করোনার উপর ‘আম্ফান’: কী করে সামাল দেবে বাংলাদেশ?

Pub: Sunday, May 17, 2020 8:17 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন দক্ষিণ আন্দামান সাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি নিম্নচাপ থেকে গভীর নিম্নচাপে রূপ নিয়ে এখন ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফানে’ পরিণত হয়েছে। আবহাওয়াবিদরা এটিকে প্রবল বলছে। বাংলাদেশের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় আম্ফান এখন বাংলাদেশ থেকে ১২০০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থান করছে। আগামী ৪৮ কিংবা ৭২ ঘণ্টা সম্ভাব্য সময়ের মধ্যে ঘূর্ণিঝড়টি প্রবল শক্তি নিয়ে বাংলাদেশে আঘাত হানবে। আপাতভাবে ঘূর্ণিঝড়টিকে ‘প্রবল’ বলা হলেও আঘাত হানার সময় এটি ‘অতি প্রবল’ সাইক্লোনে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন আবহাওয়াবিদরা। 

এমন এক সময়ে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে যখন বৈশ্বিক মহামারি নভেল করোনা ভাইরাসে গোটা দেশ নাজেহাল। বিশ্বের অন্যান্য দেশের বাস্তবতায় বাংলাদেশ সরকারও পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। করোনার এই কঠিন সময়ে ধেয়ে আম্ফানের আঘাতে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা- ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী তা কী করে সামলে উঠবে বাংলাদেশ?  

এ নিয়ে সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় এরইমধ্যে পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা নিতে শুরু করেছে। সাধারণত ঘূর্ণিঝড়ের হাত থেকে প্রাণহানি ঠেকানোর একটি অন্যতম উপায় হলো ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনা। কিন্তু করোনার বিস্তার ঠেকাতে যে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে দিনরাত কাজ করছে সরকার সেখানে মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে আনলে সামাজিক দূরত্ব ব্যাহত হবে এবং করোনা সংক্রমণ ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদফতরের সাবেক মহাপরিচালক মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ।

তিনি বলেন, ‘করোনার এই সময়ে ঘূর্ণিঝড়ের ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়া নারীদের জন্য বেশি কঠিন। নারীদের গাদাগাদি করে থাকাটা কঠিন বিষয়। আর কোনও সাইক্লোন সেন্টারে আশ্রয় পাবেও সেটাও চ্যালেঞ্জিং। মানুষ এবং গবাদি পশুর মৃত্যুর হার কমাতে গেলে সাইক্লোন সেন্টারের বিকল্প নেই। আর সাইক্লোন সেন্টারে আসায় যদি সংক্রমণ ছড়ায় তবে ওই এলাকার অবস্থায় ভয়াবহ হবে।’

‘করোনা সংকটকালীন সময়ে সারা দেশে অসহায়, খেটে খাওয়া ও নিম্নবিত্ত শ্রেণির মানুষের মাঝে নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ করছে সরকার। কিন্তু এর উপর যদি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে তবে ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী মানুষের পুনর্বাসন ও পর্যাপ্ত সরবরাহও চ্যালেঞ্জিং হতে পারে’- যোগ করেন তিনি।

মোহাম্মদ আবদুল ওয়াজেদ বলেন, ‘এছাড়াও ঘূর্ণিঝড় এমন একটি সময়ে আঘাত হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে যখন একদিকে করোনা ভাইরাস মহামারি অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেটের শেষ মুহূর্ত চলছে। ফলে সরকারের হাতে যে মজুদ কিংবা গচ্ছিত অর্থ আছে তা সামান্য পরিমাণ মানুষকে দেয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যথায় নতুন বাজেটের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’

গেল বছর ‘ফণী’র তাণ্ডবে তছনছ হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ। এবার ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে? এ বিষয়ে ধারণা দিতে আবহাওয়া অধিদফতরের পরিচালক সামছুদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘ঘূর্ণিঝড় আম্ফান অতি প্রবল শক্তি নিয়ে আঘাত হানার আশঙ্কা রয়েছে। পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, এ ধরনের ঝড়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যথেষ্ট হয়।’

দেশের কোন কোন জেলায় ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানবে সে বিষয়ে কোনও ধারণা না দিলেও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অর্থাৎ সাতক্ষীরা ও খুলনা অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়টি আঘাত হানতে পারে বলে প্রাপ্ত তথ্যের উল্লেখ করে জানান তিনি। 

সাধারণত ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় এর বাতাসের গতিবেগ যদি ঘণ্টায় ১৭০ কিলোমিটার কিংবা তারও বেশি থাকে তবে সেটাবে বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় বলা হয়। সেক্ষেত্রে স্থানীয় লোকদের দ্রুত সাইক্লোন সেন্টারে সরিয়ে নেয়া হয়। ঘূর্ণিঝড়ে মূলত দুই ধরনের ক্ষতি হয়। প্রথমত প্রাণহানি আর দ্বিতীয় ঘরবাড়ি ও গবাদি পশুর ক্ষতি। 

এরইমধ্যে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়া আম্ফানে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার অতিক্রম করেছে। রবিবার বিকেল পর্যন্ত দেশের সকল সমুদ্রবন্দরে ৪ নম্বর স্থানীয় হুঁশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলে আঘাত হানার সময় ঘূর্ণিঝড়টির বাতাসের গতিবেগ ১৬০-৭০ কিলোমিটারের উপরে থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন সামছুদ্দিন আহমেদ।

ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোকাবিলার প্রস্তুতি হিসেবে এরইমধ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, উপকূলীয় জেলাসমূহের জেলা প্রশাসক, রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ স্কাউটস ও সিপিবি-এর মধ্যে বৈঠক হয়েছে বলে জানিয়েছেন ত্রাণ ও দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল।

তিনি জানিয়েছেন, প্রথমত সাইক্লোন শেল্টারগুলো প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে এবার সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হবে। এছাড়া সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিতে কাদেরকে কোন আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হবে সেটিও তালিকা তৈরি হচ্ছে। ৪ নম্বর হুঁশিয়ারি সংকেত দেখানোর পর মাঠ পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবীরা মানুষকে সচেতন করতে কাজ শুরু করেছে। দুর্যোগকালীন মাঠ পর্যায়ে কাজ করে- বাংলাদেশে এরকম প্রায় ৫৬ হাজার স্বেচ্ছাসেবী রয়েছেন। 

করোনার এই দুঃসময়ে ঘূর্ণিঝড়ের কবল থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে সাইক্লোন শেল্টারে যারাই আসবে তাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাসহ স্যানিটাইজেশনের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

উল্লেখ্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাংলাদেশে অতীতের তুলনায় বর্তমানে প্রাণহানির সংখ্যা কিছুটা কমেছে। ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোনে প্রায় ৫ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। ২০০৭ সালে সিডরের আঘাতে ৩ হাজার ৪০৬ জনের প্রাণহানি হয়। এরপরেও আরও বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় হয়েছে দেশে। এর মধ্যে ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার আঘাতে ১৯০ জন ও ২০১৩ সালে ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের আঘাতে ১৮ জনের প্রাণহানি হয়। সবশেষ গেল বছর মে মাসের শুরুর দিকে ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডবেও দেশে বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হয়। 

Hits: 32


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ