মানুষই যদি না বাঁচে- রাজনীতির কোনও অর্থ থাকে না

Pub: Friday, May 15, 2020 7:20 PM
 
 
 

শীর্ষ খবর ডটকম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের ভবিষ্যত ভয়াবহতা, কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে সরকারের নানা প্রণোদনা, বেগম জিয়ার অন্তর্বর্তীকালীন মুক্তি, করোনা পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির সফলতা ও ব্যর্থতা এবং চলমান সংকটময় পরিস্থিতিতে বিএনপির ভূমিকাসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে মুখোমুখি হয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, কৃষক দলের আহ্বায়ক, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক শামসুজ্জামান দুদু। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শীর্ষ সারির এই ব্যক্তিত্বের কথায় উঠে এসেছে হালের নানা বাস্তবতা ও বহুমাত্রিক অসঙ্গতি, করণীয় নিয়ে নানা কথাবার্তা।

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের ভবিষ্যত ভয়াবহতা কেমন দেখছেন?

শামসুজ্জামান দুদু : করোনা ভাইরাস এমন একটি ভাইরাস যা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা এখনও পর্যন্ত এ ভাইরাসের গ্রহণযোগ্য প্রতিষেধক বের করতে পারেন নাই। কিন্তু তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, এই বছরের শেষ নাগাদ অথবা দুই বছরের মধ্যে তারা এই ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে পারবেন।

স্বাভাবিকভাবেই আমরা একেবারেই গরিব দেশ না, মধ্যবিত্ত দেশ। সেই হিসেবে আমাদের দেশে করোনা ভাইরাসের মোকাবিলা একটু কঠিন, আমার কাছে মনে হয়। সরকার মার্চের ৮ তারিখ প্রথম করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করে। এখন নমুনা পরীক্ষা যত বেশি করছে ততো রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমার মনে হয় সারা দেশে যদি আরও পরীক্ষার ব্যবস্থা বেশি করা হতো তাহলে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তো। তবে আমার দেশের চিকিৎসার ক্ষেত্রটা একেবারেই নগন্য। চিকিৎসকের অভাব আছে, আছে সরঞ্জামেরও অভাব। সেজন্যই শুরু থেকেই বলা হয়েছে ঘরে থাকার জন্য, বেশি বেশি করে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার জন্য।

এখন এই করোনা ভাইরাসের ভবিষ্যতটা কী হবে সেটা অনুমান করা কঠিন। যতদিন পুরোপুরিভাবে লকডাউন ছিল ততদিন কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যাও কম ছিল। মিল, কল-কারখানা খুলে দেয়া হয়েছে। কিছু কিছু ক‌রে দোকানপাট খু‌লে দেয়া হ‌চ্ছে। যদিও অফিস, গণপরিবহন, ট্রেন এখনও বন্ধ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে মিল কল কারখানা খুলে দেয়ার কারণে ঢাকামুখি মানুষের ঢল বাড়ছে। মেলামেশাও বেশি হয়েছে। হয়তোবা তার কারণেই আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বাহিরে বের হলে বা একে অপরের কাছাকাছি আসলে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা যেমন বেশি থাকে, তেমনি ঘরে থাকলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রবল। সরকারের যদি উদ্যোগ না থাকে অর্থাৎ খাবার, টাকা-পয়সা অভাবী মানুষের কাছে না পৌঁছে দেয় তাহলে পেটের দায়ে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ বাহিরে বের হবে। কারণ আমাদের দেশে ৭০ থেকে ৮০ পার্সেন্ট মানুষ অভাবী। আর মধ্যবিত্ত যাদেরকে আমরা বলি, তারাও দিনের পর দিন মাসের পর মাস কর্মহীন ঘরে বসে থেকে এখন অভাবে আছে। তাদেরকে (গ‌রিব-অভা‌বী‌দের) যদি খাবার টাকা-পয়সা পৌঁছে দেয়া যেতো তাহলে করোনাও এতটা বিস্তার লাভ হয়তো করতো না।

দোষারোপের রাজনীতি থেকে বের হয়ে এই সংকট মোকাবিলায় দেশের সব রাজনৈতিক দল এক হতে পারলো না কেন?

শামসুজ্জামান দুদু : শুধু আমাদের বাংলাদেশ এক হয় না। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সরকারের আহ্বান, উদ্যোগে রাজনৈতিক শক্তি পেশাজীবীরা এক জায়গায় এসে দাঁড়ায়। এসবের চেয়ে আরেকটি মুখ্য বিষয় হচ্ছে, বিরোধীদলের কাজ হচ্ছে সরকারের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরা। আর সরকারের কাজ হচ্ছে সেই দোষ-ত্রুটিগুলো যতটা সম্ভব সংশোধনের চেষ্টা করে দেশকে এগিয়ে নেয়া। সরকার সংশোধন করতে না পারলে সেক্ষেত্রে সকল পেশাজীবীরা, রাজনৈতিক দলগু‌লো‌কে একত্রিত করে সেই সংশোধনের কাজটা করতে হয়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিরোধী দল অগ্রগামী ছিল, তারা সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল, এখনো চায়। কিন্তু সরকার এক টেবিলে বসতে চায়নি।

এটা সত্য যে, দেশের দুটি বড় দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাথে আবার ছোট ছোট কিছু দলও আছে। এখন দেশের ক্রান্তিলগ্নে এই দুই দল যদি একত্রিত হয়ে কাজ করতো তাহলে অনেক কিছুই সফল করা সম্ভব ছিল। যেমন, অভাবী মানুষের লিস্ট যদি বিএনপিও করতো আওয়ামী লীগও করতো তাহলে দুটো লিস্ট হতো, আর যদি এক জায়গায় বসে করতো তাহলে একটা হতো। যেমন ১৯৭১ সালে সবাই একত্রিত হয়ে দেশ স্বাধীন করেছি, যেমন নব্বইয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে স্বৈরাশাসকের পতন ঘটানো হয়েছিল, তেমনিভাবে এই করোনা পরিস্থিতিতেও দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনও বিকল্প ছিল না, এখনও নেই। আমি মনে করি, এখনও সময় আছে, একত্রিত হয়ে কাজ করলে এই মরণঘাতী ভাইরাস থেকে সহজভাবে বাঁচা যা‌বে। সেই ঐক্য সৃষ্টির জন্য সরকারকেই প্রথম উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ, দেশের মানুষের জীবন বাঁচানো এখন সবকিছুর ঊর্ধ্বে।

কৃষকদের জন্য সরকার বড় অংকের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে। বিভিন্ন কৃষিঋণের কথাও বলা হচ্ছে। এসব প্রসঙ্গে কিছু বলুন।

শামসুজ্জামান দুদু : প্রণোদনা যেটা ঘোষণা করা হয়েছে সেটা যদি কৃষকরা পায় তাহলে তো কৃষকরা খুশি হবে। তবে এখন পর্যন্ত যারা প্রণোদনা পেয়েছে তাদের মধ্যে কৃষকের চেয়ে উচ্চবিত্তদেরই বেশি দেখা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমরা সরকারকে বলেছিলাম কৃষকের কাছ থেকে যদি সরাসরি ধান কিনে তাহলে কৃষকরা লাভবান হবে। কিন্তু এখন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কারণ সরকার ধানের মূল্য নির্ধারণ করেছে মণে এক হাজার টাকার উপরে । কিন্তু কৃষক সেই ধান বাজারে বিক্রি করছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে। এখন সরকার যেটা নির্ধারণ করেছে সেই দাম দিয়ে যদি সরকার সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনে নি‌তো তাহলে কৃষক কিছু টাকা বেশি পেতো, তারা লাভবান হতো।

আবার দ্বিতীয় বিষয় হলো- সরকার যদি সরাসরি সার, তেল, বীজ কৃষকের হাতে পৌঁছে দিতো তাহলেও কৃষক লাভবান হতো। আর প্রণোদনা যদি কাগজে কলমে থাকে তাহলে কৃষক লাভবান হবে না। আরেকটি বিষয় হলো সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকের জন্য যে সাহায্য দেয়া হয় তা বিভিন্ন নেতাকর্মীরা দুর্নীতি করে লুটেপুটে নেয়ার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে। সে বিষয়ে সরকারের আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে সরকার যে প্রণোদনা ঘোষণা করেছে তা প্রান্তিক কৃষকের হাতে পৌঁছুবে।

দেশের এই সংকটকালে বিএনপি মানুষের কাছে কী বার্তা দিতে চায়?

শামসুজ্জামান দুদু : এই সংকটকালে প্রধান কথা হচ্ছে, মানুষকে বাঁচাতে হবে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। শুধু একা কেউ এই দুর্যোগের মোকাবিলা করতে পারবে না। দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। মানুষই যদি না বাঁচে তাহলে রাজনীতি আর রাজনৈতিক দলের কোনও অর্থই নেই। সেজন্য প্রথম কথা হচ্ছে, মানুষকে বাঁচানোর জন্য যা যা করা দরকার বিএনপি তাই করবে বা করতে চায়। সেই পথে যত প্রতিবন্ধকতাই আসুক। গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক নির্যাতনে বিএনপির কর্মীরাও সর্বহারা হয়ে গেছে। সেই সর্বহারা মানুষরাও এখন মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, এটাই বিএনপির নিয়ম।

বেগম খালেদা জিয়ার ৬ মাসের অন্তর্বর্তীকালীন মুক্তি নিয়ে বিএনপির ভাবনা কী?

শামসুজ্জামান দুদু : বেগম খালেদা জিয়া আসলেই অসুস্থ। বিশেষ ক্ষমতাবলে প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে তাঁকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। তবে এটা আদালত থেকে দিলে আরও ভালো হতো। প্রধানমন্ত্রী তাঁকে মুক্তি দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার নামে যে মামলা, এটা মিথ্যা মামলা। এটা রাজনৈতিকভাবে দেখা হচ্ছে। তবে সরকার আর রাজনৈতিকভাবে দেখবে না, এটাই আমরা আশা করি।

কৃষি ও কৃষক বাঁচাতে সরকারের কী কী পদক্ষেপ নেয়া উচিত মনে করেন?

শামসুজ্জামান দুদু : প্রথম কথা হচ্ছে, সত্যিকার অর্থে কৃষকের পাশে দাঁড়াতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এক ইঞ্চি জমিও যেন খালি না থাকে। এখন এক ইঞ্চি জমি খালি রাখাটা তো কৃষকের হাতে না। কৃষকের সার, বীজ, তেলের সঠিকভাবে ব্যবস্থা করতে হবে। আমি মনে করি, এগুলো কৃষকদের ফ্রি দেয়া উচিত। এ বছর দেবে, পরের বছর আদায় করে নেবে। তাহলে কৃষক কোনও আবাদি ভূমি খালি রাখবে না। আর কৃষিঋণ পরিপূর্ণভাবে মওকুফ করে দিতে হবে। বেগম জিয়া দুইবার দিয়েছিলেন। এই সাহায্যগুলো যদি আমরা কৃষকদের করতে পারি তাহলে কৃষি ও কৃষক বাঁচবে এবং দেশ আরও সফলভাবে এগিয়ে যাবে।

করোনা পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে কোন দল কতটুকু সফল ও ব্যর্থ?

শামসুজ্জামান দুদু : এটা বলার সময় এখন আসছে বলে আমার মনে হয় না। তবে বিরোধী দল ও সরকার তাদের যতটুকু সামর্থ্য আছে সে অনুযায়ী যদি কাজ করে তাহলে সফলতা ও ব্যর্থতা ইতিহাস নির্ধারণ করবে।

সময় দি‌য়ে কথা বলার জন‌্য আপনাকে ধন্যবাদ।

শামসুজ্জামান দুদু : আপনাকেও ধন্যবাদ।

Hits: 235


  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Print

শীর্ষ খবর/আ আ