ব্যতিক্রমী একজন সিটি কাউন্সিলর

Pub: Saturday, April 11, 2020 3:45 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হবার পর বহু মানুষের নানারকম কর্মকীর্তি নিয়ে প্রতিবেদন লিখেছি মানবজমিনে। কেবল অপ্রিয় সত্য প্রকাশ বা খুঁচিয়ে সমালোচনা নয়, প্রশংসাও করেছি বিস্তর। আজ অন্যরকম একজন মানুষের জীবনের গল্প লিখবো। এটা এমন এক লেখা- যার পেছনে পেশাগত তাগিদ নেই, কারো অনুরোধ-উপরোধও নেই। লিখতে বসলাম, নিখাঁদ মনের টানে।

করোনা ভাইরাস মহামারির সময়ে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা, সুশীল, চিকিৎসক- সবাই যখন আপনপ্রাণ বাঁচাতে ঘরে খিল আঁটছেন, পালিয়ে থাকছেন, তখন সারাদেশে কিছু মানুষ দুর্গত স্বজাতির প্রতি মানবতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। তাদেরই একজন নারারণগঞ্জ সিটির ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও নগর যুবদলের সভাপতি মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। তিনি যখন টেলিভিশনে বললেন- ‘যতদিন তিনি নিজে করোনায় আক্রান্ত না হবেন, ততদিন করোনা রোগীর সেবা করে যাবেন।‘ এরপর ভালো কাজকে উতসাহ প্রদানকারী কিছু মানুষ তার এই কর্মকান্ডের প্রশংসা করছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। তা দেখে সত্যিই আমার ভালো লাগছে, আনন্দ জাগছে প্রাণে। মানবতাবাদীদের প্রশংসা করার লোক এখনো অবশিষ্ট আছে সমাজে, দেশে। আমি কিন্তু অন্যদের মতো বিস্মিত হচ্ছি না। কারণ এই লোকটার ভেতর-বাহির অনেক কিছুই জানি। সবধরনের পরিস্থিতিতে এই লোক মানুষের পাশে দাঁড়াবে। এ বৈশিষ্ঠ্য মিশে গেছে তার রক্তে, খেলা করে মনে ও মগজে।

অর্ধযুগ আগের কথা। আমার সহকর্মী সামন হোসেন একজনের গল্প করলেন। সামনের বাড়ি নারায়ণগঞ্জে, যার গল্প করলেন তার বাড়িও সেখানে। তার নাম মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। যুবদল নেতা এবং একজন সিটি কাউন্সিলর। গল্পের এক পর্যায়ে জানলাম, তিনি বিএনপি নেতা তৈমুল আলম খন্দকারের অনুজ। রাজনীতির অলিগলিতে বিচরণ ছিল বলে, রাজনীতিবিদদের প্রতি কৌতুহলের পাশাপাশি কিছুটা বিরক্তিও ছিল। সেদিন খুব এটা আগ্রহ পেলাম না, কিন্তু নামটি আমার মাথায় গেঁথে গেল।

কিছুদিন পর, নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারের লোমহর্ষক ঘটনা ঘটলো। পুরো দেশের মানুষের নজর তখন নারায়ণগঞ্জ নিবদ্ধ। একদিন ফেসবুকে একটি ছবিতে মনোযোগ আকৃষ্ট হলো। কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামকে হত্যার পরিপার্শ্বিকতায় সেদিন আইনজীবী চন্দন সরকারসহ অন্যরা প্রাণ হয়েছিল। নজরুল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন। আর আমার গল্পের নায়ক রাজনীতি করেন জাতীয়তাবাদী দলের। কিন্তু সেদিন নজরুলের লাশবাহী খাঁটিয়া তুলে নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে। সেদিন বিকৃত হওয়া নজরুলের লাশ কাঁধে নিতে অনেকেই ভয় পেয়েছিল। বিষয়টি আমাকে তার ব্যাপারে কিছুটা কৌতুহলী করে তোলে।

আমার সহকর্মী সামন হোসেনের সৌজন্যে মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের সঙ্গে একদিন ব্যক্তিগত পরিচয় ঘটে। ধীরে ধীরে তার সম্পর্কে নানা বিষয় জানার সুযোগ পাই। নারায়ণগঞ্জ বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতাকর্মী, নারায়ণগঞ্জের সাংবাদিকসহ নানা মানুষের মুখে। পরিচয়টা এক পর্যায়ে বন্ধুত্বে রূপ নেয়। মাঝে মাঝে আমাকে ফোন করতেন। কাওরান বাজারে আমাদের অফিসের নিচে আড্ডা দিতে আসতেন। যখন অর্ধশতাধিক মামলা কাঁধে নিয়ে ফেরারী জীবন কাটাচ্ছেন তখনো আমার কাছে ছুটে আসতেন। রাজনীতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের নানা গল্প করতেন। নিজেকে জাহির করতে বা হামবড়া ভাব দেখাতে দেখিনি। তার কণ্ঠে দু:খ থাকতো, হতাশা থাকতো কিন্তু দল ও দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থার প্রকাশ দেখিনি কোনোদিন।

দীর্ঘদিন ধরে তাকে দেখছি একজন ব্যতিক্রমী জনপ্রতিনিধির ভূমিকায়। সারাদেশে সকল সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডে নানা উন্নয়ন কর্মকা- হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সে সব উন্নয়নের বরাদ্দ থেকে ভাগ নেয়া আর চুরি করার কথা প্রায় প্রকাশ হয়। কিন্তু খোরশেদের ওয়ার্ডে রাস্তা সংস্কার থেকে শুরু করে প্রতিটি উন্নয়ন কাজ চলাকালে নিজে উপস্থিত থেকে তদারক করেন। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও মশা নিধনে নিয়মিত ফগার স্প্রেতে নিজে নেতৃত্ব দেন। ফলে আমি জানি, মানুষের পাশে দাঁড়ানো তার জন্য নতুন কোন কিছু নয়, ধারাবাহিকতা মাত্র।

কয়েকদিন আগে নারায়ণগঞ্জে করোনায় মৃত ব্যক্তির পরিবার যখন লাশ দাফনে সাহস পাচ্ছিল না তখন এই নির্ভিক লোকটি এগিয়ে যান। সুরক্ষা পোষাক পরে নিজ হাতে লাশ গ্রহণ ও দাফনের ব্যবস্থা করেছেন। সে দৃশ্যটি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কেবল তাই নয়, করোনায় মৃতদের দাফন-সতকারের দায়িত্ব নিতে প্রশাসনের কাছে আবেদনও করেছেন। বাজারে যখন স্যানিটাইজার পাওয়া যাচ্ছে না তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের ফর্মুলায় এবং নিজের কেমিস্ট বন্ধুদের সহায়তায় নিজেরই অর্থায়নে তৈরি করেছেন ৬০ হাজার বোতল স্যানিটাইজার। সেগুলো বিনামূল্যে নিজের এলাকায় বিতরণের পর অন্য এলাকার জন্য জেলা প্রশাসককেও দিয়েছেন। ঘরে ঘরে সেভলন সাবান, লিকুইড সাবান ও স্যানিটাইজার পৌছে দিয়েছেন। নিজের ওয়ার্ডের রাস্তায় সাধারণ মানুষের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা করেছেন। যানবাহন, মসজিদ-মন্দিরসহ পাবলিক প্লেসে জীবানুনাশক স্প্রে করেছেন। নিজে গাড়ি চালিয়ে জীবানুনাশক জল ছিটিয়েছেন এলাকায়। জনগণকে সচেতন করতে নিজেই মাইকিং করে যাচ্ছেন।

করোনা মহামারির মধ্যে যখন জনপ্রতিনিধিরা উধাও, দেশ যখন কিছু চাল চোর দেখতে পাচ্ছে, তখন একজন খোরশেদ ঘরে ঘরে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছে দিচ্ছেন। করোনা রোগীদের নিজ এলাকায় চিকিতসা না দিয়ে রাজধানীর উত্তরায় ক্ষমতাসীন দলের একজন কাউন্সিলর যখন লোকজন নিয়ে হাসপাতাল ঘেরাও করেছেন, তারও আগে বিএনপির কাউন্সিলর খোরশেদ নারায়ণগঞ্জে করোনা টেস্ট ল্যাব ও বিশেষায়িত হাসপাতাল চেয়ে জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে আবেদন করেছেন।
প্রশ্ন আসতে পারে, এতসব করছেন কি নিজের টাকায়? এতো টাকা পেলো বা পাচ্ছে কোথায়? উত্তর হচ্ছে, সে নিজের তহবিল থেকে যেমন খরচ করছে তেমনি সাহায্যের মুক্ত আবেদনও জানিয়েছেন। তিনি বিত্তবানদের সাহায্য নিচ্ছেন। তবে সেখানে পরিস্কার ঘোষণা দিয়েছেন- নগদ অর্থ গ্রহণ করা হয় না। তিনি স্যানিটাইজার তৈরির উপকরণ, ঔষুধপত্র ও খাদ্যসামগ্রিই সাহায্য হিসেবে বিত্তবানদের কাছে চেয়েছেন। যখন ঢাকা উত্তরের ক্ষমতাসীন দলের একজন কাউন্সিলর ত্রানের নামে বিপুল চাঁদাবাজি করেও ত্রাণ দেননি। মাঝে মাঝে ভাবি, আমাদের দেশের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধিরা যদি খোরশেদের মতো হতেন! সত্যিই সোনার বাংলা হতো বাংলাদেশ।

এমন মানুষের জন্য মাঝে মাঝে আফসোস হয়। নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে খন্দকার পরিবারের কাহিনী। তিন ভাই-ই জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করতেন। করতেন বললাম, কারণ তাদের ভাইয়ের সংখ্যা নেমে এসেছে দুইয়ে। বিএনপির রাজনীতি করে তারা স্বনামে খ্যাত হয়েছেন, সমাজে সম্মান পেয়েছেন সেটা বলা যায়, তবে আর কি কি পেয়েছেন সেটা বলা মুশকিল। তবে প্রাপ্তির চেয়ে বিএনপির রাজনীতির জন্য তাদের স্যাক্রিফাইসের পাল্লা নিশ্চিতভাবেই ভারী। রাজনীতি করতে গিয়ে এক ভাইকে হারিয়েছেন। ভাই হারানোর বিচারও পাননি। বহু রাম-শ্যাম, যদু-মধু ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে সংসদে গেলেও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হবার সৌভাগ্য হয়নি তাদের। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের একদিন আগে আওয়ামী লীগের সুশীল প্রার্থীর সমর্থনে (যিনি মেয়র হবার পর খালেদা জিয়াকে নারায়ণগঞ্জে জনসভা করার অনুমতি দেননি) কেড়ে নেয়া হয়েছে তৈমুর খন্দকারের সমর্থন। অর্থ কিংবা লবিংয়ের কাছে খন্দকার পরিবারের সদস্যরা বঞ্চিত হয়েছেন বারবার। ২০১৫ সালে বিএনপি যখন লাগাতার আন্দোলন করছিল তখন আওয়ামীলীগ নারায়ণগঞ্জে খালেদা জিয়ার ব্যঙ্গচিত্র সম্বলিত পোস্টার সাটিয়েছিল। পরদিন ঘোষণা দিয়েই নিজের এলাকা থেকে খোরশেদ সে পোস্টার ছিঁড়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু সেদিনের সে সাহসী কাজটিই পরে তার অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা হয়েছে দলের শীর্ষমহলে। দলের ইঁদুর প্রজাতির নেতারা এই বলে শীর্ষ নেতৃত্বের কানভারি করার চেষ্টা করেছে যে, খোরশেদ খালেদা জিয়ার পোস্টার পুড়িয়েছে! নারায়নগঞ্জে বিএনপির অনেক হেভিওয়েট নেতা আছে। তারা অতীতে বড় পদ-পদবিসহ অনেক সুবিধা পেয়েছে, ভবিষ্যতেও তারাই পাবে। কিন্তু খোরশেদের মত জনগণের নেতা হতে পারবে না৷ রাজনীতি যদি জনগনের জন্য হয় তাহলে খোরশেদেই সত্যিকারের নেতা। রাজনীতির এইসব রত্ন কি দলের নীতিনির্ধারকদের নজরে আসে?

এই লেখাটি শেষ করে যখন পোস্ট করতে যাচ্ছি, তখন তাকে অনলাইনে দেখে ভিডিও কল দিলাম। দেখলাম, তিনি পিপিআই পরিধান করছেন। প্রশ্ন করলে বললেন- আজ তিনজনকে দাফনের দায়িত্ব পেলাম, সেখানে যাচ্ছি। মনটা ভরে গেল। নিশ্চয়ই চলমান দুর্যোগেরও নিরসন হবে একদিন। আমি নিশ্চিত আগামী দিনেও পুলিশ মিথ্যা মামলা দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠাবে। ভবিষ্যতেও তার যথাযথ মূল্যায়ন করবে না বিএনপি। তথাপি, সে সম্ভাব্য নতুন দুর্যোগে সে বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে মানুষের পাশে। এটাই মানবতাবাদীর ধর্ম।

কাফি কামাল
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার মানবজমিন

Hits: 6


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ