জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ আসন চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) এ রাজনৈতিক উত্তাপ এখন তুঙ্গে। বিএনপি, জামায়াত এবং সুন্নি জোটের মধ্যে চলছে চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি। তবে এর মধ্যে বিএনপির গ্রুপিংয়ের সুযোগ নিতে চায় জামায়াত। এই আসনে আঞ্চলিকতা (উত্তর ও দক্ষিণ) এবং তীব্র ধর্মীয় প্রভাবের কারণে প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ এবার আরও জটিল হতে চলেছে। সব দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করা ও মাঠ গোছানোর মধ্য দিয়ে ফটিকছড়ি এখন এক চতুর্মুখী এবং উচ্চ-ভোল্টেজের রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়েছে।
চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সরওয়ার আলমগীরকে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে তার অনুসারীদের উদ্যোগে মিটিং, মিছিল ও কর্মী সমাবেশ চলছে। তবে প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য মনোনয়নবঞ্চিত কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহারের অনুসারীরাও থেমে নেই। তারা মানববন্ধন, মশাল মিছিল এবং বিক্ষোভের মাধ্যমে বাহারকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। এর মাধ্যমে দলটির কোন্দল স্থানীয় রাজনীতিতে জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আর এই সুযোগটিই নিতে চায় জামায়াতে ইসলামী।
সম্প্রতি কর্মীদের উদ্দেশে সরওয়ার আলমগীর বলেন, ‘আমি মনে করি, এসবই দলীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ। সবার প্রতি আমার বার্তা থাকবে এক হওয়ার। আমরা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে আছি।’ তবে বিএনপির স্থানীয় কর্মীরা বলছেন, ‘চূড়ান্তভাবে’ যদি ধানের শীষের প্রার্থী নিশ্চিত হয়, তবে সব বিভেদ মিটে যাবে। চূড়ান্ত লড়াইয়ে ফটিকছড়ির বিএনপি এক ও অবিভক্ত থাকবে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে সরওয়ার আলমগীর বলেন, ‘ফটিকছড়িবাসী দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। বিশেষ করে উত্তর ফটিকছড়ি বেশি অবহেলিত। নির্বাচিত হলে পুরো ফটিকছড়ির শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ খাতকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নয়ন কাজ করব।’
ফটিকছড়িতে ইসলামপন্থি রাজনীতির অন্যতম দুটি ধারা হলো জামায়াতে ইসলামী এবং হেফাজতে ইসলাম (কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক শক্তি)। সম্প্রতি নতুন করে আরেকটি ধারা যুক্ত হয়েছে। সেটি হলো বৃহত্তর সুন্নি জোট। জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন এবং হেফাজত সমর্থিত নেজামে ইসলাম পার্টির নেতা শেখ মোহাম্মদ শাহজাহান আলাদাভাবে প্রচার চালালেও জোটগত নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, বৃহত্তর সুন্নি জোটের পক্ষে বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভাণ্ডারী নির্বাচন করছেন। বৃহত্তর সুন্নি জোট এই আসনের নির্বাচনের অন্যতম বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।
জানতে চাইলে সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সাইফুদ্দিন আহমেদ মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘আমরা আশা করছি যথা সময়ে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। আর সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বৃহত্তর সুন্নি জোটের প্রার্থী হিসেবে ফটিকছড়ির সর্বস্তরের জনগণ আমাকেই বেছে নেবে।’
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির মুহিবুল্লাহ বাবু নগরীর সাম্প্রতিক সময়ের বক্তব্যগুলো জামায়াতে ইসলামীর বিপক্ষে গেছে। অন্যদিকে বিএনপি প্রার্থী সরওয়ার আলমগীরের সঙ্গে তার সুসম্পর্ক রয়েছে। সরওয়ার আলমগীর নিয়মিত তার মাদ্রাসায় যাতায়াত করেন।
জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের সম্পর্ক ভালো না থাকলেও নেজামে ইসলামী পার্টির নেতা শেখ মোহাম্মদ শাহজাহান ৮ দলীয় জোটের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘বর্তমানে জামায়াতসহ আমাদের আট দলীয় একটি জোট রয়েছে, জোটের যে সিদ্ধান্ত আসবে আমি সেভাবে কাজ করব।’
জানতে চাইলে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন বলেন, দেশের মানুষ দীর্ঘ দেড় দশক ভোট দিতে পারেনি। এবার ভোট দেওয়ার সুযোগ এসেছে। ফটিকছড়িবাসী এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে তাকে নির্বাচিত করবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি ফটিকছড়িবাসীর খাদেম তথা সেবক হিসেবে কাজ করতে চাই। দেশের মানুষ আমাদের বিজয়ী করলে দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করব। বিশেষ করে ফটিকছড়ির শিক্ষা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করব। উত্তরে একটি নতুন উপজেলা হচ্ছে। দুই উপজেলায় দুটি স্টেডিয়াম নির্মাণের উদ্যোগ নেব। একই সঙ্গে এলাকাভিত্তিক খেলার মাঠ গড়ে তুলব।’
গণঅধিকার পরিষদের রবিউল হাসান তানজিম ২৫ বছর বয়সে প্রার্থী হয়েছেন। এর মাধ্যমে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে এনে গণঅধিকার পরিষদ ভাসমান ও নীরব ভোটারদের মাঝে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে। তারা প্রধান দলগুলোর পুরোনো পদ্ধতির রাজনীতির বাইরে এসে একটি নতুন বার্তা দিতে চাইছেন।
রবিউল হাসান বলেন, ‘রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্লোগান আমরা দিয়েছি তা এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। নির্বাচিত হলে সংস্কার কাজগুলো ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করব। স্বাধীনতার পর থেকে উত্তর ফটিকছড়ি থেকে কেউ সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়নি। অথচ উত্তরে বিশাল ভোটব্যাংক রয়েছে। সেই ভোটগুলো পেলে আমার নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি বেড়ে যাবে।’
ফটিকছড়ি আসনে এনসিপির মনোনয়নপ্রত্যাশী মুহাম্মদ একরামুল হক বলেন, ‘ফটিকছড়িতে এনসিপির একাধিক প্রার্থী রয়েছে। প্রস্তুতি বেশ ভালো। সাতজন মনোনয়নপ্রত্যাশা করলেও দল যাকে দেবে সবাই তাকে বিজয়ী করার জন্য কাজ করবে। ৫৩ বছর ধরে যে রাজনৈতিক ধারা চলে আসছে আমরা তার পরিবর্তন চাই। লুটতরাজ, মাফিয়া চক্র যাতে সংসদে যেতে না পারে। আমরা ভোটারদের অধিকার ভোটারদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে দেশের মালিকানা জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিতে চাই। আমরা আশা করছি জনগণ তার অধিকার ফিরে পেতে এনসিপিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে।’

