বাংলাদেশের নির্বাচন: আধিক্যের সমস্যা?

Pub: Saturday, December 1, 2018 10:16 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আফসান চৌধুরী:
বাংলাদেশের নির্বাচনী পরিবেশ উত্তেজনাপূর্ণ ও এ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করার অবকাশ অনেকটা কম। জনসাধারণের মধ্যে না হলেও অন্তত দলীয় প্রার্থীদের বিপুলসংখ্যক সমর্থকের তীব্র তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছরের তিক্ততা এবং গোপন ও প্রকাশ্য সহিংসতার পর নির্বাচনের দিকে এমনকি এই উন্মত্ত গতিও এক ধরনের স্বস্তিদায়ক।

এদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ অব্যাহতভাবে তার প্রধান বিরোধী ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন বিএনপি প্রভাবিত জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের ওপর প্রবল নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এর সর্বশেষটি হলো বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখা, জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দুর্নীতির জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। আদালত জানিয়েছে, কোনো ব্যক্তি দুই বা ততোধিক বছরের জন্য দণ্ডিত হলে তিনি উচ্চতর আদালতে স্থগিতাদেশ না পেলে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। লিভ টু আপিল মঞ্জুর হবে কিনা তা নিশ্চিত নয়।

বিএনপি এর প্রতিবাদ করছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন, তাদের কাছে এই ঘটনা অবাক করার মতো কিছু বিবেচিত হয়নি। এক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক বলেছেন, বিএনপি অনেক আগে থেকেই জানত যে খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে আওয়ামী লীগ সম্ভব সবকিছু করবে। ফলে নিশ্চিতভাবেই তারা আনুষঙ্গিক পরিকল্পনা করে রেখেছিল। তারা হয়তো মর্মাহত হওয়ার কথা বলছে, কিন্তু অবশ্যই বিকল্প তৈরি করে রেখেছিল।

ঝুঁকি নিচ্ছে না কোনো দলই

কথাটি যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। কারণ বিরোধী দলকে অকার্যকর করে দিতে আওয়ামী লীগ সরকার আইনি ব্যবস্থাকে যেভাবে ব্যবহার করছে তা প্রায় রোল মডেলে পরিণত হয়ে গেছে। বেশ কয়েকজন নেতাকে আদালত ঘোষিত কারাদণ্ডের মাধ্যমে আটকে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা। একবার পুরনো ঢাকার এমন এক আসনে শেখ হাসিনাকে তিনি পরাজিত করেছিলেন, যেখানে আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে পরিচিত বিপুলসংখ্যক হিন্দু ভোট ছিল ।

আরো পড়ুন ঃ ২০১৮ সালের পর বাংলাদেশের রাজনীতি

তাছাড়া হাসিনা তার নিজ দলের কয়েকজন হেভিওয়েট প্রার্থীকে বাদ দিয়েছেন। এদের মধ্যে আর্থিক বা কথিত অপরাধমূলক তৎপরতার অভিযোগ থাকা কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক মন্ত্রীও রয়েছেন। এতে প্রমাণ হয় যে উভয় দলই নির্বাচনকে খুবই গুরুত্ব দিয়ে নিয়েছে এবং দুই দলের কেউই একে জল-ভাত হিসেবে নেয়নি।

আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রার্থী-বদল ও বাদ পড়ার ঘটনা বেশি ঘটেছে। এর কারণ হলো দলটি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় রয়েছে এবং দলের মনোনয়নের চেষ্টা করছে অনেকে। পরিণতিতে বেশ হইচইয়ে ভরা পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। এর রেশ ধরে ঢাকার প্রধান পরিচিতি ব্র্যান্ড- সমাবেশ ও শোডাউন মারাত্মক যানজটের সৃষ্টি করেছে।

এটি এত মারাত্মক সমস্যার সৃষ্টি করেছিল যে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় লোকের সংখ্যা সীমিত করে দিয়েছিল। এটি একটি অস্বাভাবিক নির্দেশনা হলেও সময়ের প্রয়োজনই তাতে প্রতিফলিত হয়েছে।

অপ্রত্যাশিত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন

রাজনীতিবিদ ও ভাষ্যকারেরা রাজনীতির নৈতিক দৃষ্টিকোণ ও নির্দিষ্ট নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিটি ধারণা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা করছেন। তারা নীতিগত অবস্থানে থাকলেও বাস্তবতা হলো এই যে তারা প্রায়ই সুবিধাজনক অবস্থানই সৃষ্টি করেন। আরো তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বেশির ভাগ বাংলাদেশীই এসব লোককে বলতে গেলে নৈতিকতাসম্পন্নই বলে মনে করে না। এসব লোক যখন সব ধরনের অনৈতিক কাজে অভিযুক্ত হলে সব যৌক্তিকতা অস্বীকার করে। তাহলে তারা কেন সৎ আর আদর্শবাদীতে পরিণত হন?

বাংলাদেশীরা অকুতভয় জাতি। তারা নির্বাচনের মাধ্যমে প্রাপ্তির আশা করে খুবই সামান্য। বরং সামাজিক-রাজনৈতিক জবাবদিহিতার অভাবেই পুরো ব্যবস্থা ভারাক্রান্ত এবং তা অনেকাংশেই রাজনীতিবিদদের জন্যই সীমিত। অবশ্য কিছু কিছু সমীক্ষায় দেখা যায়, তারা নির্বাচনকে উপভোগ করে, এই ‘গণতান্ত্রিক’ ব্যবস্থাকে উৎসবমুখরভাবে গ্রহণ করে। এ কারণেই কে মনোনয়ন পাচ্ছে, কে বাদ পড়ছে, তা এখন আলোচ্য বিষয়। ভোটারেরা সাধারণভাবে তাদের ব্র্যান্ডে অনড় থাকলেও উভয় শিবিরে মনোনয়ন প্রতিযোগিতা উপভোগ থেকে তাদের বিরত রাখতে পারছে না।

আরো পড়ুন ঃ বাংলাদেশে পুরনো ও নব্য এলিট শ্রেণীর মধ্যে লড়াই?

পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে এবং অনেক সময় তা হচ্ছে অপ্রত্যাশিতভাবে। ড. কামাল হোসেনের আগমন বিএনপির জন্য বিপুলভাবে কল্যাণকর হয়েছে। কারণ একটি শীর্ষ ব্যক্তিত্ব শীর্ষে অনুপস্থিত ছিলেন। প্রায় নিষিদ্ধ ঘোষিত দল থেকে তারা এখন অনেক বেশি মূলধারায় পরিণত হয়েছে, যা আগে কখনোই ছিল না। এটিই সংলাপের (ক্ষমতাসীন দলের সাথে আলোচনা) পথ সৃষ্টি করে। এতে দাবি আদায়ের পরিভাষায় অর্জন খুবই সামান্য হলেও এটি বিরোধী দলকে বৈধতা দেয়। আর তাই বিএনপির অনুকূলে কাজ করেছে।

জনসাধারণ চায় স্থিতিশীলতা ও শান্তি

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে, এমনটা আশা করেনি জনগণ। কারণ ইতিহাস পরিক্রমায় ক্ষমতাসীন দল সবসময়ই সুবিধা পেয়ে এসেছে। নির্বাচন হলো রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয়। ফলে ভোটারদের প্রত্যাশা একই ধরনের নাও হতে পারে। কারণ ভোট প্রদান করা তাদের কাজ, দলের নয়। তারা দীর্ঘ সময় ধরে নানাভাবে ক্ষমতায় থাকা দলগুলোকে দেখেছে বলে তাদের কাছে তাদের প্রত্যাশা অতি সামান্য।

কোন দল অধিকতর আর্থ-সামাজিক স্থিতিশীলতা আনতে পারে তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির দাবিকে অনেক কম অগ্রাধিকারে বিবেচনা করা হবে। অতীত হাতড়ে দেখার সুযোগ এলে লোকজন তাদের স্মৃতিশক্তির ওপর নির্ভর করে এবং উভয় দলকে তাদের যেভাবে দেখা যাওয়া উচিত, তার চেয়ে কম আগ্রাসী হিসেবে উপস্থাপন করার জন্য কাজ করবে।

দলীয় কোন্দল ব্যাপক হলে এবং তা সামাজিক পরিসরে ঢুকে পড়লে কিংবা ভোটাররা যদি মনে করে যে বিজয়ী দল কোনো না কোনো আকারে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়বে, তবে তারা তাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ‘দেখিয়ে দিতে’ দ্বিধা করবে না।

Hits: 0


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ