আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ঘোষিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা। তবে এ রায় বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত— এমনটাই জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের পর গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে গত বছরের আগস্টে ভারতে আশ্রয় নেন শেখ হাসিনা। অনুপস্থিতিতেই বিচার শেষে আদালত তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এখন প্রশ্ন— ভারত কি তাকে ফেরত পাঠাবে?
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মুবাশ্বর হাসান বলেন, ‘তিনি জনরোষ এড়াতে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। ভারতে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া— ঘটনাটি সত্যিই ব্যতিক্রমী।’
শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিসেবে স্বাধীনতার রাজনীতিকে কাছ থেকে দেখলেও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড তার জীবনকে পুরোপুরি বদলে দেয়। সেনা অভ্যুত্থানে বাবা-মা ও তিন ভাই নিহত হওয়ার পর তিনি দীর্ঘ ছয় বছর ভারতে নির্বাসনে থাকেন।
১৯৮১ সালে দেশে ফিরে দেখেন— সাধারণ মানুষের বিশাল প্রত্যাশা তার দিকে। একই সময়ে রাজনীতির মঞ্চে আসেন খালেদা জিয়া। শুরু হয় বাংলাদেশের রাজনীতির বহুল আলোচিত “দুই বেগমের লড়াই”।
১৯৯৬ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ২০০৮ সালে আবার ক্ষমতায় এসে ১৫ বছর দেশ শাসন করেন শেখ হাসিনা। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিরোধী দল দমন, মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ— এসব অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি, যা দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে দেশে একদলীয় শাসনের অভিযোগও প্রভাব ফেলতে থাকে।
সরকারি চাকরির কোটা পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলন ২০২৪ সালে দেশব্যাপী গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। কঠোর দমন-পীড়নে জাতিসংঘের হিসাব মতে ১৪০০ মানুষ নিহত হলেও আন্দোলন থামেনি। বরং এটাই শেষ পর্যন্ত সরকারের পতন ডেকে আনে।
ভারতে আশ্রয়ে থাকা অবস্থায়ই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। অভিযোগ ছিল— বিক্ষোভকারীদের হত্যা ও দমন-পীড়নে সরাসরি উসকানি ও নির্দেশ দেওয়া।
রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে ভেসে ওঠে কান্না আর করতালির মিশ্র প্রতিক্রিয়া। নিহত এক আন্দোলনকারীর বাবা আবদুর রব গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এতে কিছুটা শান্তি পেলাম। পুরো শান্তি পাব, যখন তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে দেখব।’
ভারত আপাতত ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নিয়েছে। হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ বলেন, ‘ভারত আমাদের সবসময় ভালো বন্ধু ছিল। তারা আমার মায়ের জীবন বাঁচিয়েছে।’
ভারতের সাবেক কূটনীতিক অনিল ত্রিগুনায়েত মনে করেন, বাংলাদেশ যে অভিযোগ এনেছে তা ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর সে ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী ভারত তাকে ফেরত না-ও পাঠাতে পারে। তার মতে, শেখ হাসিনা সুপ্রিম কোর্ট বা আন্তর্জাতিক আদালতেও যেতে পারেন, তাই ভারত তাড়াহুড়ো করবে না।
এদিকে রায়ের পরদিনই ভারতকে আবারও চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়— শেখ হাসিনাকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়ে। তাদের মতে, তাকে ফিরিয়ে দেওয়া ভারতের দায়িত্ব।
অন্যদিকে ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই রায় দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এখনো অনিশ্চিত। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারও দেশকে রাজনৈতিক স্থিতি দেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে।

