বিদ্যুৎ ও পানির দাম বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস খরচে কাহিল নারায়ণগঞ্জবাসী

Pub: Sunday, March 1, 2020 9:08 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

স্টাফ রিপোর্টার, নারায়ণগঞ্জ : এক সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানির দাম বেড়েছে। নতুন বিদ্যুতের বিল কার্যকর হবে মার্চ থেকে আর পানির বিল এপ্রিল থেকে। এতে করে নারায়ণগঞ্জবাসীর জীবন যাপনের খরচ আরো বাড়লো। যার জন্য হিমশিম খাচ্ছে নগরবাসী। বছরের এমন সময় যখন বেতনও বাড়ে না সেখানে হঠাৎ বিদ্যুৎ ও পানির বিল বেড়ে যাওয়ায় চরম চিন্তায় ভুগছেন নগরবাসী। অবিলম্বে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়ী সহ সাধারণ মানুষ।
জানা গেছে, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে বিদ্যুৎ ব্যবহারের নতুন হার নির্ধারণের ঘোষণা দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। বিদ্যুতের এ দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই খাতে ব্যয় বৃদ্ধিকে কারণ দেখিয়েছে বিইআরসি। সাধারণ গ্রাহক পর্যায়ে (খুচরা) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম গড়ে ৩৬ পয়সা বা ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। প্রতি ইউনিটের দাম ৬টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৭ টাকা ১৩ পয়সা। পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট গড়ে ৪০ পয়সা বা ৮ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। ৪ টাকা ৭৭ পয়সা থেকে বেড়ে প্রতি ইউনিটের দাম হয়েছে ৫ টাকা ১৭ পয়সা।
এছাড়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন মূল্যহার বা হুইলিং চার্জ প্রতি ইউনিটে শূন্য দশমিক ২৭৮৭ টাকা থেকে ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বাড়িয়ে করা হয়েছে শূন্য দশমিক ২৯৩৪ টাকা। খুচরা পর্যায়ে ডিমান্ড চার্জও বিভিন্ন পর্যায়ে ৫ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আর গত শুক্রবার ঢাকা ওয়াসার ওয়েবসাইটের বিজ্ঞপ্তিতে পানির দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। তবে সেখানের দাম বাড়ানোর কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে সেখানে বলা হয়েছে, এ সিদ্ধান্ত মিটারবিহীন হোল্ডিং, গভীর নলকূপ, নির্মাণধীণ ভবন ও নূন্যতম বিল সহ সব প্রকার (পানি ও পয়ঃ) অভিকরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। প্রতি ১ হাজার লিটার পানির অভিকর আবাসিক ১১ দশমিক ৫৭ টাকার স্থলে ১৪ দশমিক ৪৬ টাকা এবং বাণিজ্যিক ৩৭ দশমিক শূন্য ৪ টাকার স্থলে ৪০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে বসবাসকারী মূল জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি ভাড়ায় বসবাস করেন। যার মধ্যে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন বিত্ত পরিবারের সংখ্যাই বেশি। যেখানে টিন সেডের দুই কক্ষের বাসা ৪ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা, বহুতল ভবনের নূন্যতম দুই কক্ষের একটি বাসার জন্য ভাড়া গুনতে হয় সর্বনি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা ও তিন কক্ষের বাসার জন্য ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। আর কক্ষের সংখ্যা অনুযায়ী বাসাভাড়া ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকাও রয়েছে। ভাড়া বাসার সঙ্গে পানির বিল সংযুক্ত থাকলেও প্রত্যেক ভাড়াটিয়াকেই বিদ্যুৎ বিল আলাদাভাবে পরিশোধ করতে হয়। যা প্রতি মাসে সর্বনি ৭০০ থেকে দুই, তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বিল পরিশোধ করতে হয়।
গলাচিপা এলাকার বাসিন্দা সজিব সাহা বলেন, পানির বিল ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো যুক্তি সংঘত নয়। কারণ এর কারণে মধ্য ও নিম্ন বিত্ত পরিবারের উপর প্রভাব পড়বে। কারণ এখন বাড়ি ভাড়া বেড়ে যাবে। যেসব মালিকেরা জানুয়ারি মাসেই ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা ভাড়া বাড়িয়েছে তারা এখন পানির বিলের জন্য আরো ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা আর বিদ্যুৎ বিল অতিরিক্ত টাকা এমনিতেই পরিশোধ করতে হবে। তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরেই বেতন বাড়ছে না। কিন্তু খরচ বেড়েই চলেছে। যেমন পেঁয়াজ, চাল, ডাল, তেল সহ নিত্য প্রয়োজনীয় সকল জিনিসের দাম বেড়ে চলছে। এতে জীবন চলা কঠিন হয়ে গেছে। তার উপর নতুন করে পানি ও বিদ্যুতের বিল মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।
পাইকপাড়া এলাকার ভাড়াটিয়া আলেয়া আক্তার বলেন, পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যায় না। এতো টাকা ভাড়া দিয়ে বাসা নিলেও রান্নার জন্য সিলিন্ডার গ্যাসের বোতল রাখতে হয়। যার জন্য প্রতিমাসে ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা ব্যয় হয়। এখন পানির বিল যেহেতু বেড়েছে তখন বাসার ভাড়ার সঙ্গে পানির বিলও বাড়তি চাইবে। তার সঙ্গে বিদ্যুৎ বিলও বেশি আসবে। ১০ হাজার টাকার ভাড়ার বাসার সঙ্গে অতিরিক্ত বিদ্যুত বিল, পানির বিল ও গ্যাসের বিল সবই যোগ হবে। কারণ বাড়ির মালিক কখনোই এগুলো পরিশোধ করবে না। এগুলো আমাদেরই পরিশোধ করতে হবে। তাই বিদ্যুৎ ও পানির বিল বাড়ানোর কোন যুক্তি নেই।
এদিকে বিদ্যুৎ ও পানির দাম বৃদ্ধির তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে মিছিল ও সমাবেশ করেছে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি। অবিলম্বে দাম না বাড়িয়ে বরং কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। সিপিবি জেলার সভাপতি হাফিজুল ইসলাম বলেন, বিদ্যুৎ ও পানির এ দাম বাড়ার প্রভাব কেবল বাসাবাড়িতে পড়বে তা নয়, কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচও এতে বৃদ্ধি পাবে। যখন নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দামই মানুষের নাগালের বাইরে তখন বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানো মানুষের জন্য মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। মানুষের আয় বাড়ছে না কিন্তু খরচ বেড়ে চলছে। এ রকম এক সময়ে বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী নয়। তিনি বলেন, সরকার কোন যৌক্তিকতা ছাড়াই সম্পূর্ণ অবৈধ ভাবে এ দাম বাড়িয়েছে। অবিলম্বে দাম না কামানো হলে কঠিন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী এর সভাপতি নূর উদ্দিন বলেন, এখন মানুষের ক্রয় ক্ষমতা সীমিত হয়ে গেছে। যার সীমিত আয় তার পক্ষে বাড়ি ভাড়া, যাবতীয় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্রয় করা কষ্ট কর হয়ে গেছে। এমন মৌসুমে যেখানে কাঁচা সবজির দাম থাকার কথা ২০টাকা সেটা দাম বেড়ে দিগুন হয়ে গেছে। ৪০ টাকার পেঁয়াজ কিনতে হয় ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। সব জিনিসপত্রের দামই অন্য বছরের চেয়ে বেশি। এতেই সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। আর এসময়ে বিদ্যুতের বিল ও পানির বিল না বাড়ালেই চলতো। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদের সিংহভাগ উৎপাদন হয় গ্যাস ও তেলে। তেলের মূল্য কয়েক বছরের তুলনায় সর্বনিম্ন আছে। আর গ্যাস তো নিজেস্ব উৎপাদন হয়। সরকার কয়লার বিদ্যুৎ ব্যয় দেখিয়েছে। কিন্তু কয়লা ভিত্তিক কয়টা আমাদের বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে?। একটা ছাড়া সব কয়টা কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এখনও উৎপাদন আসেনি। কিন্তু এর আগেই দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। বেশির ভাগই নির্মাণাধীন রয়েছে। একটা চোরাগুপ্তা ভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি আরো বলেন, পানির বিল ২ থেকে ৩ বছর আগেও ৬ টাকা ছিল সেটা ১১ টাকা করেছে এখন ১৮ টাকা করা হয়েছে। এভাবে দাম বাড়ানোর ফলে মানুষের নাভিশ্বাস উঠে যাবে।
নুরুউদ্দিন আরো বলেন, বিদ্যুতের বিলে দেখা যাচ্ছে মাত্র কয়েক পয়সা। কিন্তু মানুষকি শুধু মাত্র ৭৫ ইউনিট ব্যবহার করে?। কিন্তু ৭৫ ইউনিটে এক রেট, তারপর ১০০ ইউনিটে আরেক রেট ও ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত আরো বেশি রেট ধরা হয়। সাধারণ মানুষ সর্বন্ম্নি ৩০০ থেকে ৪০০ ইউনিট ব্যবহার করে। যে আগে ২ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল তো তার এখন আরো ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিতে হবে। যা মানুষের জন্য মরার উপর খাঁড়ার ঘা। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই।
মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল জানান, বিদ্যুতের চুরি বন্ধ হলে আরো অনেক কমরেটে বিদ্যুৎ দেয়া যাবে। বিদ্যুতে পিয়নের চাকুরী যারা করে এখন তারা কোটি কোটি টাকার মালিক হলো কিভাবে, কারন তার সরকারী দল করে। মানুষের আয় বাড়ে নাই কিন্তু বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। সেহেতু বিদ্যুৎ ও পানির দাম বাড়ানোর কোন যুক্তিকতা নেই। আমরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। অবিলম্বে এ দাম কমানো হোক অন্যথায় কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

Hits: 0


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ