নিউজ ডেস্ক
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বয়স এখন ৭৭ বছরের বেশি। ২০১৮ সালে কারাবন্দির পর তার শারীরিক অসুস্থতা ও অসুখের জটিলতা বেড়েছে। সম্প্রতি কয়েক বছর ধরে তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে দলটির সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা উদ্বিগ্ন। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যের প্রকৃত অবস্থা না জানার কারণে বিএনপির নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষও রয়েছেন ধোঁয়াশার মধ্যে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় রয়েছেন খালেদা জিয়ার কোটি কোটি ভক্ত অনুরাগী। তার অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লেই দেশে-বিদেশে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠানও করা হয়। বিএনপির পক্ষ থেকে খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে বার বার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হচ্ছে, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ। তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে এবং অন্যান্য জটিলতাও বেড়েছে। এ জন্য তাকে অনতিবিলম্বে বিশ্বের অন্য কোনো দেশে উন্নত চিকিৎসাকেন্দ্রে চিকিৎসা দিতে হবে। এ বিষয়ে দল ও পরিবারের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একাধিকবার দাবি জানানো হয়েছে। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্য, ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা রয়েছেন দুশ্চিন্তায়।
দলের চেয়ারপারসনের শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল রোববার বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ভীষণ অসুস্থ। এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তির পর তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। আমরা মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শক্রমে খালেদা জিয়াকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে সরকারকে বহুবার আহ্বান জানিয়েছি; কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। যে কারণেই দেশেই যতটা সম্ভব আমরা দেশনেত্রীর সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে যাচ্ছি।
তিনি বলেন, আমরা দলের নেতাকর্মী শুধু নই, দেশের আপামর মানুষ খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বিশ্বের বহু মানবাধিকার সংস্থাও উদ্বেজ জানিয়েছে। আসলে মানুষের জীবনের সংকটের চেয়ে বড় সংকট আর কী হতে পারে? বিদেশে চিকিৎসার অনুমতির জন্য তার পরিবারের আবেদন রয়েছে। আমরা রাজনৈতিকভাবে চেষ্টা করছি। অন্যান্য রাস্তা যা আছে—সবদিক থেকেই চেষ্টা করছি। অন্য রাজনৈতিক শক্তি বা দলগুলোও বিষয়টাতে তাদের পক্ষে কথা বলছে।
জানা যায়, ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাবন্দির পর খালেদা জিয়া একাধিকবার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, লিভারসহ নানা রোগে ভুগছেন। অসুস্থতার মধ্যে গুলশানের ভাড়া বাসা ‘ফিরোজা’য় চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তার চিকিৎসা চলছিল। সর্বশেষ তার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শক্রমে গত শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন ৭৭ বছর বয়সী খালেদা জিয়া। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক সাহাবুদ্দিন তালুকদারের তত্ত্বাবধানে তিনি চিকিৎসাধীন। ডা. সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড আগে থেকেই তার চিকিৎসা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তির পর শনিবার এবং গতকাল রোববার মেডিকেল বোর্ডের বৈঠক হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. সাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ডের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা হচ্ছেন- অধ্যাপক এফএম সিদ্দিকী, অধ্যাপক নুর উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক শামসুল আরেফিন, অধ্যাপক এ কিউ এম মহসিন, অধ্যাপক শেখ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক জিয়াউল হক এবং অধ্যাপক সাদেকুল ইসলাম। এ ছাড়া লন্ডন থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানসহ অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বিএনপি চেয়ারপারসনের মেডিকেল বোর্ডে রয়েছেন। এভারকেয়ার হাসপাতালে থেকে খালেদা জিয়াকে সার্বক্ষণিক দেখাশুনা করছেন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী শর্মিলা রহমান সিঁথি। লন্ডন থেকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমান সবসময় খোঁজ রাখছেন।
কী বলছে খালেদা জিয়ার মেডিকেল বোর্ড?
খালেদা জিয়ার চিকিৎসক বোর্ডের সদস্য ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, এভারকেয়ার হাসপাতালের কেবিনে ‘নিবিড় পর্যবেক্ষণে’ ম্যাডামের (খালেদা জিয়া) চিকিৎসা চলছে। শনিবারের চেয়ে উনার অবস্থা একইরকম আছে। চিকিৎসা দেওয়ার পর কিছুটা উনার উন্নতি হচ্ছে। তিনি বলেন, শনিবার ভর্তির পর ম্যাডামের মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শক্রমে বেশ কিছু পরীক্ষা করা হয়েছে। পরীক্ষার রিপোর্ট আসা শুরু করেছে। মেডিকেল বোর্ড আজকে (রোববার) সন্ধ্যায় কোনো একটা সময়ে বসবেন এবং রিপোর্টগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেবেন। তবে সকালেও বোর্ডের কয়েকজন সদস্য উনার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেছেন।
ডা. জাহিদ হোসেন বলেন, উনার অসুস্থতার জন্য নিয়মিত চেকআপের পাশাপাশি কিছু উপসর্গ দেখা দেওয়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সেখানে চিকিৎসায় উনি মোটামুটি রেন্সপন্স করছেন। প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, এটা মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত ও উনার শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করবে হাসপাতালে কয়দিন থাকতে হবে।
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রোগীর অসুস্থতা সম্পর্কে মিডিয়াতে বলা ঠিক না। খালি এটুকু জানানো যেতে পারে যে, উনার কিছু শারীরিক অসুস্থতা, হার্ট, লিভার ও কিডনির জটিলতা আছে আপনারা জানেন। সেগুলোর কোনো কোনোটা একটু বৃদ্ধি পেয়েছিল সেজন্য উনার চেকআপ ও চিকিৎসার জন্য উনাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তিনি বলেন, উনি কেবিনেই আছেন; কিন্তু কেবিনে উনার জন্য স্পেশালিস্ট এমআইএসটি নার্স-ডাক্তাররা যত্ন নিচ্ছেন। কেবিন এমনি শুয়ে থাকার তা না। সি ইজ আন্ডার স্ট্রিক সুপারভিশন।
এর আগে ২০২২ সালের ১০ জুন রাতে বুকে ব্যথা অনুভব করলে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন খালেদা জিয়া। পরে দ্রুত এনজিওগ্রাম করে তার হৃদযন্ত্রে একটি স্টেন্ট বসানো হয়। তার শারীরিক সব জটিলতার চিকিৎসা বাংলাদেশে সম্ভব নয় বলে ওই বছরের ২৪ জুন সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ডা. এ এফ এম সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ম্যাডামের অনেক জটিল অসুস্থতা আছে। উনার রেনাল ফেইলিউর, বিল্ডিংয়ের চান্স, উনার যে সিরোসিস অব লিভার সেটা কিন্তু রয়ে গেছে। সেটার কোনো চিকিৎসা হয় না। আমরা শুধু উনার বিল্ডিং স্পটগুলোকে লাইগেশন করে দিয়ে বন্ধ রেখেছি। এখন পর্যন্ত আমরা যা করার করছি।
তিনি আরও বলেছিলেন, আমরা বার বার বলছি যে, কমপ্রিহেনসিভ সব জটিলতাকে একটা বেস্ট সেন্টারে নিয়ে উনাকে সুস্থ করে তোলার যে প্রক্রিয়া, সেটা এখানে করতে পারছি না। সেই ধরনের সবকিছু করার সক্ষমতায় আমাদের অভাব আছে। সেজন্যই আমরা সবসময় বলেছি—উনার সঠিক, সার্বিক ও সুষ্ঠু চিকিৎসা এই দেশে সম্ভব নয়। সেটা বিশ্বের কিছু উন্নত দেশের উন্নত সেন্টারে করতে পারলে উনার জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।
আর মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক সাহাবুদ্দিন তালুকদার বলেছিলেন, ম্যাডাম এখনো অসুস্থ। তিনি যে অবস্থায় এসেছিলেন সেই অবস্থা থেকে স্টেবল। কিন্তু বাকিগুলো, যেমন বিল্ডিং কমপ্লিকেশন ইটস এ ভেরি চ্যালেঞ্জিং গেম নাউ। উনি হাই রিস্ক অব বিল্ডিং। এখনো উনার দুটি ব্লক রয়ে গেছে। সেসময় করোনাভাইরাস বৃদ্ধির কারণে তাকে হাসপাতাল থেকে বাসায় নেওয়া হয়েছিল। এরপর ২৭ ফেব্রুয়ারি তিনি হাসপাতালে চেকআপ করিয়েছেন।
যা বলছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল কালবেলাকে বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে চিকিৎসকরাই বলবেন। আমি শুধু বলব ম্যাডাম খুব ভালো নেই। তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। সরকারের কাছে নতুনভাবে বিদেশে চিকিৎসার জন্য আবেদন জানানোর কিছুই নেই। এই দাবি আমাদের অনেক পুরোনো। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অবিলম্বে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়ে বলেন, খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তাকে এই মুহূর্তে মুক্তি দিয়ে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। বিএনপির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সহ-সম্পাদক ও এ্যাবের সিনিয়র সহসভাপতি প্রকৌশলী আশরাফ উদ্দিন বকুল কালবেলাকে বলেন, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী (সাবেক) ও দেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী। জাতীয়তাবাদী ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী রাজনীতিক হিসেবে তার খ্যাতি রয়েছে। তার মতো ব্যক্তিকে বিদেশ যেতে না দেওয়া অত্যন্ত কষ্টের। তিনি অবিলম্বে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানান।
নোয়াখালী জেলা বিএনপির উপদেষ্টা প্রকৌশলী এ কে এম আমিরুল মোমিন বাবলু বলেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দেশের এক ক্রান্তিকালে বিএনপির হাল ধরে তুমুল জনপ্রিয় নারী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই বিএনপি একাধিকবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে পেয়েছেন ‘আপসহীন নেত্রীর’ খেতাব। ইতিমধ্যে তাকে ‘মাদার অব ডেমোক্র্যাসি’ বা গণতন্ত্রের মা উপাধি দিয়েছেন দলটির নেতাকর্মীরা। শুধু দলের নেতাকর্মীই নয় দেশজুড়ে তার কোটি ভক্ত অনুসারী রয়েছে। কিন্তু আজ পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি খালেদা জিয়া। তিনি অবিলম্বে খালেদা জিয়ার মুক্তি ও বিদেশে উন্নত চিকিৎসার দাবি করেন।

