• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

জাতীয়

তিন লক্ষ্য সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর

প্রকাশ: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:৩৫
আপডেট: শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:৩৫

তিন লক্ষ্য সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর
 

জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়ন, তৈরি পোশাকসহ বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানো এবং দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণ-এই তিন লক্ষ্য সামনে রেখে টোকিও সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এই সফরে জাপানের সঙ্গে অন্যান্য চুক্তি ও সমঝোতার পাশাপাশি ইপিএ কার্যকর করার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।

এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্প্রসারণ, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার নতুন সুযোগ তৈরি হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (এফটিএ-১ অধিশাখা) মো. ফিরোজ উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ইপিএ কার্যকর হলে জাপানের সঙ্গে সব ধরনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়বে। সেই লক্ষ্য নিয়ে এ চুক্তি করা হয়।

তিনি জানান, আগামী সংসদ অধিবেশনেই ইপিএ অনুমোদন হতে পারে। এলডিসি উত্তরণ সামনে রেখে ইপিএ দুদেশের জন্যই একটি সম্ভাবনাময় চুক্তি হিসাবে দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে অনেক বিষয় থাকলেও ইপিএ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হবে বলে আশা করছি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ইপিএ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং চুক্তির সুযোগ কাজে লাগিয়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে। আগামী সংসদ অধিবেশনেই চুক্তিটি অনুমোদন হতে পারে। এবারের সফরে প্রধানমন্ত্রী জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে ২৭ অক্টোবর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ছাড়াও কৃষি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হবে। বিশেষ করে জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটা বাংলাদেশে গাড়ি তৈরির কারখানা স্থাপনে আগ্রহী।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিদেশেও গাড়ি রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এর আগে গত ৬ অক্টোবর টয়োটা তসুশো করপোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ইচিরো কাশিতানির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলাদেশে টয়োটা গাড়ি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।

প্রতিষ্ঠানটি ২০২৭ সালে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ির কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছে। ইপিএ’র আওতায় জাপানি গাড়ির যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন শিল্পপণ্যে শুল্কসংক্রান্ত সুবিধা ও বিনিয়োগের নিয়ম সহজ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে জাপানি গাড়ি বাংলাদেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশের তালিকায় না থাকায় স্থানীয় উৎপাদনে বিনিয়োগের বাণিজ্যিক যুক্তিও তৈরি হতে পারে। ফলে টয়োটার পরিকল্পনা বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর গাড়ির বাজারকে ধীরে ধীরে উৎপাদনমুখী শিল্পে রূপান্তরের সম্ভাবনা তৈরি করছে। এরই মধ্যে জাপানের মিতসুবিশি করপোরেশন বাংলাদেশের রানকন অটো ইন্ডাস্ট্রিজের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। ফলে জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের বিনিয়োগের নতুন কেন্দ্র হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশে।

ইপিএ কার্যকর হলে ৭ হাজার ৩৭৯ পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা : বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি হিসাবে গত ৬ ফেব্রুয়ারি টোকিওতে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ইপিএ সই হয়। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া আলোচনা শেষে এ চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন কাঠামোয় নিয়ে এসেছে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের রপ্তানি ঝুড়ির ৯৭ শতাংশ, অর্থাৎ ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য জাপানের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশের সুযোগ পাবে।

তৈরি পোশাকসহ প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলোর জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ। বিপরীতে বাংলাদেশও জাপানের ১ হাজার ৩৯টি পণ্যে তাৎক্ষণিক শুল্কমুক্ত সুবিধা দেবে; অন্য অনেক পণ্যে পর্যায়ক্রমে ১৮ বছর পর্যন্ত শুল্ক কমানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে ইপিএ শুধু শুল্ক কমানোর চুক্তি নয়।

এতে পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ই-কমার্স, মেধাস্বত্ব, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং বাণিজ্য সহজীকরণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ফলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বাংলাদেশে ব্যবসা পরিচালনা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়ম ও নীতির পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়বে। সংসদীয় অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চুক্তিটি কার্যকরের পথ সুগম হবে। তাই আসন্ন সফরে ইপিএ বাস্তবায়নের প্রস্তুতি, সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান এবং দুই দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাগুলো কার্যকর করার বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।

৩০০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা : জাপান বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির অন্যতম সম্ভাবনাময় বাজার। বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ জাপানে প্রায় ১১৮ কোটি ৫০ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। এছাড়া বিজিএমইএ খুব শিগ্গিরই এই রপ্তানি আয় ৩০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। এলডিসি উত্তরণের পরও পরবর্তী ৩ বছর শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল রাখার কথা দিয়েছে জাপান।

অন্যদিকে জাপানের বার্ষিক পোশাক আমদানির বাজার প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের। অর্থাৎ বিশাল এ বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ইপিএ’র আওতায় শুল্ক সুবিধা অব্যাহত থাকলে জাপানের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়তে পারে। বিশেষ করে নিট ও ওভেন পোশাক, ডেনিম, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য এবং বৈচিত্র্যময় পোশাক রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।

পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্য, পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যেও বাজার সম্প্রসারণ সম্ভব। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, জাপানি বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করাই এই সফরের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাণিজ্য সম্প্রসারণের অংশ হিসাবে বিজিএমইএ গত মাসে তাদের উত্তরার কার্যালয়ে একটি ‘জাপান ডেস্ক’ চালু করেছে।

এছাড়া এশীয় পোশাক ব্র্যান্ডগুলোকে আকর্ষণ করতে আগামী মাসে হংকংয়ে একটি রোডশোর আয়োজন করা হচ্ছে, যেখানে জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর বড় ধরনের অংশগ্রহণ থাকবে। এছাড়া ইপিএ ও বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি জাপানের কাছ থেকে উন্নয়ন সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগও রয়েছে।

তথ্যমতে, ২০২৬-৩১ মেয়াদে প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা ১৪ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ ও সহযোগিতা প্যাকেজ প্রস্তাব করার প্রস্তুতি নিয়েছে বাংলাদেশ। এতে সহজ শর্তের ঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের সমন্বয় থাকবে। প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য অংশ পরিবহণ অবকাঠামো, মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী বন্দর ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি এবং উৎপাদন শিল্পে ব্যয় করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাতারবাড়ীকে ঘিরে বন্দর, সড়ক-রেল যোগাযোগ ও শিল্প অবকাঠামো উন্নত করা গেলে রপ্তানিমুখী শিল্পের পণ্য পরিবহণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ সহজ হবে। জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত মেট্রোরেল ও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের মতো প্রকল্প দুই দেশের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার উদাহরণ। এবারের সফরে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি, নতুন অর্থায়ন এবং জাপানি ঋণের সুদহার কমানোর বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকালে রাষ্ট্রদূত থাকছেন ঢাকায় : এদিকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী ঢাকায় থাকবেন। ইতোমধ্যে তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র যুগান্তরকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

এই সফরের কূটনৈতিক বিষয়াবলি তদারকি এবং সার্বিক আয়োজন সমন্বয়ের বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক বিষয়ক সচিব এম নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফর সময়ে তিনি টোকিওতে থাকবেন এবং দ্বিপাক্ষিক ও কূটনৈতিক কাজগুলোতে প্রধান ভূমিকায় থাকবেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে আগামী ২৭ অক্টোবর দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন। বৈঠকে বাংলাদেশ-জাপান ইপিএ বাস্তবায়ন, বিনিয়োগ বাণিজ্য এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম