• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

সারাদেশ

একজন বিচারকের অন্তর্দৃষ্টি ও রাষ্ট্র : শহীদুল্লাহ ফরায়জী

প্রকাশ: সোমবার, ৩ জুন, ২০২৪ ১২:১১
আপডেট: সোমবার, ৩ জুন, ২০২৪ ১২:১১

একজন বিচারকের অন্তর্দৃষ্টি ও রাষ্ট্র : শহীদুল্লাহ ফরায়জী

গণমাধ্যমে প্রকাশ- বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবস ৩০শে মে, বৃহস্পতিবার বিদায়ী সংবর্ধনার বক্তব্যে আপিল বিভাগের বিচারপতি মুহাম্মদ আবদুল হাফিজ বলেন-

১) একজন বেতনভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী কীভাবে কোটি কোটি এমনকি শত কোটি টাকার মালিক হন, তা দেশবাসীকে হতবাক করে। তাই এগুলোকে রোধ করতে রাষ্ট্রকেই দায়িত্ব নিতে হবে। তাহলে দেশ উপকৃত হবে। মানুষ অযাচিত বিপদ থেকে রক্ষা পাবে।
২) প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার জন্য মিথ্যা মামলা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিচার বিভাগকে এর ভার বহন করতে হয়। এতে আদালতের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হয়। মিথ্যা মামলা ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিচারকের বক্তব্যে রাষ্ট্রের ভয়াবহ চরিত্র ফুটে উঠেছে। বিদ্যমান রাষ্ট্রের গভীর সংকট নিয়ে আবদুল হাফিজের অন্তর্দৃষ্টি এবং উপলব্ধি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আমাদের রাষ্ট্র যখন ক্রমাগত অস্থির এবং বিপদসংকুল তখন এসব বিষয় নিয়ে পর্যালোচনা জরুরি।

‘সেনাপ্রধান’ বা ‘পুলিশ প্রধান’-এর পদ হচ্ছে জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। অর্থাৎ রাষ্ট্রের অতীবগুরুত্বপূর্ণ এ সকল পদ রাষ্ট্রীয় ‘নিরাপত্তানীতি ও কৌশল’-এর সঙ্গে জড়িত।

রাষ্ট্রের এ সকল পদে নিয়োগ দেয়ার সময় কোনোক্রমেই রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়া উচিত নয়।
সুতরাং পদ দু’টির বিপরীতে নিয়োগের সময়, অন্যান্য অনেক পদের ন্যায়, তাদের চাকরির অতীত রেকর্ড, সততা, নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা, বিশ্বস্ততা, প্রশংসনীয় উন্নত চরিত্র ও রাষ্ট্রের প্রতি গভীর আনুগত্য পর্যালোচনা এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত সকল গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ নিশ্চিত হয়েই নিয়োগ দান করতে হয়। কারণ এ পদগুলো রাষ্ট্রের অমূল্য ভূষণ যা অনেক পদের তুলনায় অধিকতর তাৎপর্যমণ্ডিত। গভীর বিচার বিশ্লেষণের পরিবর্তে- আত্মীয়তা, আঞ্চলিকতা, স্বজনপ্রীতি এমনকি দলীয় আনুগত্য কখনোই প্রাধান্য পাবে না। সরকারের উত্থান-পতন, সুবিধা ও অসুবিধার নিরিখে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে বিবেচনা করা যায় না। দূরদৃষ্টির অভাব, রাষ্ট্রনীতির মৌলিক তাৎপর্য বুঝতে অক্ষম, রাষ্ট্রের সুপরিজ্ঞাত নীতি উপেক্ষা এবং সরকারের সীমাহীন অবৈধ ক্ষমতা-তৃষ্ণার কারণে আজকে রাষ্ট্র গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

এসকল পদে উপযুক্ত এবং বিবেকসম্পন্ন মানুষ নিয়োগ করতে না পারলে যেকোনো সময় রাষ্ট্র চরম ঝুঁকিতে পড়তে পারে বা বীভৎস পরিণতির দিকে যেতে পারে। রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যকেও বিনষ্ট করতে পারে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার- র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের ডিজি এবং আইজিপি পদায়নের সময় যদি তার স্বঘোষিত সম্পদের বিবরণীও পর্যালোচনা করতো, ক্ষমতার অপব্যবহার, আচার-আচরণ, চলাফেরা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিতো, তাহলে নিশ্চয়ই এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব পেতেন না।

যদি পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাগণ বুঝতে পারতেন, কোনোক্রমেই আয়বহির্ভূত অর্থ বা দুর্নীতিলব্ধ অর্থ চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না বা
গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন বিঘ্ন সৃষ্টি হয়- তাহলে কি এই ভয়ঙ্কর দানব হওয়ার কোনো সুযোগ থাকতো! পুলিশের প্রধান অর্থাৎ আইজিপি’র মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়ার পূর্বে, তার সততা, নিষ্ঠা, চাকরিকালীন সময়ের রেকর্ড, পর্যালোচনা করে কি সরকার বেনজীর আহমেদকে আইজিপি পদে নিযুক্ত করেছিলেন?

একজন সরকারি কর্মচারী হাজার হাজার বিঘা জমি ক্রয় করছেন, কোম্পানি কিনছেন, কারও শেয়ার জোর করে লিখিয়ে নিচ্ছেন, চাকরিরত অবস্থায় বোট ক্লাবের সভাপতি হচ্ছেন, হিন্দু সমপ্রদায় থেকে ভয় দেখিয়ে জোর করে জমি লিখে নিয়েছেন, এত সব ঘটনা প্রতিকারের জন্য, যে রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যকর নেই, সেই রাষ্ট্র টিকে থাকবে কীসের উপর!
প্রতিটি সংস্থা প্রধানদের নিয়োগ করার সময় তাদের আমলনামা সরকারের হাতে থাকে। সেই আমলনামা দেখেও যদি সরকার উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হিসেবে সংস্থার প্রধানদের নিয়োগ দিয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্র মাফিয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে এটাই তো স্বাভাবিক। কোনো এক অদৃশ্য কারণে যখন বেনজীরের অপরিসীম অবৈধ সম্পদ ভাণ্ডারের তথ্য উন্মুক্ত হচ্ছিল, তখনো সরকার বলছে এটা ব্যক্তিগত দায়। রাষ্ট্রের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় ব্যক্তির দ্বারা। আর ব্যক্তিরাই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন। সুতরাং ব্যক্তি এবং সরকারের দায় পরস্পর যুক্ত।

বেনজীরকে নিয়োগ দিয়ে পুলিশ প্রশাসন এবং রাষ্ট্রের যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো তার দায় কে নেবে? প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী ব্যাপক দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যক্তিগত ধনাগার গড়ে তুলেছেন অথচ সরকার তাকে শুদ্ধাচার পুরস্কার দেবে- এটা কি কোনো রাষ্ট্রের বা কোনো সরকারের কর্তব্য হতে পারে? ক্ষমতার সুরক্ষা দিতে গিয়ে যদি সরকার রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের অনৈতিক এবং বেআইনি কর্মকাণ্ডকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, পদোন্নতি দেয়, তাহলে রাষ্ট্র পতনের দিকে ধাবিত হবে, রাষ্ট্রশক্তি দুর্বল, খর্ব এবং শিথিল হবে।
বেনজীর আহমেদ আইজিপি থাকা অবস্থায় দুর্নীতির ভয়ঙ্করতা নিয়ে গণমাধ্যম একটি লাইনও প্রকাশ করতে পারেনি, এখন কেন পারলো?

এতেও কি আমরা অনুধাবন করতে পারি না, রাষ্ট্রকে কী ভয়ঙ্কর চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে!
আরেক দেশে খুন হলো অতঃপর বাংলাদেশে দ্রুত গ্রেপ্তার হলো- এই দক্ষতা, যে পুলিশের আছে, সে পুলিশ সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের অপরাধীদের চিহ্নিত করতে পারলো না- এটা কি গ্রহণযোগ্য? সরকার যদি আন্তরিক থাকে, আইনের শাসনের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের একটি রাষ্ট্র দুর্বৃত্ত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ রাষ্ট্র হওয়ার কথা নয়। গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক প্রধান বেনজীর আহমেদ নাকি গোপনে দেশ ত্যাগ করেছেন, যখন তার বিরুদ্ধে আইনগত প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। তার উচিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে তা মোকাবিলা করা। যে আইজিপি রাষ্ট্রের আইনের প্রতি ন্যূনতম আনুগত্য দেখায় না, তাকে আইজিপি হিসেবে নিয়োগ করার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে। আর এটা ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই যে, সরকার চাইলেই বেনজীরের অপকর্ম প্রকাশ হতে পারে এবং রাষ্ট্রকে অবজ্ঞা করে বেনজীর নিরাপদে বাইরে যেতে পারে। অতীতে সরকার তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছে এবং ভবিষ্যতেও তার ভাগ্য সরকারই নির্ধারণ করবে।

কী লাভ অগাধ সম্পত্তির মালিক হয়ে, কী লাভ আচ্ছাদনে স্বর্ণসূতোর বুনট দিয়ে, কী লাভ স্বর্ণের ডাইনিং টেবিলে হীরকের প্লেটে খাদ্য পরিবেশনে বা কী লাভ আম্বারের মোমবাতি জ্বালিয়ে।
রাজত্ব ও রাজকোষ কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। ক্ষমতার ঔদ্ধত্য কতো সহজে বিলুপ্ত হয়ে যায়। রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা ধ্বংসের নামান্তর। এটা সবার জন্য শিক্ষণীয়।

আজিজ বা বেনজীরের কারণে দু’টি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সহ রাষ্ট্রের যে অপূরণীয় ক্ষতি হলো, ক্ষত হলো এবং মর্যাদা বিপন্ন হলো তার দায়-দায়িত্ব অবশ্যই সুস্পষ্ট ও নির্ধারণ করতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো, প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার জন্য মিথ্যা মামলাকে হাতিয়ার করা হচ্ছে এটা স্বীকার করছেন আপিল বিভাগের বিচারক। অথচ সরকার বলছে বাংলাদেশে রাজনৈতিক মামলায় কেউ গ্রেপ্তার হয় নাই। অর্থাৎ সরকার সত্য থেকে অনেক দূরবর্তী অবস্থানে। নির্বাহী বিভাগ স্বেচ্ছাচারী হয়ে একজন মানুষের নিরপরাধ থাকার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, নিরপরাধী দণ্ডিত হচ্ছে, এটা রাষ্ট্রের জন্য ভয়ঙ্কর অপরাধ। সরকার নিজের অপরাধ অন্য মানুষের কাছে হস্তান্তর করছে। অপরাধ হস্তান্তরযোগ্য নয়। যে জানেই না তার অপরাধ অথচ গায়েবি মামলায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করে দণ্ডিত করা হচ্ছে। এত ভয়াবহ অন্যায় আধুনিক সভ্যতায় বিরল। অপরাধীর জন্য স্বর্গরাজ্য আর নিরপরাধীর জন্য কারাগার বানাবার জন্য মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয় নাই। কোনো নাটকের জন্য ৩০ লাখ মানুষের জীবন উৎসর্গকৃত করা হয় নাই। অন্যায়কারী এবং অন্যায়ের শিকার হওয়া মানুষ পরস্পরের বন্ধু হতে পারে না। বিচারক আশা করেছেন এগুলো রোধ করতে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্র মানে নির্বাহী বিভাগের স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণ ও আইনের সুরক্ষা প্রদান করে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। এটা আদালতেরই কাজ।
জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ ও সংবিধানের অভিভাবক বিচারবিভাগ। মিথ্যা মামলা থেকে সরকারকে বিরত থাকার জন্য আদালত নির্দেশ দান করতে পারে। রাষ্ট্র সীমাহীন দুর্নীতি ও বিচারহীনতায় নিমজ্জিত। বিচারক আবদুল হাফিজই বলেছেন- মিথ্যা মামলা ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি। জাতির এই দুঃসময়ে বিচার বিভাগের ভূমিকা ও তার ভিত্তিতে নৈতিক বাধ্যবাধকতা প্রয়োগই হচ্ছে কর্তব্য।

লেখক: গীতিকবি ও কলামিস্ট
faraizees@gmail.com


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com