মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে আনোয়ার শাহজাহানের গবেষণা এবং আমার স্মৃতি

Pub: Tuesday, May 19, 2020 4:49 AM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইমরান আহমেদ চৌধুরীঃ
স্বাধীনতাযুদ্ধ আমার জীবনের ঘটে যাওয়া একটা সবচেয়ে বড় অধ্যায়। স্বাধীনতা সংগ্রাম আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে ভিন্ন ভাবে। ১৯৭১ থেকে ২০২০ সাল এই ৪৯ টি বছর যাবত বহন করে আসছি এক বিশাল গল্প। এক বিভীষিকাময় অন্নুছেদ, এক দুঃস্বপ্ন, মহা এক আতঙ্ক, এক ভয়, এক ভীতি, এক যন্ত্রণা এবং এক না বলা বিরগাথা। সেই উত্তাল দিন গুলোর কথা বার বার প্রত্যহ মনের পর্দায় ভেসে উঠে। জীবন থেকে উড়ে গেছে ঘটনাবহুল এই কয়েকটি মাস ; আপাতঃ দৃষ্টিতে যদিও মনে হবে অল্প কয়েকটা দিন কিন্তু বাস্তবতায় ঐ দিন গুলো ছিল বাঙ্গালী জাতির জীবনের তথা আমার জীবনের সবচে কঠিন সময় ; এ রকম সময় আমি চাই না অথবা আশাও করিনা, আসুক আর কোন আমার মত ১১ বছর বয়সী বালকের জীবনে এই পৃথিবীর কোন দেশে। সে যেন এক বিভীষিকাময় প্রহর। শত্রুর বিমান হামলা, শহরের দুই প্রান্ত থেকে শত্রুর অনুপ্রবেশ – গগন বিদারী গোলাগুলির আওয়াজ, বিমানের ভূমিকম্পসম বিদীর্ণ আওয়াজ, ভয়ঙ্কর ভাবে অপ্রকিতস্তু হবার মত গুলিবর্ষণ ,ও বোমা বর্ষণ।

তাইতো হৃদয়ের স্পন্দের সাথে গাঁথা স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং তার ইতিহাস নিয়ে যেই অনুসন্ধান, আবৃতি, বই লেখে অবচেতন মনেই কেমন জানি অমোঘ ভাবেই পৌঁছে তার নিকট, খুঁজে পাই এক অবারিত সংহতি, এক পারস্পরিক নির্ভরতা তারই পথ ধরে আমার সাথে লেখক-গবেষক আনোয়ার শাহজাহানের আত্মিক এক সম্পৃক্ততা।

স্বাধীনতাযুদ্ধে রাষ্ট্রীয় খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনবৃত্তান্ত ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁদের বীরত্বগাঁথা নিয়ে ৭৫৬ পৃষ্ঠায় দুই খন্ডে লেখা তাঁর বই ‘’স্বাধীনতাযুদ্ধে খেতাবপ্রাপ্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা’’, “সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধ” এবং ”সিলেটের খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ‘’ আমার বুক সেল্ফে ”স্বাধীনতাযুদ্ধ ‘’ সেকশনে খুব যত্ন করে সাজানো এক গুচ্ছ বই। যখনই স্বাধীনতাযুদ্ধ নিয়ে ভাবি, রিসার্চ করি, লেখি, স্মৃতিচারণ করি তখনি অন্যান্য বই গুলোর মধ্যে এই চারটি বই কেও বের করে এনে পাতার পর পাতা উলটাই, পড়ি, টেক্সট হাই লাইটার দিয়ে মার্কিং করি আর হারিয়ে যাই ১৯৭১ এর সেই স্মৃতির বিভীষিকায় অতল গর্ভে। সিলেটের এর মুক্তিযুদ্ধের সাথে আমার সম্পৃক্ততা খুবই সুনিবিড় – ২৭ই মার্চ ১৯৭১ সালে সকাল ৯-১৫ মিনিটে শমশেরনগর বিমান বন্দরে আমার পিতার (এ, ডি ফজলুল হক চৌধুরী) নেতৃত্বেই প্রথম বিদ্রোহ রচিত হয়েছিল। উনি তার ই.পি.আর কোম্পানি নিয়েই প্রথম আক্রমণ করেই পাকিস্তানি আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, তারপর সিলেট আক্রমণ, কৈলাসশহর, করিমগঞ্জ, মাসিমপুর হয়ে ৪ নম্বর সেক্টর এর কর্নেল সি আর, দত্ত, ক্যাপ্টেন রব এর সাথে সিলেট দখল করে।

আমিও হারিয়েছি আমাদের অগ্রজ কে এই মুক্তির সংগ্রামে, আমাদের বড় ভাই শহীদ বাবুল চৌধুরী (যে একজন সিলেট রাজা জি, সি, স্কুলের ছাত্র ছিল) কে পাকিস্তান আর্মি ২১সে নভেম্বর ১৯৭১ সালে – ঈদ উল ফিতর এর দিন বন্দী অবস্থায় ব্রাহ্মণবাড়ীয়া তে হত্যা করে।

আনোয়ার শাহজাহানের লেখা এই বইগুলো সত্যি প্রশংসার দাবিদার, অত্যন্ত যত্ন সহকারে অনুসন্ধান করে তিনি বের করছেন সব খেতাবপ্রাপ্তদের নাম গুলো। আমার এখনো মনে আছে ১৯৭৩ সালে যখন এই খেতাবপ্রাপ্তদের নাম ইত্তেফাক পত্রিকায় বের হয় তখন বয়স ১৩ বছর। ব্যক্তিগত জীবনে সিলেটের অনেক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার সাথে আমি পরিচিত। বি,ডি, আর এর নায়েক আরব আলি বীর বিক্রম আমার পিতার খুব প্রিয়ভাজন ছিলেন। তারপর তাহের আলী বীর বিক্রম আমার কোম্পানির সিনিয়র জেসিও ছিলেন অনেক দিন, নিভৃতে রাতে ওনার কাছ থেকে শুনতাম তার একাত্তরের বীরগাঁথা। এখনো মাঝে মাঝে সুদূর ইংল্যান্ড থেকে ফোনে কথা বলি তাহের বীর বিক্রমের সাথে। সিরাজুল ইসলাম (ভিপি সিরাজ) বীরপ্রতীক আমার অত্যন্ত পরিচিত শ্রদ্ধাভাজন অগ্রজতুল্য, প্রচারণা বিমুখ এক মহাবীর। উনার মুখেও শুনেছি তাঁর বীরত্বের ইতিহাস। আমি বিমুগ্ধ হয়েছি আমাদের যুদ্ধের পরে জন্মগ্রহণকারী লেখক ও গবেষক আনোয়ার শাহজাহান তাঁর মাতৃভূমির স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামের প্রতি উৎসর্গ করেছে তাঁর লেখনী তা’ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

আনোয়ার শাহজাহানের অন্য আরেকটি বই ‘’সিলেটে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও সৌধ‘’ একটি অত্যন্ত প্রশংসনীয় লেখনী। তাঁর এই বইটি আগামী শতাব্দের পর শতাব্দী ধরে আমাদের আগামী প্রজন্মের কাছে একটি কালের সাক্ষী হিসেবে কাজ করবে। আমি এই বইটার জন্য তাঁকে ভূয়সী প্রশংসা করি। তাঁর এই বই এর ৩৪ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হাবিলদার গোলাম রসুল বীর বিক্রম আমার পিতার ই.পি, আর, কোম্পানির সদস্য ছিল ; ৩ উইং ই, পি, আর এর বি কোম্পানির। গোলাম রসুল দের কবর টাও আমার পিতার হাতে দেওয়া।

পরিশেষে, আমি আনোয়ার শাহজাহানকে জানাই আমার শুভেচ্ছা এবং কৃতজ্ঞতা তাঁর এই ইতিহাস লেখনীর মত মহৎ কাজ টি হাতে নেওয়ার জন্য। আশা করি, যে যুগ যুগ ধরে আমাদের আগামী প্রজন্মরা পড়ুক এবং তারা জানুক কি আত্মত্যাগ এর মাধ্যমে আমাদের বাংলা মায়ের শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিসেনারা এই দেশটি উপহার দিয়েছে তাদেরকে।

বিন্রম শ্রদ্ধা জানাই সকল মুক্তিযোদ্ধাদের কে।

তথ্য সূত্রঃ
১। মুক্তিযুদ্ধে রাইফেলস ও অন্যান্য বাহিনী ; সুকুমার বিশ্বাস

২। 1971 Resistance, Resilience & Redemption ; Major General Md Sarwar Hossain

৩। বাংলার ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধ ; মোহাম্মদ আব্দু ল হাদী

৪। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ; দলিল ; নবম খন্ড: সশস্ত্র সংগ্রাম (১); দশম খন্ড: সশস্ত্র সংগ্রাম (২); একাদশ খন্ড: সশস্ত্র সংগ্রাম (৩)

৫। হানাদার মুক্ত সিলেট ; মেজর জেনারেল সি, আর, দত্ত , বীর উত্তম

৬। বাংলার ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধ ; মোহাম্মদ আব্দু ল হাদী

৭। হানাদার মুক্ত সিলেট ; মেজর জেনারেল সি, আর, দত্ত , বীর উত্তম

।।

ল্যেফটেনান্ট ইমরান আহমেদ চৌধুরী
লেখক, ইতিহাসবিদ ও গবেষক
নর্থহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।

Hits: 50


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ