ওয়েছ খছরু, সিলেট থেকে
রাত কেটেছে আতঙ্কে। ঢল নামছে। দরোজা দিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকছে পানি। বাইরে ভারী বর্ষণ। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। ভোরের দৃশ্যপটও একই। আফালে ঘর কাঁপছে। যে কোন সময় ধসে পড়তে পারে। কী আর করবো- দুই সন্তান নিলাম আমার কোলে ও এক সন্তান দিলাম স্ত্রীর কোলে। ঢলে গা ভাসালাম।
বিজ্ঞাপন
একটু দূরে গিয়ে পায়ের নিচে মাটির টাহর পেলাম। চিৎকার দিলাম; বাঁচাও বাঁচাও বলে। ঘণ্টা খানেক পর এক ব্যক্তি ছোট একটি নৌকা নিয়ে আমাদের উদ্ধার করলো। কথাগুলো বলছিলেন গোয়াইনঘাটের নোয়াগাঁওয়ের নিজাম উদ্দিন। ভয়ঙ্কর ছিল সেই সময়। নিজাম জানান, ‘মানুষের আর্তনাদ বারবার কানে আসছিল। সবাই উদ্ধারের জন্য আকুতি জানাচ্ছিল। আমিও ছিলাম তাদের একজন। জীবনের কখনো এ রকম মুহূর্তে পড়েননি বলে জানান তিনি।’ ১৫ দিন ছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। বাড়ি ফিরেছেন দু’দিন আগে। নিজাম জানিয়েছেন, ‘বাড়ি ফিরে দেখি ঘর বিধ্বস্ত। তাবু টানিয়ে এখন কোনোমতে বউ-বাচ্চা নিয়ে বসবাস করছি। রাতে বৃষ্টিতে ভিজে, দিনে শুকাই। এ রকমভাবে আমরা বসবাস করছি।’ শুধু নিজাম উদ্দিনই নয় গ্রামের রিপন আহমদের অবস্থাও একই।
আফালে বিধ্বস্ত হয়েছে ঘর। ঢল ভাসিয়ে নিয়েছে আসবাবপত্র। তাবুতেই করছেন বসবাস। রিপন জানিয়েছেন, ‘ঢল ও আফাল মিলে আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে ছিলাম ১৫ দিন। এখন ফিরে দেখি কিছুই নেই।’ সিলেটের গোয়াইনঘাটের নন্দিরগাঁও ইউনিয়ন। সালুটিকরের পার্শ্ববর্তী এলাকা। উজানের ঢল ও ভারী বর্ষণ তছনছ করে দিয়েছে পুরো এলাকা। বিশেষ করে হাওর এলাকার মানুষজন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ঘর নেই- বসবাসের জায়গাও নেই। অনেকেই বসবাস করছেন অন্যের বাড়িতে। কেউবা আছেন আশ্রয়কেন্দ্রে। ইউপি চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম নিজেও ওঠেন আশ্রয়কেন্দ্রে। জানান, ‘১৬ই জুন বৃহস্পতিবার। পরিবার নিয়ে নতুন বাড়িতে ছিলাম। পানি উঠে যাওয়ায় বিকালে পুরান বাড়িতে আশ্রয় নেই। রাতে সেখানেও ঢলের হানা। কোনোমতে রাত পাড়ি দিয়ে সকালে পরিবার নিয়ে ছুটলাম আশ্রয়কেন্দ্রে।
ওখানে গিয়ে দেখি আরও মানুষ উঠেছেন। বিকালের মধ্যে প্রায় দুই হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে। সবাই ভিজা। কোনোমতে আশ্রয়কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে প্রাণরক্ষা করেন মানুষ।’ চেয়ারম্যান আমিরুল জানান, ‘তার ইউনিয়নে কম করে হলেও আড়াইশ’ ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঢলে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অনেক গবাদিপশু। মানুষের বাড়িঘরের আসবাবপত্রও ভেসে গেছে। এ কারণে এখনো মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছে।’ এলাকার দশগাঁও-নোয়াগাঁও স্কুল অ্যান্ড কলেজ আশ্রয়কেন্দ্র। এ কেন্দ্রের বাসিন্দা হয়েছিলেন গোয়াইনঘাট প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাংবাদিক এমএ মতিন। গতকাল মতিন জানিয়েছেন, ‘উজানের ঢল থেকে বাঁচতে মানুষ এসে আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নিয়েছিলেন। আমিও ছিলাম ওখানে। তিন ভবনে দুই হাজার মানুষ ছিলেন। বসার মতো জায়গা ছিলনা। দিনে রাতে দাঁড়িয়ে বসবাস করতে হয়েছে। প্রায় ৪ দিন এমন অবস্থায় কেটেছে।
এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরা বাড়ি ফিরি।’ মতিন জানান, ‘এখনো তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে ৩০ থেকে ৩৫টি পরিবার রয়েছে। মানুষের সাহায্যে তারা খাবার পাচ্ছে। ভারী বষণ ও ঢলে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও ভেসে যাওয়ার কারণে তারা বাড়ি ফিরতে পারছে না। আবার কেউ কেউ ঈদকে সামনে রেখে বিধ্বস্ত ভিটেয় ফিরেছেন।’ স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানও আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষদের নিয়ে চিন্তিত। জানান, ‘স্কুল-কলেজ খুলে যাবে। আমার ইউনিয়ন পরিষদেও মানুষ ছিল। তাদের আপাতত অন্যত্র সরিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা চিন্তা করছি, ওদের অন্যত্র সরাতে। এজন্য সরকারের আশ্রায়ণ প্রকল্পে কিছু খালি ঘর রয়েছে। এসব ঘরে আপাতত তাদের নিয়ে রাখার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে।’ তিনি জানান- ‘এখনো মানুষকে খাবার দিতে হচ্ছে। ঘরবাড়ি হারা মানুষগুলো মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। এলাকার মানাউড়া, হাবুরকান্দি, শিয়ালহাওর, দলুর মুখ, রানীগঞ্জ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন জানান তিনি।’ আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা দেলোয়ার, আয়ারুন্নেছা জানিয়েছেন, তাদের বাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। টিনের চালা উড়িয়ে নিয়েছে। মাটির ঘরগুলো ভেঙে পড়েছে।
এ কারণে তারা বাড়ি ফিরতে পারছেন না। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এবারের ভয়াবহ বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জের লাখো মানুষ। ভেসে গেছে বাড়িঘর। হাজারো ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এখন সেগুলোর তালিকা করা হচ্ছে। তবে পানি কমায় বাড়িফেরা লোকজন এখন অসহায়। তাদের জন্য দ্রুত সাহায্য প্রয়োজন। এদিকে সিলেটের জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, এবারের ভয়াবহ বন্যায় সিলেট জেলায় প্রায় ৪০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ঠিক কতোজন মানুষের ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে কিংবা ঢলে তলিয়ে গেছে; সেই হিসাব এখনো মেলেনি। গতকাল কয়েকজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বন্যায় যারা বসতবাড়ি হারিয়েছেন তাদের তালিকা করা হচ্ছে। দু’এক দিনের মধ্যে সেটিও চূড়ান্ত করা হবে। পানি এখনো বিপদসীমার উপরে: সিলেটের দু’টি নদীর পানি ৪টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে, পানি কমছে বলে জানিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা।
সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুশিয়ারা নদীর পানি অমলশিদ, শেওলা, কুশিয়ারা পয়েন্টে বিপদসীমার উপরে রয়েছে। তবে- পানি কমছে। সিলেট পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ জানিয়েছেন, বৃষ্টি না হওয়ায় নদ-নদীর পানি কমছে। তবে অনেকটা ধীরগতিতে। আরও কয়েকদিন বৃষ্টি না হলে পানি আরও কমবে। বন্যার্তদের পুনর্বাসন করার দাবি বাসদের: বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও তালিকা প্রণয়ন করে দ্রুত ত্রাণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করা, বন্যাকবলিত এলাকায় কৃষি ও এনজিও ঋণ মওকুফ, দ্রুত রাস্তা মেরামত, বন্যা সমস্যার ও নগরীর জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের দাবিতে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ সিলেট জেলা শাখার উদ্যোগে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল বিকাল ৫টায় আম্বরখানাস্থ দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে মিছিল শুরু হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌহাট্টাস্থ শহীদ মিনারের সামনে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বাসদ সিলেট জেলা শাখার সমন্বয়ক আবু জাফরের সভাপতিত্বে ও জেলা সদস্য প্রণব জ্যোতি পালের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ও বক্তব্য রাখেন মনজুর আহমদ, হারুন মিয়া, বেলাল হোসেন, আনোয়ার হোসেন, শুক্কুর আলী, মানিক মিয়া, রুমন বিশ্বাস, নাজিমুল ইসলাম রানা, মাসুদ রানা, সঞ্জিত শর্মা প্রমুখ। সমাবেশে বক্তারা বলেন, সিলেট-সুনামগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখন ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি। কোলের সন্তান নিয়ে মায়ের শুকনো জায়গা খুঁজে বেড়ানো, খাদ্যের জন্য হাত বাড়ানো মানুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার অসহায় চাহনি, গবাদিপশু আর মানুষের গাদাগাদি করে থাকার ছবি প্রচার মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। মাথার ওপরে ছাদ নেই, পায়ের নিচে শুকনো মাটি নেই, জমির ফসল, গোলার ধান, পুকুরের মাছ, রাস্তাঘাট, দোকানপাট সব ভেসে গেছে, ভেসে গেছে বই-খাতা, শিক্ষা উপকরণসহ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন। বক্তারা অবিলম্বে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও তালিকা প্রণয়ন করে দ্রুত ত্রাণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করা, বন্যাকবলিত এলাকায় কৃষি ও এনজিও ঋণ মওকুফ, দ্রুত রাস্তা মেরামত, বন্যা সমস্যার ও নগরীর জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

