মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার সভাপতি ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন
একটি প্রশ্ন যা রাষ্ট্রকে করতে হবে
মালিক বড় না কর্মকর্তা বড়? রাষ্ট্রের মালিক জনগণ।- এই প্রশ্নটি শুধু একটি স্লোগান নয়, এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ব্যবস্থার মূল সংকটকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
আমরা আমাদের প্রচার মাধ্যম – রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম – বাংলাদেশ টেলিভিশন বিটিভিকে কলুষিত করতে দেওয়া যাবে না।” চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশে এই দাবিটি আর কোনো দল বা ব্যক্তির দাবি নয়, এটি এখন জনআকাঙ্ক্ষা।
প্রশ্ন হলো, বিটিভি কি সত্যিই জনগণের? নাকি এটি আজও কোনো সরকারের মুখপাত্র হিসেবেই রয়ে গেছে?
১. ইতিহাসের দায়: বাকশাল থেকে বহুদলীয় গণমাধ্যমের যাত্রা
বাংলাদেশের গণমাধ্যমের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল চেতনা ছিল ভৌগোলিক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, যার মূল শর্ত বাক, চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা।
এটি ঐতিহাসিক সত্য যে, স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে চারটি ছাড়া সকল পত্রিকা বন্ধ করে একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা কায়েমের মধ্য দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রুদ্ধ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেন। এই ইতিহাসকে অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু একই সাথে আমাদের মনে রাখতে হবে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সংগ্রাম কোনো একক ব্যক্তি বা দলের একক কৃতিত্বে শেষ হয়নি। এটি একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, পরবর্তীতে প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই মুক্ত গণমাধ্যমের দাবি ছিল প্রধান।
সমস্যা হলো, প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় এসে বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতারকে নিজেদের প্রচার যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে। আওয়ামী লীগ আমলে এই প্রবণতা চরম ফ্যাসিবাদী রূপ নিয়েছিল, যেখানে বিটিভি হয়ে উঠেছিল সরকারের উন্নয়ন প্রচারের একমুখী মাইক। সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
২. মূল প্রশ্ন: বিটিভি কার টাকায় চলে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুব সোজা। বিটিভি ও বাংলাদেশ বেতার জনগণের করের টাকায় চলে। প্রতি বছর জাতীয় বাজেট থেকে হাজার কোটি টাকা এই দুটি প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় হয়। বিদ্যুৎ বিলের সাথে আমরা বিটিভির লাইসেন্স ফি দিই।
তাহলে জনগণের টাকায় চলা প্রতিষ্ঠান জনগণের কথা বলবে না কেন? কেন সেখানে শুধু সরকারের মন্ত্রী-সচিবদের বক্তব্য প্রচারিত হবে? কেন কৃষকের ফসলের দাম না পাওয়ার খবর, শ্রমিকের মজুরি না পাওয়ার কান্না, ছাত্রের চাকরি না পাওয়ার হতাশা সেখানে গুরুত্ব পাবে না?
অন্যান্য দেশে গণমুখী প্রচারমাধ্যম রয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশে নেই।” বিবিসি ব্রিটিশ জনগণের টাকায় চলে, কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের মুখপাত্র নয়। এনএইচকে জাপানের জনগণের টাকায় চলে, কিন্তু জাপান সরকারের বিজ্ঞাপন সংস্থা নয়। তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ।
আমাদের বিটিভিকেও সেই মডেলে যেতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি সরকারি দপ্তর হিসেবে নয়, একটি স্বাধীন পাবলিক ব্রডকাস্টার হিসেবে।
৩. জুলাই চেতনা: গণমাধ্যম সংস্কারের স্পিরিট
একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, আমরা চাই না কোনো গণমাধ্যম সরকারের পক্ষে লিখুক। সরকারকে প্রশ্ন করুন। সরকারকে প্রশ্ন করলে সরকার আরও বেশি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
এটাই চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল স্পিরিট। এই অভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পতনের জন্য হয়নি, এটি একটি ব্যবস্থা বদলের জন্য হয়েছে। যে ব্যবস্থায় গণমাধ্যম সরকারকে প্রশ্ন করবে না, তোষামোদ করবে, সেই ব্যবস্থা ফ্যাসিবাদের জন্ম দেয়।
আজ বিটিভি যদি সত্যিই মুক্ত হতে চায়, তবে তাকে তিনটি কাজ করতে হবে।
প্রথম, কাঠামোগত সংস্কার: বিটিভিকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে একটি স্বাধীন কমিশনের অধীনে আনতে হবে, যেখানে সাংবাদিক, সুশীল সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং জনগণের প্রতিনিধিরা থাকবেন। মহাপরিচালক নিয়োগ হবে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে, কোনো সচিবের ইচ্ছায় নয়।
দ্বিতীয়, বিষয়বস্তুতে সংস্কার: বিটিভির সংবাদে প্রটোকল সাংবাদিকতা বন্ধ করতে হবে। আজ মন্ত্রী কোথায় ফিতা কাটলেন, সেটি সংবাদ নয়। সংবাদ হলো, কেন সেই প্রকল্প তিন বছরেও শেষ হলো না। বিটিভিকে গ্রামীণ বাংলাদেশ, প্রান্তিক মানুষ, সংখ্যালঘু এবং ভিন্নমতকে জায়গা দিতে হবে।
তৃতীয়, জবাবদিহিতা: বিটিভির আয়-ব্যয়, নিয়োগ, অনুষ্ঠান কেনার প্রক্রিয়া সবকিছু অনলাইনে প্রকাশ করতে হবে। জনগণ জানতে চায়, তাদের টাকা কোথায় খরচ হচ্ছে।
৪. ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থা: আলোচনার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে
তথ্য সচিবসহ কিছু কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। এই ক্ষোভের পেছনে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস আছে। কিন্তু আমরা মনে করি, আলোচনাটি ব্যক্তি থেকে ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়া উচিত।
কোনো একজন সচিব বা মহাপরিচালক বদলালেই বিটিভি মুক্ত হবে না, যদি কাঠামো একই থাকে। আজ যিনি আছেন, তিনি গেলেও একই কাঠামোয় অন্য একজন এসে একই কাজ করবেন। তাই দাবিটি হওয়া উচিত – বিটিভি আইন সংশোধন করে একে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।
রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এই সত্যটি প্রতিষ্ঠা করতে হলে আইন লাগবে। আবেগ দিয়ে প্রতিষ্ঠান চলে না, নীতিমালা দিয়ে চলে।
উপসংহার: বিটিভিকে ফিরে পাওয়ার লড়াই
আমাদের প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম বিটিভিকে আমাদের ফিরে পেতে হবে। না হলে রাষ্ট্রীয় এই গণমাধ্যম দিয়ে আমাদের লাভ কী?
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবাইকে খুঁজতে হবে। বিটিভি যদি জনগণের না হয়, তবে জনগণের টাকায় এটি চালানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই। হয় একে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিন, নয়তো বন্ধ করে দিন।
জুলাই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে, কোনো প্রতিষ্ঠানই জনগণের ঊর্ধ্বে নয়। বিটিভির ভবন, ক্যামেরা, ট্রান্সমিটার সবই জনগণের সম্পত্তি। সেখানে জনগণের কণ্ঠস্বরই প্রতিধ্বনিত হতে হবে, কোনো ফ্যাসিবাদের নয়।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যে মুক্ত গণমাধ্যমের স্বপ্ন দেখেছিলেন, জুলাইয়ের শহীদরা যে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য রক্ত দিয়েছে, সেই স্বপ্ন পূরণের প্রথম পদক্ষেপ হবে বিটিভিকে দলীয় প্রচার যন্ত্র থেকে মুক্ত করে সত্যিকারের পাবলিক সার্ভিস ব্রডকাস্টারে পরিণত করা।
সেই লড়াইয়ে আমরা সকলেই অংশীজন।
বার্তা প্রেরক :
মোহাম্মদ অলিদ বিন সিদ্দিক তালুকদার : জুলাই সংগঠক – বিটিভি রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সভাপতি ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ আন্দোলন













