• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • [email protected]

মতামত

বলাৎকার: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনের প্রয়োজন

প্রকাশ: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪:২৯
আপডেট: রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪:২৯

 

ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ লন্ডন
বলাৎকার বা ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ এবং মানুষের মৌলিক অধিকার ও মর্যাদার চরম লঙ্ঘন। বিশেষ করে কোনো শিশু যখন শিক্ষার উদ্দেশ্যে একটি প্রতিষ্ঠানে যায় এবং সেই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মচারী কিংবা দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির দ্বারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়, তখন এর ক্ষতি বহুমাত্রিক হয়ে ওঠে। কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি শিশুর কাছে নিরাপদ আশ্রয় ও জ্ঞান অর্জনের স্থান হওয়ার কথা। সেই স্থানেই যদি তার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, তাহলে তার মনে শিক্ষা, শিক্ষক এবং প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসায় শিশু যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক কয়েকটি প্রতিবেদনে মাদ্রাসায় শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার অভিযোগ এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি জোরদারের প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে এসেছে। তবে এসব ঘটনা থেকে সারা দেশের মাদ্রাসাগুলো সম্পর্কে সাধারণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। বরং প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার হওয়া জরুরি।

আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝুঁকির একটি বিশেষ দিক রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক বা তত্ত্বাবধায়কদের ওপর নির্ভরশীল থাকে। এই নির্ভরতার সুযোগ নিয়ে কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে শিশুর পক্ষে প্রতিবাদ করা বা ঘটনাটি প্রকাশ করা কঠিন হতে পারে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে আবাসিক মাদ্রাসায় এক শিশুর ওপর বারবার যৌন নির্যাতনের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। একই প্রতিবেদনে শিশুটির আচরণে পরিবর্তন, চুপচাপ হয়ে যাওয়া এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় অনীহার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শিশু যৌন নির্যাতনের প্রভাব শুধু শারীরিক নয়; এটি মানসিক ও সামাজিক জীবনেও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। ভয়, লজ্জা, অপরাধবোধ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি, মানুষের প্রতি অবিশ্বাস এবং পড়াশোনার প্রতি অনীহা দেখা দিতে পারে। তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে—নির্যাতনের জন্য শিশুকে কোনোভাবেই দায়ী করা যায় না। অপরাধীর দায় অপরাধীরই। ভুক্তভোগী শিশুকে দোষারোপ বা অপমান না করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং নিরাপদ পরিবেশে সহায়তা করা সমাজের দায়িত্ব।

এ সমস্যা মোকাবিলায় শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তির ব্যবস্থা করলেই যথেষ্ট নয়। প্রতিটি আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিখিত Child Safeguarding Policy, শিক্ষক-কর্মচারীদের আচরণবিধি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ ও গোপন অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা থাকা দরকার। বাংলাদেশে আবাসিক শিশু পরিচর্যা প্রতিষ্ঠান নিয়ে UNICEF-এর একটি জাতীয় মূল্যায়নও লিখিত শিশু-সুরক্ষা নীতি, কর্মীদের আচরণবিধি এবং বাধ্যতামূলক নিয়মিত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও যথাযথ যাচাই ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শুধু শিক্ষাগত যোগ্যতা বা ধর্মীয় জ্ঞান একজন ব্যক্তিকে শিশুদের সঙ্গে কাজ করার জন্য যথেষ্ট করে না; শিশু সুরক্ষা, পেশাগত আচরণ, ব্যক্তিগত সীমারেখা ও নৈতিক দায়িত্ব সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। পাশাপাশি কোনো শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে সেটি ধামাচাপা না দিয়ে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্ত করতে হবে।

এখানে অভিভাবকদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সন্তান আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, অতিরিক্ত ভয়, প্রতিষ্ঠানে যেতে অনীহা, অস্বাভাবিক নীরবতা বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলার মতো লক্ষণ দেখালে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে জানতে হবে। শিশুর কথা অবিশ্বাস বা ধমক না দিয়ে শান্তভাবে শুনতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও আইনগত সহায়তা নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সামাজিক নীরবতা ভাঙা। শিশু নির্যাতনের ঘটনা গোপন করে রাখলে অপরাধী আরও সাহস পেতে পারে এবং অন্য শিশুরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে। তাই সমাজের সচেতন নাগরিক, শিক্ষক, অভিভাবক, ধর্মীয় নেতা, সাংবাদিক, মানবাধিকার সংগঠন এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তবে সামাজিক আন্দোলন যেন কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, মাদ্রাসা বা সম্প্রদায়কে আক্রমণের মাধ্যম না হয়; আন্দোলনের লক্ষ্য হতে হবে শিশুর নিরাপত্তা, অপরাধীর জবাবদিহি এবং নিরাপদ শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—মাদ্রাসা হোক বা সাধারণ বিদ্যালয়—কোনোটিই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। UNICEF-ও ২০২৬ সালে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে স্কুল, মাদ্রাসা ও অন্যান্য শিশু-সেবা প্রতিষ্ঠানে শক্তিশালী জবাবদিহি, রিপোর্টিং ব্যবস্থা এবং মনোসামাজিক সহায়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

অতএব, শিশুদের নিরাপত্তাকে কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম বা কোনো ব্যক্তির মর্যাদার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। একটি অভিযোগকে অযথা প্রচার না করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো, নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এবং প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া—এই নীতিই হওয়া উচিত আমাদের পথ। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী শিশুর গোপনীয়তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যে শিক্ষক জ্ঞান ও নৈতিকতার শিক্ষা দেওয়ার কথা, তার হাতে কোনো শিশুর নির্যাতিত হওয়া শুধু একটি শিশুর প্রতি অন্যায় নয়—এটি শিক্ষা ও সামাজিক আস্থার ওপরও আঘাত। তাই বলাৎকার ও সব ধরনের শিশু যৌন নির্যাতনের বিরুদ্ধে আমাদের সামাজিক অবস্থান হতে হবে স্পষ্ট: শিশুর নিরাপত্তায় কোনো আপস নয়, অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো গোপনীয়তা নয় এবং ভুক্তভোগীর প্রতি কোনো দোষারোপ নয়।

 

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ
উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রাকেস)
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: [email protected]

© Copyright . শীর্ষ খবর ডট কম