কৃতজ্ঞতা দেখাতে মোদীকে আমন্ত্রণ: আসিফ নজরুল

Pub: Sunday, March 8, 2020 2:01 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন নিয়ে ডয়চে ভেলের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল৷ আয়োজনটি কীভাবে আরো সুন্দর করা যায়, তা নিয়ে দিয়েছেন পরামর্শও৷

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জাতির জনক৷ তাঁর জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজনে দল-মত নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ থাকার কথা থাকলেও তেমনটা দেখা যাচ্ছে না৷ এটা কেন হচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?

আসিফ নজরুল: বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির সবার, বাংলাদেশের প্রতিটা মানুষের৷ আমাদের স্বাধীনতার পেছনে সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগ বা সবচেয়ে বড় অবদান বঙ্গবন্ধুর৷ এটা একমাত্র চরম মিথ্যাবাদী বা চরম অজ্ঞ লোক ছাড়া সবাই স্বীকার করবে৷ কিন্তু সমস্যা হলো, আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে এমনভাবে ব্র্যান্ডিং করে, এমনভাবে ব্যবহার করে যে, মনে হয় বঙ্গবন্ধু তাদের সম্পত্তি৷

বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সব মানুষের নেতা, তিনি পুরো বাংলাদেশের সব মানুষের হৃদয়ে আছেন৷ কিন্তু আওয়ামী লীগ কখনোই তাঁকে সেভাবে উপস্থাপন করে না৷ বরং কোনো এলাকার সবচেয়ে অত্যাচারী লোক বা সবচেয়ে ঘৃণিত লোককে আওয়ামী লীগ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন দেয় এবং সে তাঁর সব পোস্টারে প্রচণ্ডভাবে বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার করে৷ তারপর একটা জঘন্য নির্বাচনের মাধ্যমে ওই ব্যক্তি নির্বাচিত হয়ে আসেন৷

এখানে আওয়ামী লীগ তাহলে বঙ্গবন্ধুকে কী করলো? বঙ্গবন্ধুকে কি তারা মানুষের ভালোবাসার মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করলো, নাকি একজন খুব খারাপ মানুষ বঙ্গবন্ধুকে তাঁর পোস্টারে ব্যবহার করার সুযোগ পেল? আওয়ামী লীগ এটা করতে পারে না৷

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আয়োজনে যাদের রাখা হয়েছে তারা নিম্ন শ্রেণির স্তাবক৷ তাদের অনেকে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানেই না৷ এমনকি আমার থেকেও অনেক কম জানে৷ বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তারা কিছু পড়েছেন বা জানেন কিনা, সেটা নিয়েই আমার সন্দেহ আছে৷ আওয়ামী লীগ দলটাই এখন এমন হয়ে গেছে৷

বাংলাদেশের সব মানুষ বঙ্গবন্ধুকে সম্মান করেন৷ আমি নিজেও ওনাকে অত্যন্ত সম্মান করি৷ শুধু তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে নয়, আমি বিশ্বাস করি তাঁর জন্ম না হলে হয়তো বাংলাদেশ হত না৷ আওয়ামী লীগকে ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধু যে গণমানুষের নেতা সেটা বর্তমান ক্ষমতাসীন দল প্রতিষ্ঠা করতে চায় না বা পারে নাই৷

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর আয়োজন নিয়ে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি হচ্ছে৷ এগুলো নিয়ে নানা মহলে অনেক সমালোচনাও হচ্ছে৷ এসব ত্রুটি আপনার চোখে কীভাবে ধরা পড়ছে এবং এসব ত্রুটি বাদ দিয়ে কীভাবে একটি সুন্দর আয়োজন করা যায়?

আমাদের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছেন৷ যেটা আমার খুব ভালো লেগেছে৷ উনি বঙ্গবন্ধুর জন্য তোরণ, ব্যানার, ফেস্টুন বা ম্যুরাল, এগুলো না করে ওই টাকাটা গরিব মানুষের উপকারে ব্যয় করতে বলেছেন৷ এছাড়া অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে মুজিববর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশে যারা অবসরভাতা পান তাদের জন্য ঘরে বসে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে৷ সরকারের উচিত এই ধরনের কাজ করা৷ আমি জানি অবসরভাতা পেতে বাংলাদেশে কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়৷ তারা যদি এখন বাসায় বসে পেনশন পান সেটা মুজিববর্ষের উপহার হবে৷ কেউ এর সমালোচনা করবে না৷ প্রত্যেকে এই ধরনের উদ্যোগের বাহবা দেবে৷ কেউ এর সমালোচনা করবে না৷

তাহলে আওয়ামী লীগ তো ভালো ভালো কাজ করছে৷ বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুসরণ করছে৷ এ বিষয়ে আপনি কী বলেন?

আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণই করে না৷ বঙ্গবন্ধুর জীবনকে আমি দুইভাগে দেখি৷ একটা ১৯৪৮ থেকে ১৯৭২ সাল৷ এই পুরো সময়ে তিনি অসামান্য আত্মত্যাগ করেছেন৷ আর ৭২ থেকে ওনার নির্মম হত্যাকাণ্ডের আগ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে তিনি কিছু ভুল করেছেন৷ আওয়ামী লীগ ওই ভুলগুলোকেই ধারণ করে৷ কিন্তু মহান নেতা হিসেবে মেহনতি মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু যে আত্মত্যাগ করেছেন, আন্দোলন করে কারগারে গেছেন, সেই বঙ্গবন্ধুকে আওয়ামী লীগ ধারণ করে না৷ আওয়ামী লীগ এস. আলম গ্রুপের মতো বড় বড় গ্রুপের হাজার কোটি টাকার ঋণ মাফ করে দিতে পারে, কিন্তু কৃষকের সামান্য ঋণ মাফ করে না৷ কৃষকের ধানের ন্যায্য মূল্য দিতে পারে না৷ পাটকল শ্রমিকদের বেতন দিতে পারে না৷ এটা কি বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ?

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত হওয়ার পর দীর্ঘ ২১ বছর বাংলাদেশে তাঁকে নিয়ে আলোচনা করা যেত না, বা বলা চলে আলোচনা নিষিদ্ধ ছিল৷ অতগুলো বছর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো কথা বলতে দেওয়া হয়নি বিধায় কি এখন সুযোগ পেয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা হচ্ছে?

বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর চার-পাঁচ বছর ওনাকে নিয়ে কথা বলা যায় নাই৷ তারপর অবশ্যই বলা গেছে৷ এরশাদের আমল থেকে তো সব সময়ই বলা গেছে৷ হয়তো একটা বা দুইটা জেনারেশন বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানে নাই, তাতে কী হয়েছে? তাদের কী জানাবে?পোস্টারে লেখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করি, কিন্তু ব্যাংক খেলাপি, ঋণ খেলাপি, দুর্নীতিবাজদের মাফ করে দেয়৷ কৃষক-শ্রমিকদের ন্যায্য পাওয়া দেয় না৷ আদর্শের কথা বলে রাতের বেলা ভোট দিয়ে দেয়, তারা কোন বঙ্গবন্ধুকে চেনাচ্ছে? তাদের তো পোস্টারে লিখে দেওয়া উচিত তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে না৷ উঠতে বসতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলবে আর গুম, খুন, শেয়ার বাজার লুট করবে৷ এভাবে আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুকে কোথায় নামিয়ে আনছে!

আদর্শ ধারণ করছে এটা বোঝাতে তাহলে কী কী উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে?

আমরা সব সময় ভালো জিনিস দেখতে চাই৷ এই যে অবসরভাতা বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, এটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ৷ আমি বার বার সেটা বলছি৷ সরকার যদি মুজিববর্ষ উপলক্ষে কৃষকদের মুক্তির জন্য শ্রমিকদের জন্য নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং বলে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে, এটা আমাদের পক্ষ থেকে মুজিবর্ষের উপহার, তখন আমরা দারুণভাবে তার প্রশংসা করবো৷ আমি বার বার বলছি, ভালো কাজ করুন, যাকে আদর্শ মানেন, যাকে অনুসরণ করেন উনি কত বড় মানুষ ছিলেন সেটা বোঝাতে ভালো কাজ করুন৷

অনেকেই বলেন, মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবার থেকে এলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচিতিকে (ভাষা ও ঐতিহ্য) বড় করে দেখেছেন৷ ‘বাঙালি’ শব্দটিই ছিল জাতীয়তাবাদের একটি অসাম্প্রদায়িক পরিচয়৷ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি তারিক আলী বলেন, ‘‘বঙ্গবন্ধুর যে বিষয়টি আমাকে অনুপ্রাণিত করে তা হলো, কেমন করে মুসলিম লীগের ছাত্রনেতা থেকে তিনি বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের নেতা বনে গেলেন৷’’

মুজিব শতবর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে নানা সমালোচনা হচ্ছে৷ বিশেষ করে দিল্লিতে দাঙ্গার পর৷ আপনি এ বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

আমি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাটা বুঝতে পারছি৷ তাদের পক্ষে ভারতকে অস্বীকার করা কঠিন৷ কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রথম থেকেই বোঝা উচিত ছিল বঙ্গবন্ধু কোন মাপের নেতা, আর নরেন্দ্র মোদী কোন মাপের নেতা৷ বঙ্গবন্ধু কী রাজনীতি করতেন, আর মোদী কী রাজনীতি করছেন৷ তাদের শুরু থেকেই এই দূরদৃষ্টি থাকা উচিত ছিল৷ তাদের এটা আগেই বোঝা উচিত ছিল৷ তারা তো বহু আগে থেকেই জন্মশতবার্ষিকী নিয়ে আলোচনা করছেন৷ ভারত থেকে অবশ্যই কাউকে আমন্ত্রণ জানাতে হবে৷ তিনি হতে পারতেন মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কোনো ভারতীয় জেনারেল বা সামরিক কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নেতা৷ মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে তাঁকে সংযুক্ত করা যেত৷ এটা করেই মোদীকে বাদ দেওয়া যেত৷ মোদী তো একাত্তরে কিছুই ছিলেন না৷ আর আমি হলে বলতাম, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে আনতে৷

মোদীকে আনার ক্ষেত্রে সরকারের যুক্তি ভারত মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের পাশে ছিল৷ আরো অনেক বিষয়ে বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে৷ সেই কৃতজ্ঞতা বা বন্ধুত্বের প্রকাশ থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো৷ এখানে মোদী নয় বরং ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে তারা আমন্ত্রণ জানিয়েছেন৷

এরকম হলে তারা ভারতের রাষ্ট্রপতিকে আনতে পারতেন৷ তিনি তো অত বিতর্কিত মানুষ নন৷ মোদী যে অত্যন্ত সাম্প্রদায়িক লোক, তা তো সবাই জানে; এটা নতুন নয়৷ ওই দূরদৃষ্টি দিয়ে ভাবলে ভারতের রাষ্ট্রপতিকে আনা যেত৷ তিনি দলিত শ্রেণি থেকে এসেছেন৷ তাহলেই আর এসব নিয়ে বিতর্ক হত না৷ আর রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রধান, পদমর্যাদায় তিনি মোদীর উপরে৷ আমার তো মনে হয় ক্ষমতায় থাকার জন্য আওয়ামী লীগের মোদীকে প্রয়োজন৷ সেই কৃতজ্ঞতা দেখাতে যেয়ে তারা মোদীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে৷ এভাবে তারা বঙ্গবন্ধুকে ছোট করেছে বলে আমি মনে করি৷ মোদীকে ইতিহাস কী হিসাবে মনে রাখবে? হিটলার, মুসোলিনি, গাদ্দাফি বা সাদ্দামের মতো পরিণতি হবে তাঁর৷ মোদী ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েতে নিক্ষিপ্ত হবেন৷ ভারতের মানুষই তাকে ঘৃণা করবে৷

Hits: 0


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ