অপরাধের অভিযোগ উঠলেই কাউকে ঘিরে ধরছে একদল মানুষ। শুরু হচ্ছে মারধর, অনেক ক্ষেত্রে তা গড়াচ্ছে হত্যাকাণ্ডে। চুরি, ধর্ম অবমাননা কিংবা সন্দেহের বশে দলবদ্ধ হামলার শিকার হচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মানবাধিকার সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতার এক হাজার ১৩৪টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮৬৮ জন, আহত ৮৬১ জন। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মব সহিংসতার ঘটনা ও প্রাণহানি কমেছে। পরিসংখ্যানের এই পার্থক্যের মধ্যেও একের পর এক হত্যাকাণ্ড, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে না আসায় উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
এমএসএফের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মব সহিংসতার ১৬৯টি ঘটনায় ১৪৬ জন নিহত ও ১২৬ জন আহত হন। ২০২৫ সালে ৪২৮টি ঘটনায় নিহত হন ৪৪৬ জন, আহত ১৬০ জন। চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩৭টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৫৬ জন, আহত ৫৭৫ জন। সব মিলিয়ে এ সময় নিহত ও আহতের সংখ্যা এক হাজার ৭২৯।
অন্যদিকে, মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৫৫ জন। এর মধ্যে ২০২৫ সালে নিহত হন ১৬৮ জন ও আহত হন ২৪৮ জন। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ৩৯৮টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৮৭ জন, আহত ৪০১ জন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মব সহিংসতায় ১৭১ জন নিহত হয়েছেন। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৯৮ এবং ২০২৪ সালে ১২৮।
শিশু হাসপাতালে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ: সর্বশেষ বুধবার রাতে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের সামনে মো. আলম শেখ (৪১) নামের এক ব্যক্তিকে শিশু চোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ জানায়, আলম মানসিক ভারসাম্যহীন ছিলেন। তাঁর মস্তিষ্কে স্ট্রোকের সমস্যাও ছিল বলে পরিবার জানিয়েছে।
শেরেবাংলানগর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রিমন মিয়া বলেন, বুধবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, শিশু ওয়ার্ডের সামনে ঘোরাঘুরি করার সময় আলমকে শিশু চোর সন্দেহে মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের নিচে নামিয়ে পেটানো হয়।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পরে তাঁকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আঙুলের ছাপের মাধ্যমে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি রাজধানীর রূপনগর এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন।
এর আগে ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে দুই দফায় পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। প্রথম দফায় মারধরের পর পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছিল। পরে একদল লোক হাসপাতালে ঢুকে তাঁকে নিয়ে গিয়ে আবারও মারধর করে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার আলীনগর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ বাজারে তাইজুল সরদার (২২) নামের এক যুবকও পিটুনিতে নিহত হন। তিনি সদর উপজেলার চর কুলপদ্বী এলাকার রুস্তম আলী সরদারের ছেলে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হামলা ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় আহত হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত দুই ভাইকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের হিসাবে কমেছে ঘটনা: পুলিশ সদর দপ্তরের অপারেশন্স কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতার ১০৭টি ঘটনায় ৬৩ জন নিহত ও ৮২ জন আহত হন। ২০২৬ সালের একই সময় ৬৩টি ঘটনায় নিহত হন ৪০ জন এবং আহত হন ৬৫ জন। অর্থাৎ পুলিশের হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রাণহানি কমেছে ২৩ জন।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত তুলনামূলক চিত্রে এ তথ্য জানানো হয়। পুলিশের হিসাবে ২০২৫ সালের মার্চে সর্বাধিক ২৯টি ঘটনা ঘটে। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে ১৮টি ঘটনায় নিহত হন ১৩ জন। চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে আগস্টে সর্বাধিক ১১টি ঘটনা ঘটে; এতে নিহত হন আটজন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আগের তুলনায় মব সহিংসতা কমেছে। যেকোনো ঘটনায় সরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ায় এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা কমে আসছে।
‘আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার নেই’: পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মব সহিংসতার অনেক মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। এসব ঘটনায় অনেক মানুষ জড়িত থাকায় তদন্তে জটিলতা তৈরি হয়। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির কারণে মব সহিংসতা বাড়ছে। কারো বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননা বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠলেও তাঁকে গণপিটুনি দেওয়া কিংবা হত্যা করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। অপরাধের বিচার করার দায়িত্ব আদালত ও আইনানুগ কর্তৃপক্ষের।
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও বা অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও তা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অজুহাত হতে পারে না। গুজব ও উসকানি প্রতিরোধে প্রশাসনকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তির জীবন, নিরাপত্তা ও চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।













