রাত ১০ টা ১০ মিনিট। রাজধানী জুড়ে যানজটে নাকাল মানুষ। বাড়ি ফিরতেই হবে। আজ রাতের লঞ্চ ধরতে হবে। যেতে হবে চাঁদপুর এমনটাই বলছিলেন বিহঙ্গ বাসে ওঠা যাত্রী মনির হোসেন। ঈদুল ফিতর পরিবারের সাথে ভাগাভাগি করতে রাজধানী ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশে ছুটছে মানুষ।
এবার ঈদযাত্রায় ১২ লাখ মানুষ ঢাকা মঙ্গলবার ছেড়েছে বলে এক ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি তার পোস্টে লেখেন- ঈদুল ফিতর উদযাপনের জন্য মঙ্গলবার (১৮ এপ্রিল) ১২ লাখ ২৮ হাজার ২৭৮টি সিমের ব্যবহারকারী ঢাকা ছেড়েছেন। তবে এই হিসাব গড়ে জনপ্রতি সিমের সংখ্যায় ধরা হয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে ১৮ বছরের নিচে কেউ পড়ে না।
এই পবিত্র পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন করতে নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন কর্মজীবী মানুষ। ট্রেন, লঞ্চ, বাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেলে করে যে যেভাবে পারছেন বাড়ির পথে ছুটছেন। ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-ময়মনসিংহ, এক্সপ্রেসওয়েসহ মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ থাকলেও তেমন যানজট নেই। এটা মানুষের জন্য স্বস্তি। তবে বাসের ভাড়া দ্বিগন-তিনগুন হওয়ায় প্রচন্ড গরমে ভোগান্তি মেনে নিয়েই ভেঙ্গে ভেঙ্গে কম ভাড়া দিয়ে গ্রামে যাচ্ছে মানুষ।
জানা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতুর টোলপ্লাজায় উত্তরবঙ্গগামী মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। একইভাবে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ির শিমুলিয়া ফেরিঘাটে দক্ষিণাঞ্চলগামী মোটরসাইকেল আরোহীদের ঢল নেমেছে। ভোগান্তি এড়াতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছেন।
এই ঈদে উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকা শহর ছেড়ে কর্মজীবী মানুষের ঘরে ফেরা শুরু হয়েছে দু’দিন আগে। প্রচন্ড গরমে নাকাল যাত্রীরা। প্রতিবছরের মতো এবার সড়ক-মহাসড়কে ভয়াবহ যানজটের চিত্র নেই, সদর ঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ধাক্কা-ধাক্কি, হুড়োহুড়ি নেই, কমলাপুর স্টেশনে টিকেটের জন্য দীর্ঘ লাইন নেই। অন্য যে কোনো বারের চেয়ে এবারের ঈদ যাত্রায় স্বস্তি।
অন্যদিকে, ট্রেনের টিকেট ‘প্রশাসনের উপরওয়ালাদের নিয়ন্ত্রণে’ থাকায় সাধারণ মানুষ তেমন সুবিধা পাচ্ছেন না, বাসের ভাড়া দ্বিগুন হওয়ায় ভোগান্তি রয়ে গেছে। বাস ভাড়া বেশি হওয়ায় স্বল্প আয়ের মানুষ ট্রাকে এবং বিভিন্ন যানবাহনে ভেঙ্গে ভেঙ্গে গ্রামে যাচ্ছেন। গতকাল বঙ্গবন্ধু বাইকের দীর্ঘ সারি ছিল। আজ থেকে পদ্মা সেতুতে বাইক চলাচল করবে।
প্রসঙ্গত, ঈদযাত্রায় এখন পর্যন্ত যাত্রী কম থাকার বিষয়ে পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাস কাউন্টার ও টিকিট বিক্রেতারা বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তবে যাত্রীরা বলছেন, বাসের ভাড়া দ্বিগুন তিনগুন বেশি নেয়া হচ্ছে। যার জন্য মানুষ ভিন্ন উপায়ে ঈদ করতে গ্রামে যাওয়ার পথ বেঁছে নিয়েছে।
এছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতুতে দেখা গেছে, শত শত মোটরসাইকেল বঙ্গবন্ধু সেতুপূর্ব টোলপ্লাজার পাশেই স্থাপিত আলাদা বুথে অপেক্ষা করছে সেতু পার হওয়ার জন্য। এসময় সেতু কর্তৃপক্ষের লোকজন অপেক্ষারত মোটরসাইকেল আরোহীদের নির্ধারিত টোলের টাকা হাতে রাখার জন্য মাইকিং করছিলেন।
এদিকে মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসের চেয়ে ব্যক্তিগত গাড়ি বেশি দেখা গেছে। এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে বাড়ি যাচ্ছেন মোবারক হোসেন। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকার উত্তরা থেকে রওনা হয়েছি। মহাসড়ক ফাঁকা ছিল, তাই তাড়াতাড়ি আসতে পেরেছি। স্ত্রী নিয়ে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি যাচ্ছেন গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মী আবুল কালাম। তিনি বলেন, সেতু পার হলেই বাড়ি। তাই স্ত্রীকে নিয়ে ঈদের ছুটিতে মোটরসাইকেলে করে বাড়ি যাচ্ছি। আমার মতো শত শত মোটরসাইকেলের আরোহীরা অপেক্ষা করছেন সেতু পার হতে।
সংশ্লিষ্টরা গণমাধ্যমে বলেন, সড়ক পথে বঙ্গবন্ধু ব্রিজ হয়ে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলাসহ দেশের প্রায় ২২টি জেলার মানুষ যাতায়াত করে। বঙ্গবন্ধু ব্রিজের পশ্চিম প্রান্তে উত্তরবঙ্গের রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক ৪ লেনে উন্নিতকরণের কাজ চলমান থাকায় গত কয়েক বছর ধরেই উত্তরের যাত্রা পথে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ঈদে ঘরে ফেরা মানুষদের।
তবে পরিবহণ শ্রমিকরা বলছেন, এখনো ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়নি। তবে প্রচন্ড গরমে যাত্রীদের ত্রাহি অবস্থা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চাপ নেই : রাজধানী ঢাকা থেকে বের হয়ে যাত্রাবাড়ি-শনির আখড়া-সাইনবোর্ড-টিটাগাং রোডে একটু জটলা থাকলেও ঈদযাত্রায় এখনো ফাঁকা রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এ মহাসড়কে যানবাহনের চাপ না থাকায় এখন পর্যন্ত খুব কম সময়ে বাড়ি ফিরতে পেরে খুশি যাত্রীরা।
এবারের ঈদযাত্রাকে নিবিঘ্ন করতে পরিকল্পনা মাফিক কাজ করা হয়েছে বলেই মহাসড়কে যানজট নেই দাবি হাইওয়ে পুলিশের। হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার রহমতুল্লাহ বলেন, মানুষের ঈদযাত্রাকে যানজটহীন রাখতে রমজানের শুরুর দিক থেকেই বিশেষ একটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত স্টপেজ ছাড়া রাস্তার কোথাও দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করতে দেওয়া হচ্ছে না। ফলে গাড়ির জটলা বাঁধার সুযোগ নেই।
চাপ নেই পাটুরিয়া ফেরিঘাটে : যানবাহনের চাপ নেই মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া ফেরিঘাটে। বুধবার ভোরবেলা গাড়ির কিছুটা চাপ থাকলেও বেলা বাড়ার সাথে সাথে তা কমে যায়। লঞ্চঘাটেও নেই যাত্রীদের ভিড়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) আরিচা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ঈদযাত্রা শুরু হলেও নৌপথে যাত্রীবাহী বাস ও যাত্রীর চাপ নেই পাটুরিয়া ঘাটে। ভোরে পাটুরিয়া ঘাট এলাকায় প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস, জিপ, মোটরসাইকেল ও ছোট মালবাহী পিকআপ ভ্যান গাড়ির কিছুটা চাপ থাকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের টেপড়া বাসস্ট্যান্ড থেকে পাটুরিয়া ঘাটে চলে যেতে পারছে। পর্যাপ্ত ফেরি সচল থাকায় এসব গাড়ি অল্প সময়ের মধ্যেই পদ্মা নদী পার হয়ে পাটুরিয়া থেকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া প্রান্তে যেতে পেরেছে।
উল্লেখ্য, এবার ঈদযাত্রায় সবচেয়ে সুবিধা হয়েছে দক্ষিণবঙ্গের মানুষের তারা সহজে পদ্মাসেতু পার হয়ে বাড়ি ফিরছেন। আজ থেকে মোটরসাইকেল পার হতে পারবে পদ্মা সেতু দিয়ে।

