তারা লে-অফের জন্য ইপিজেড কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে। তৈরি পোশাক ছাড়াও জুতা, তাঁবু, ফেব্রিক্স, ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য তৈরির কারখানাও রয়েছে।

উল্লেখ, বাংলাদেশের শ্রম আইনের ধারা ২(৫৮) অনুযায়ী, লে-অফ হল কোনো কারখানায় কাঁচা মালের স্বল্পতা, অথবা মাল জমিয়া থাকা অথবা যন্ত্রপাতি বা কল-কব্জা বিকল বা ভেঙে যাওয়ার কারণে কোন শ্রমিককে কাজ দিতে মালিকের ব্যর্থতা, অস্বীকৃতি বা অক্ষমতা।

শ্রম আইন অনুযায়ী, লে-অফ চলাকালে প্রথম ৪৫ দিনের ক্ষেত্রে পূর্ণকালীন শ্রমিকের মোট মূল মজুরি, মহার্ঘ ভাতার অর্ধেক দিতে হয় মালিককে। পরের ১৫ দিনের জন্য শ্রমিক পাবে ২৫ শতাংশ মূল বেতন এবং বাড়ি ভাড়া।

বেপজার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) নাজমা বিনতে আলমগীর বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে এখন অনেক কারখানা বন্ধ। তাদের কাঁচামাল নেই। অনেক অর্ডার বাতিল হয়েছে। সব মিলিয়ে কারখানার মালিকরা বিভিন্ন মেয়াদে লে-অফে যাচ্ছে। তবে লে-অফে গেলেও নিয়ম অনুযায়ী শ্রমিকদের সকল পাওনা পরিশোধ করতে হবে বলেন নাজমা বিনতে আলমগীর।

চট্টগ্রাম ইপিজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুরশিদ আলম জানিয়েছেন সিপিজেডের ৪৬টি কারখানার মালিকরা লে অফের জন্য অনুমোদন চেয়েছে। কারখানাগুলোতে করোনাভাইরাসের কারণে কাজ না থাকা,অর্ডার বাতিল হয়ে যাওয়ায় সবকিছু মিলিয়ে কারখানার মালিকরা লে-অফের আবেদন করছে। নিজেদের টিকিয়ে রাখতে  কারখানা কর্তৃপক্ষ চাইলে লে অফ ঘোষণা করতে পারে। সে হিসেবে তারা আইন মেনেই আবেদন করেছে। 

কর্ণফুলী ইপিজেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউদ্দিন বিন মেজবাহ বলেন, বিভিন্ন শিল্প কারখানার মালিকরা লে-অফের জন্য গত ৫ এপ্রিল থেকে আবেদন জমা   করেছে।কর্ণফুলী ইপিজেডের ২৩টি কারখানা বিভিন্ন মেয়াদে লে-অফের জন্য আবেদন করেছে। আগামীতে এর সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে জানান তিনি।

শিল্প কারখানার মালিকরা, চলতি বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সব ধরনের ঋণের ওপর সুদ আরোপ না করার পাশাপাশি ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটগরির শিল্প কারখানাগুলোকে সহজ শর্তে ঋণ প্যাকেজের আওতায় নেয়ার দাবি জানিয়েছেন। তা না হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারিরা তাদের কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। এক্ষেত্রে বেকার হয়ে যাবে এসব প্রতিষ্ঠানের লাখ লাখ শ্রমিক।নেমে আসবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। একই সঙ্গে দেখা দেবে সামাজিক বিপর্যয়ও।

Hits: 1


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ