ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি
ছবি: প্রতিনিধি
তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়ে গেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী নির্ধারিত তারিখে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অচলাবস্থার পর দেশ এখন নির্বাচনের পথে–এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এবারের নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি।
এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদের ৩ নম্বর আসন ঠাকুরগাঁও-১ আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার ২২টি ইউনিয়ন ও ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে সবচেয়ে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। নিজ জেলার এই আসনে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন। তফসিল ঘোষণার পর আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা বন্ধ থাকলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রস্তুতি পর্ব চলছে। এরই মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন তার চাচাতো ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি নূরে শাহাদাত স্বজন। বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তবে নির্বাচনি মাঠ মোটেও একপক্ষীয় নয়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঘোষিত প্রার্থী মো. দেলাওয়ার হোসেন ইতোমধ্যে মাঠে সক্রিয়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক নির্যাতনের শিকার এই নেতা তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই জনসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। গ্রামেগঞ্জ, হাটবাজার, সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান–সবখানেই নিয়মিত উপস্থিতি দেখা গেছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি দেলাওয়ার হোসেনকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রচারে পিছিয়ে নেই তার টিম।
বিএনপি ও জামায়াতের পাশাপাশি এ আসনে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা হাফিজ উদ্দিন এবং জাকের পার্টি মনোনীত প্রার্থী মাহবুবুর রহমান ডালিম। এসব দলের প্রার্থীও নির্বাচনি প্রচারের জন্য আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষায়।
বিএনপি মহাসচিব ও ঠাকুরগাঁও-১ আসনের প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমি জাতীয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ঠাকুরগাঁও-১ আসনই আমার রাজনৈতিক জীবনের কেন্দ্র। ১৯৯১ সাল থেকে এই আসনে নির্বাচন করে আসছি এবং কখনোই ঠাকুরগাঁও ছেড়ে অন্য কোথাও যাইনি। এই আসনের সঙ্গে আমার ও আমার পরিবারের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। আমার বাবা মরহুম মির্জা রুহুল আমিন দীর্ঘ ২৫ বছর পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। আমি নিজে ও আমার ছোট ভাইও পৌরসভার চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছি।’
তিনি বলেন, ঠাকুরগাঁওয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও কর্মসংস্থানের অভাব। মানুষ প্রধানত কৃষিনির্ভর হলেও একসময় সেচের পানির তীব্র সংকট ছিল। ২০০১ সালে এমপি ও মন্ত্রী থাকাকালে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা হয়। পাশাপাশি ভুট্টা চাষ প্রকল্প চালুর মাধ্যমে এই অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, অ্যাগ্রোবেজড শিল্প গড়ে তোলা, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং আলুভিত্তিক শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই প্রধান লক্ষ্য। সরকার পরিচালনার সুযোগ পেলে ঠাকুরগাঁও বিমানবন্দর চালু, একটি ইপিজেড, ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঠাকুরগাঁও তার জন্মভূমি ও রাজনীতির আবেগের জায়গা। এই জেলার উন্নয়নকে তিনি নিজের দায়িত্ব মনে করেন এবং অতীতের ধারাবাহিকতায় ভবিষ্যতেও জনকল্যাণমূলক উন্নয়নকাজ চালিয়ে যাবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ‘অনেক ত্যাগের বিনিময়ে আমরা নতুন বাংলাদেশের পথে এসেছি। এবার আমি চাই ঠাকুরগাঁওয়ের মানুষের কাঙ্ক্ষিত সমাজ বিনির্মাণ করতে। যুবসমাজকে কর্মসংস্থানে আনতে চাই। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন নিশ্চিত করলে জেলা একটি উন্নয়নের মডেল হিসেবে গড়ে উঠবে। জনগণের সঙ্গে ঘুরে সব শ্রেণির মানুষের কথা শুনছি। আমি নিশ্চিত, আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে শান্তিপূর্ণ ও সাজানো জেলা গড়ে তুলতে পারব।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিগত দিনের নেতারা শুধু নিজেদের স্বার্থে ব্যস্ত ছিলেন। আমি চাই ভোটাররা এমন একজনকে নির্বাচিত করবেন, যিনি প্রকৃতভাবে ঠাকুরগাঁওয়ের উন্নয়নের জন্য কাজ করবেন। নির্বাচিত হলে বিমানবন্দর পুনরায় চালু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর উন্নয়ন, কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, চাঁদাবাজমুক্ত ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলা এবং দুর্নীতিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় কাজ করব। আমি সব সময় জনগণের পাশে থাকার জন্য প্রস্তুত।’
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণ ও সংখ্যালঘু ভোটার। ফলে নির্বাচনি ফলাফলে এই দুই শ্রেণির ভোটার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তফসিল ঘোষণার পর ঠাকুরগাঁও-১ আসনের ভোটের মাঠে নতুন গতি এসেছে। হেভিওয়েট প্রার্থী ও দলীয় প্রচারের পাশাপাশি এলাকার সাধারণ মানুষও নজর কাড়ছে। দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ আর দৈনন্দিন কষ্টের মধ্যে এখানকার খেটে খাওয়া মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট–নির্বাচিত প্রতিনিধি যেন তাদের কথা সংসদে তুলে ধরেন।
ঠাকুরগাঁও পৌরসভা এলাকার রিকশাচালক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। রাজনীতির বড় কথা বুঝি না। কিন্তু ভোটটা শান্তিতে দিতে চাই। যাকে ভোট দেব, তিনি যেন আমাদের মতো খেটে খাওয়া মানুষের কষ্টের কথা সংসদে বলেন–এইটুকুই আশা।’
সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের দিনমজুর রহিম আলী বলেন, ‘দিন এনে দিন খাই। কাজ না থাকলে পরিবার নিয়ে বিপদে পড়তে হয়। নির্বাচনের সময় অনেক কথা শুনি, কিন্তু পরে কেউ খোঁজ নেন না। আমরা চাই এমন একজন প্রতিনিধি, যিনি কাজের সুযোগ তৈরি করবেন।’
১৯৮৪ সালে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলা বিভক্ত হয়ে ঠাকুরগাঁও জেলা গঠনের পর থেকেই ঠাকুরগাঁও-১ আসনটি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১০টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে এই আসনে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি দুবার এবং জাতীয় পার্টি একবার জয়ী হয়েছে।
ঠাকুরগাঁও জেলা নির্বাচন অফিস জানিয়েছে, তফসিল অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে এবং নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে তারা আশাবাদী।
সব মিলিয়ে তফসিল ঘোষণার পর ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ভোটের রাজনীতি নতুন ধাপে প্রবেশ করেছে। হেভিওয়েট প্রার্থী, একাধিক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ এবং ভোটারদের উচ্চ প্রত্যাশা–সবকিছু মিলিয়ে এই আসনটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।

