নাজিম উদ্দিন এম এ
বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে যে চক্রটি বারবার আলোচনায় আসে, তা হলো অসৎ, ঘুষখোর, চামচা, হিংসুক, অযোগ্য এবং লুটেরা রাজনীতিবিদদের একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী। এদের প্রভাবের ফলে প্রশাসনিক দুর্বলতা, নীতিনৈতিকতা হীনতা, দুর্নীতি ও জনবিচ্ছিন্নতা মারাত্মকভাবে বাড়ছে। অথচ এই শ্রেণির রাজনীতিবিদদের নির্মূল করা গেলে বাংলাদেশ দ্রুতই ইউরোপ আমেরিকার মতো একটি সুশাসিত, উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।
অসৎ রাজনীতিবিদ নির্মূলের কার্যকর ফর্মুলা:
১. নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন:
রাজনীতিতে সৎ এবং যোগ্য মানুষদের আগমনের প্রধান শর্ত হলো একটি নিরপেক্ষ, স্বাধীন ও প্রযুক্তিনির্ভর নির্বাচন কমিশন।
ইভিএম, ডিজিটাল ভোটার শনাক্তকরণ ও স্বচ্ছ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
২. দলীয় রাজনীতির সংস্কার:
রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
চাটুকার, চামচা বা অর্থশালী নয় ত্যাগী, শিক্ষিত, জনবান্ধব কর্মীদের পদোন্নতি দিতে হবে।
৩. দুর্নীতি দমন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা:
ক্ষমতাসীন দলের হস্তক্ষেপ ছাড়া দুর্নীতির তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক ব্যক্তিদের স্বচ্ছ আয় ব্যয়ের বিবরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৪. বাধ্যতামূলক শিক্ষা ও নৈতিক মানদণ্ড:
রাজনীতিবিদদের জন্য একটি সর্বনিম্ন শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নৈতিক যাচাই প্রক্রিয়া চালু করতে হবে।
নিয়মিত ট্রেনিং ও মূল্যায়ন চালু করা যেতে পারে।
৫. সাংবাদিকতা ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা:
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ও সোচ্চার নাগরিক সমাজ অপরাধী রাজনীতিকদের মুখোশ উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ।
অনলাইন ও অফলাইনে প্রতিটি অপরাধের তথ্য সংগ্রহ করে জনমত গঠন করতে হবে।
৬. আইনের শাসন ও দ্রুত বিচার:
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধ অনুযায়ী শাস্তি দিতে হবে।
দুর্নীতির মামলায় অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে রায় দেয়ার আইন করতে হবে।
বাংলাদেশকে ইউরোপ আমেরিকার মত উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরের রূপরেখা:
১. শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন:
কারিগরি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে শিক্ষিতরা রাজনীতি ও প্রশাসনে আসতে আগ্রহী হয়।
২. ডিজিটাল ও স্মার্ট গভর্ন্যান্স:
সরকারি সেবাগুলো অনলাইনে নিয়ে এসে ঘুষ, দালালি ও সময় অপচয় কমাতে হবে।
প্রত্যেক নাগরিকের জন্য একটি ডিজিটাল সেবা আইডি চালু করা যেতে পারে।
৩. উদ্যোক্তা বান্ধব অর্থনীতি:
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজার তৈরি করতে হবে।
কৃষি, শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হবে।
৪. স্বাস্থ্য ও পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনা:
সরকারি স্বাস্থ্যখাতের মানোন্নয়ন এবং বেসরকারি খাতে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে।
পরিবেশবান্ধব নগরায়ন, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এবং গ্রিন টেকনোলজিতে বিনিয়োগ করতে হবে।
৫. সামাজিক ন্যায়ের রাষ্ট্র গঠন:
ধনী গরিবের ব্যবধান কমিয়ে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সংখ্যালঘু, নারী ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বাস্তবসম্মত নীতিমালা চালু করতে হবে।
সর্বশেষ বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় দেশ শুধু অসৎ, লোভী, অযোগ্য ও দেশবিরোধী রাজনীতিবিদদের দৌরাত্ম্যের কারণেই আজ উন্নয়নের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে আছে। এই অপশক্তির বিরুদ্ধে যদি রাষ্ট্র, সমাজ এবং সাধারণ মানুষ সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হয় এবং রাজনৈতিক সংস্কারের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়, তাহলে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতে বাংলাদেশকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। যোগ্য নেতৃত্ব, প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন, নৈতিকতা ও জনগণের অংশগ্রহণ এই চারটি স্তম্ভই হবে ভবিষ্যতের উন্নত বাংলাদেশের ভিত্তি।
নাজিম উদ্দিন এম এ
যুক্তরাজ্য প্রবাসী

