ডেস্ক নিউজ
যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও দেশটির আইন প্রণেতাদের একটি অংশ বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিতের জন্য ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনার সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি করে চলেছে। এমন অবস্থায় বর্তমান সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণকে রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছে চীন। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মধ্যে একটি প্রশ্ন দানা বাঁধতে শুরু করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই বিপরীত অবস্থান বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য কী নির্দেশ করে? তাদের অনেকেরই আশঙ্কা, বাংলাদেশকে এখন চীন-যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ‘গ্রেট গেম’-এ টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং এখানেই এই দুই সুপার পাওয়ার পরস্পরের মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
যদিও বাংলাদেশ সরকার সম্প্রতি ঘোষিত মার্কিন ভিসা নীতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। ওই ভিসা নীতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাধা প্রদানকারীদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই ঘোষণার পরই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা দ্বিগুণ হারে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী বক্তব্য দিতে শুরু করেছেন। পাশাপাশি ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করার আহ্বানকেও অবজ্ঞা করছেন তারা।
গত ১৪ই জুন চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র দেশটির গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক এই পদক্ষেপকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে বর্ণনা করেন। ওয়াং ওয়েনবিন যুক্তরাষ্ট্রের নাম উল্লেখ না করেই বলেন, একটি দেশ দীর্ঘদিন ধরে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অজুহাতে বাংলাদেশ ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে আসছে। চীনের এই মুখপাত্র হাসিনা সরকারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে বলেছেন যে, চীন বাংলাদেশকে তার সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায়, স্বাধীনভাবে দেশীয় ও বৈদেশিক নীতি গ্রহণে এবং তার জাতীয় বাস্তবতার সাথে মানানসই উন্নয়নের পথ অনুসরণ করতে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে। এর আগে কখনও বাংলাদেশ সম্পর্কে মার্কিন নীতির সরাসরি নিন্দা জানায়নি চীন। যদিও ২০২১ সালে ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশকে কোয়াডে যোগ দেয়ার ‘গুরুতর পরিণতির’ বিষয়ে সাবধান করেছিলেন।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ২০১৬ সালে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এ যোগ দেয়।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২১ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পাশাপাশি মানবাধিকার রেকর্ডের উন্নতি এবং একটি অবাধ নির্বাচনের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে বাংলাদেশের ওপর চাপ দিয়ে আসছে দেশটি। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দলের আইন প্রণেতারা বাইডেন প্রশাসনকে বাংলাদেশ সরকারের উপর আরও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ৮ই জুন ছয়জন ডেমোক্রেটিক কংগ্রেস সদস্য বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য আরও পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনকে একটি চিঠি পাঠান। এর আগে ২৫শে মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে চিঠি পাঠান ছয়জন রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য। তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধ এবং বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান।
এদিকে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ছয় সদস্য গত ১২ই জুন একই ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ইউরোপীয় কমিশনকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে স্বাক্ষরকারী ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যরা বাংলাদেশে একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন নিশ্চিতে অবদান রাখার জন্য ইইউর প্রতি অনুরোধ করেন। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন পুনরুদ্ধার করার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা। ভিন্ন ভিন্ন ছয়টি দেশের এই এমইপিরা ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করে বলেন, বাংলাদেশে অবাধ নির্বাচন নিশ্চিতের জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এরমধ্যে রয়েছে, কঠোর ব্যক্তিগত নিষেধাজ্ঞা এবং বাংলাদেশের আইন প্রয়োগকারী ও সামরিক কর্মীদের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা।
গত ২৭শে মে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূত চার্লস হোয়াইটলি বলেছেন যে, বাংলাদেশি পণ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে রপ্তানির জন্য জিএসপি (জেনারালাইজড স্কিম অফ প্রেফারেন্স) প্লাস সুবিধা পেতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য সহায়ক হবে। সম্প্রতি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি-জেনারেল জিন-পিয়েরে ল্যাক্রোইক্সকে তার আসন্ন বাংলাদেশ সফরের সময় সরকারী নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের বিষয়ে জনসমক্ষে উদ্বেগ প্রকাশ করার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘকে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর জন্যও বলেছে সংস্থাটি।
বাংলাদেশ সরকার এখন একাধিক ফ্রন্ট থেকে চাপের মুখে রয়েছে। এরইমধ্যে রাশিয়া এর আগে বর্তমান সরকারের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সমালোচনা করেছিলেন। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই মন্তব্যের পর টুইটারে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের বাক-যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রোসাটম বাংলাদেশে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করছে। গত বছরের নভেম্বরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে একটি জাহাজে করে এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য উৎপাদন সামগ্রী পাঠিয়েছিল রাশিয়া। তবে যুক্তরাষ্ট্র তখন বাংলাদেশের কাছে এ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
এদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলির মধ্যে হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারত এখনও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা নতুন ভিসা নীতি সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করেনি। আগামী সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ওয়াশিংটন সফরে যাচ্ছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বাইডেন-মোদি সম্মেলনে বাংলাদেশ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হবে কিনা তা জানা যায়নি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে নয়া দিল্লি ও ওয়াশিংটন বাংলাদেশ ইস্যুতে দ্বিমত পোষণ করেছিল। এবারও ভারতীয় রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বাংলাদেশের জন্য মার্কিন ভিসা নীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ভিসা নীতি দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব হ্রাসের লক্ষণ কিনা।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলী ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাংলাদেশের রাজনীতি, বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচন ক্রমবর্ধমানভাবে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে বিবাদের কারণ হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের নতুন মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। নির্বাচনের আর মাত্র সাত মাস বাকি। ফলে পরিস্থিতি এখন আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। বাংলাদেশের বিরোধী দলগুলো একটি অন্তর্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন আয়োজনের জন্য তৎপর। আগের দুটি নির্বাচন ক্ষমতাসীনদের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা সেসব নির্বাচনে মারাত্মক কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন।

