সচিবালয় স্থানান্তর: শুধু ঠিকানা বদল নয়, প্রয়োজন প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ
বেশ আগে একটি লেখায় বলেছিলাম, দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হলে সচিবালয়কে শুধু ঢাকা শহরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরিয়ে নিলেই হবে না; বরং দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও গুরুত্বপূর্ণ জেলায় সরকারি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দপ্তরগুলো পর্যায়ক্রমে স্থানান্তর করা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন রাজধানী ঢাকার ওপর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও কর্মব্যস্ততার চাপ কমবে, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার প্রসার ঘটবে।
সম্প্রতি সচিবালয়কে বর্তমান অবস্থান থেকে সরিয়ে শেরে বাংলা নগরে স্থানান্তরের সংবাদ দেখে আমার সেই পুরোনো লেখাটির কথা আবার মনে পড়ল। মনে প্রশ্ন জাগল—সচিবালয়ের ঠিকানা পরিবর্তন করলেই কি রাজধানীর সমস্যার সমাধান হবে? নাকি এর জন্য প্রয়োজন আরও সুদূরপ্রসারী, বাস্তবমুখী ও দূরদর্শী পরিকল্পনা?
প্রশ্নটি শুধু একটি সরকারি ভবন কোথায় থাকবে, তা নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং উন্নয়নের সুযোগ কি কেবল রাজধানীকেন্দ্রিক থাকবে, নাকি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে?
সচিবালয় শেরে বাংলা নগরে নিলে কতটুকু লাভ?
সচিবালয় বর্তমান স্থান থেকে শেরে বাংলা নগরে স্থানান্তরিত হলে নতুন ভবন, উন্নত কর্মপরিবেশ, আধুনিক অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু সুবিধা অর্জিত হতে পারে। পরিকল্পিত স্থানে সরকারি দপ্তরগুলোকে সাজানো গেলে কর্মপরিবেশের উন্নতি এবং দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো, এতে ঢাকা শহরের ওপর মানুষের চাপ কতটুকু কমবে?
সচিবালয় যদি ঢাকার মধ্যেই থাকে, তবে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি কাজে আসা নাগরিক, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, ঠিকাদার, ব্যবসায়ী এবং নানাভাবে প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ঢাকামুখী যাতায়াতের প্রয়োজন বহাল থাকবে। স্থান পরিবর্তনের কারণে কিছু এলাকার যানজটের ধরন বদলাতে পারে, কিন্তু রাজধানীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাটি থেকেই যাবে।
শেরে বাংলা নগরে সচিবালয় স্থাপন করা হলে তা এক ধরনের স্থানিক পুনর্বিন্যাস হবে; কিন্তু দেশের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও কর্মসংস্থানকে ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া না গেলে সেটিকে প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ বলা যাবে না।
অর্থাৎ, সচিবালয়ের ঠিকানা বদল আর প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এক বিষয় নয়।
সচিবালয় দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় স্থানান্তর করলে কী উপকার হবে?
আমার আগের প্রস্তাবের মূল কথা ছিল, প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিতে হবে। সব মন্ত্রণালয়কে একযোগে ঢাকার বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় উপযুক্ত দপ্তর স্থাপন করা যেতে পারে। কোন মন্ত্রণালয় কোথায় গেলে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যাবে, তা নির্ধারণ করতে হবে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা, জনবল, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনা করে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, শিল্প, বাণিজ্য, পরিবেশ কিংবা আঞ্চলিক উন্নয়নসংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট খাতের সম্ভাবনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত করা যেতে পারে। তবে এ ধরনের স্থান নির্ধারণ হতে হবে যথাযথ সমীক্ষা ও জাতীয় পরিকল্পনার ভিত্তিতে।
এতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথমত, ঢাকার জনসংখ্যার ওপর চাপ কমবে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ঢাকাকেন্দ্রিক হওয়ায় চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সরকারি সেবা গ্রহণের জন্য মানুষকে রাজধানীমুখী হতে হয়। প্রশাসনিক কার্যক্রমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং কিছু মানুষকে জীবিকা ও সুযোগের সন্ধানে ঢাকায় আসতে হবে না।
এতে আবাসন, সড়ক, গণপরিবহন, পানি, পয়োনিষ্কাশন ও অন্যান্য নগরসেবার ওপর চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। অবশ্য শুধু সচিবালয় স্থানান্তর করলেই জনসংখ্যার চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই; এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার বিকেন্দ্রীকরণও জরুরি।
দ্বিতীয়ত, বিভাগ ও জেলায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়বে।
একটি বড় সরকারি দপ্তর কোনো অঞ্চলে স্থাপিত হলে সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, আবাসন, পরিবহন, খাদ্য, বিপণিব্যবস্থা এবং অন্যান্য ব্যবসার চাহিদা বাড়তে পারে। স্থানীয় উদ্যোক্তারা নতুন বাজার পাবেন, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে।
যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে ঢাকায় কেন্দ্রীভূত, তার একটি অংশ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়লে উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারে।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
দেশের সব অঞ্চল সমানভাবে শিল্প, ব্যবসা, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পায়নি। রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন অব্যাহত থাকলে এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। প্রশাসনিক দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সুষম বণ্টন দেশের পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
তবে এ ক্ষেত্রে শুধু দপ্তর স্থানান্তর যথেষ্ট নয়। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা, হাসপাতাল, আবাসন, যোগাযোগ, ইন্টারনেট এবং অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থত, সরকারি সেবা জনগণের আরও কাছে পৌঁছাতে পারে।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, অনুমোদন বা দাপ্তরিক কাজের জন্য ঢাকায় আসা অনেক মানুষের জন্য সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত দপ্তর আঞ্চলিক পর্যায়ে থাকলে কিছু কাজের জন্য রাজধানীতে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।
এর ফলে মানুষের যাতায়াতের খরচ, কর্মঘণ্টার অপচয় এবং প্রশাসনিক হয়রানি কমানোর সুযোগ থাকবে। তবে এ সুবিধা বাস্তবায়নের জন্য দপ্তরগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট ক্ষমতা বণ্টন এবং কার্যকর ডিজিটাল সেবাব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
পঞ্চমত, একটি ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় উন্নয়নব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
একটি দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, চাকরি ও সুযোগ যদি একটি শহরকে ঘিরে আবর্তিত হয়, তাহলে সেই শহরের ওপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিপরীতে প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হলে একাধিক শক্তিশালী নগরকেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে। এতে দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও বাড়তে পারে।
সচিবালয় ঢাকায় থাকলে কী কী ক্ষতি অব্যাহত থাকবে?
সচিবালয় ঢাকায় থাকুক বা শেরে বাংলা নগরে যাক, প্রশাসনের কেন্দ্রীভূত চরিত্র অপরিবর্তিত থাকলে কয়েকটি সমস্যা থেকেই যাবে।
এক. যানজট ও যাতায়াতের দুর্ভোগ। রাজধানীর বিভিন্ন অংশে সরকারি দপ্তর, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রীভবন মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত বাড়ায়। নতুন স্থানে সচিবালয় স্থাপিত হলে যানবাহনের চাপ এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তরিত হতে পারে। কিন্তু রাজধানীর সামগ্রিক যাতায়াতব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে হলে ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
দুই. জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসনসংকট। ঢাকায় চাকরি ও কাজের সুযোগ বেশি কেন্দ্রীভূত থাকায় মানুষের বসবাসের চাহিদা বাড়ে। এর ফলে আবাসন, জমি, পরিবহন ও দৈনন্দিন ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। সরকারি দপ্তরের একটি অংশ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তরিত হলে সেসব অঞ্চলে অর্থনৈতিক সুযোগ বাড়তে পারে এবং ঢাকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর পথ তৈরি হতে পারে।
তিন. ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের প্রবণতা। সরকারি দপ্তরকে ঘিরে বিভিন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, সেবাদাতা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড গড়ে ওঠে। এসব কার্যক্রমের বড় অংশ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত থাকলে অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ ও উদ্যোক্তারা সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ এ ব্যবধান কমানোর একটি উপায় হতে পারে।
চার. সময় ও উৎপাদনশীলতার অপচয়। সরকারি কাজের জন্য দূরদূরান্ত থেকে ঢাকায় আসা, যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা এবং দাপ্তরিক যোগাযোগে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করার ফলে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেবা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আঞ্চলিক পর্যায়ে উপযুক্তভাবে বণ্টন করা গেলে এ ধরনের ব্যয় কমানোর সুযোগ থাকবে।
পাঁচ. উন্নয়নের অসম বণ্টন। রাজধানী যখন দেশের প্রধান প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তখন অন্যান্য অঞ্চল তুলনামূলকভাবে কম বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ পেতে পারে। এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়াতে পারে। তাই উন্নয়নের সুফল সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণকে বৃহত্তর জাতীয় পরিকল্পনার অংশ করা জরুরি।
তুলনামূলক চিত্র: ঠিকানা পরিবর্তন বনাম প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ
সচিবালয়কে শেরে বাংলা নগরে স্থানান্তর করা এবং দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
প্রথমটি মূলত একটি স্থানের পরিবর্তন; দ্বিতীয়টি হলো প্রশাসন, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ভৌগোলিক পুনর্বিন্যাস।
শেরে বাংলা নগরে স্থানান্তরের ফলে নতুন অবকাঠামো ও কর্মপরিবেশের সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে দপ্তর স্থাপন করলে রাজধানীর ওপর নির্ভরতা কমানো, আঞ্চলিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবা জনগণের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার মতো বৃহত্তর সুফল অর্জনের সম্ভাবনা তৈরি হয়।
একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন দপ্তর ছড়িয়ে দিলে সমন্বয়হীনতা, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয়, দক্ষ জনবলের সংকট এবং দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব দেখা দিতে পারে। তাই বিকেন্দ্রীকরণ মানে সবকিছু এলোমেলোভাবে বিভিন্ন জেলায় সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা, ডিজিটাল সমন্বয় এবং যথাযথ ক্ষমতা অর্পণের মাধ্যমে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা।
কীভাবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে?
আমার মতে, এ বিষয়ে আবেগনির্ভর বা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত।
প্রথম পর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে, কোন মন্ত্রণালয়ের কোন কার্যক্রম ঢাকায় থাকা অপরিহার্য এবং কোনগুলো দেশের অন্যান্য অঞ্চলে স্থানান্তর করা সম্ভব। এরপর বিভাগ ও জেলাগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামো, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং জনবল বিবেচনা করে উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে হবে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে নির্বাচিত অঞ্চলে সরকারি আবাসন, অফিস, শিক্ষা, চিকিৎসা, গণপরিবহন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং তাঁদের পরিবারের জন্য গ্রহণযোগ্য জীবনযাপনের পরিবেশ তৈরি করা না গেলে স্থানান্তর কার্যকর করা কঠিন হবে।
তৃতীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা ও দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দপ্তর স্থানান্তর করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাও দিতে হবে। অন্যথায় স্থানীয় কার্যালয় থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি সিদ্ধান্তের জন্য ঢাকার অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকতে হবে।
চতুর্থ পর্যায়ে ডিজিটাল প্রশাসন, আন্তমন্ত্রণালয় যোগাযোগ এবং অনলাইন নথি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত দপ্তরগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে।
সবশেষে, পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি দপ্তর স্থানান্তর করে তার ফলাফল মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এতে প্রকৃত ব্যয়, নাগরিক সেবার মান, কর্মসংস্থান এবং ঢাকার ওপর চাপ কমার পরিমাণ সম্পর্কে বাস্তব তথ্য পাওয়া যাবে। সেই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে।
তাহলে প্রশ্ন—কে শুনে কার কথা?
একটি দেশের উন্নয়ন শুধু বড় বড় ভবন নির্মাণ কিংবা সরকারি দপ্তরের ঠিকানা পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ হলো মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, সুযোগের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা এবং দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো।
আমি যখন আগে সচিবালয়কে দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় স্থানান্তরের কথা বলেছিলাম, তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল ঢাকাকে দুর্বল করা নয়; বরং ঢাকার ওপর অসহনীয় চাপ কমিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলকে শক্তিশালী করা। ঢাকা দেশের রাজধানী হিসেবে তার গুরুত্ব বজায় রাখবে, কিন্তু দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ও কার্যক্রমের জন্য একমাত্র গন্তব্য হয়ে থাকবে কেন?
আমরা যদি সত্যিকার অর্থে যানজট, আবাসনসংকট, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে চাই, তাহলে সমস্যার মূল কারণ নিয়ে ভাবতে হবে। সচিবালয় বর্তমান স্থান থেকে শেরে বাংলা নগরে স্থানান্তরিত হলে কিছু সুবিধা হতে পারে, কিন্তু তা একা রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়নব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন ঘটাতে পারবে না।
প্রয়োজন এমন একটি পরিকল্পনা, যেখানে প্রশাসনিক ক্ষমতা, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সরকারি সেবা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে। যেখানে একজন নাগরিককে নিজের ন্যায্য কাজের জন্য বারবার রাজধানীতে ছুটতে হবে না, যেখানে তরুণেরা নিজ নিজ অঞ্চলেই মানসম্মত কাজের সুযোগ পাবে এবং যেখানে উন্নয়নের সুফল কেবল একটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আমার প্রশ্ন তাই আজও একই—যদি একটি প্রস্তাব দেশের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে অবদান রাখতে পারে, তবে তা নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা হবে না কেন? কেন আমরা সমস্যার মূল কারণের পরিবর্তে তার বাহ্যিক রূপ পরিবর্তন করেই সন্তুষ্ট থাকতে চাই?
সচিবালয় কোথায় থাকবে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের প্রশাসন কার জন্য, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে কাজ করবে।
সময় এসেছে শুধু সচিবালয়ের স্থান পরিবর্তনের কথা না ভেবে, বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ঢাকাকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আনার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর আলোচনা শুরু করার।
নইলে প্রশ্ন থেকেই যাবে—কে শুনে কার কথা?













