ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তসংক্রান্ত প্রেস ব্রিফিংগুলো লক্ষ্য করলে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের অহেতুক, অপ্রাসঙ্গিক ও সময়ের আগের প্রশ্ন শুধু বিব্রতকরই নয়, বরং তদন্ত প্রক্রিয়ার জন্যও বিরক্তিকর ও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একটি অত্যন্ত গোপনীয় ও তদন্তাধীন বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করাই যেখানে প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে অবাধ প্রশ্নোত্তরের সুযোগ দেওয়া তদন্তের স্বার্থের পরিপন্থী।
তদন্ত একটি সংবেদনশীল ও ধাপে ধাপে এগোনো প্রক্রিয়া। এখানে প্রতিটি তথ্যের সময়, প্রেক্ষাপট ও প্রকাশের সীমা নির্ধারিত থাকে। তদন্ত চলাকালীন অতিরিক্ত প্রশ্ন—বিশেষ করে অনুমাননির্ভর, উত্তেজক বা অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন—তদন্তকারীদের ওপর অযথা চাপ সৃষ্টি করে, সাক্ষ্যপ্রমাণের গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন করে এবং অনেক সময় তদন্তের দিকনির্দেশনাই দুর্বল করে দেয়। ফলে তদন্তের অগ্রগতির স্বার্থে এমন ব্রিফিং না করাটাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত।
তবে একেবারেই নীরবতা বজায় রাখাও সবসময় বাস্তবসম্মত নয়। জনস্বার্থে এবং গুজব রোধে তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সীমিত ও যাচাইকৃত তথ্য শেয়ার করা যেতে পারে—কিন্তু তা হবে সংক্ষিপ্ত, লিখিত বিবৃতি আকারে এবং প্রশ্নোত্তরের সুযোগ ছাড়াই। তদন্ত শেষ হওয়ার পর পুরো ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ, প্রমাণভিত্তিক তথ্য ও সিদ্ধান্ত একসাথে প্রকাশ করাই হওয়া উচিত আদর্শ পন্থা। এতে করে স্বচ্ছতা বজায় থাকে, আবার তদন্তও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সাংবাদিকের প্রশ্ন শুনে মনে হয়—এদের না আছে সাংবাদিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, না আছে পেশাগত প্রশিক্ষণ, না আছে সাংবাদিকতার নীতিমালা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান। প্রশ্নের মান, ভাষা ও উদ্দেশ্য প্রায়ই পেশাগত শালীনতার সীমা ছাড়িয়ে যায়। এটি শুধু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বিব্রত করে না, সাংবাদিকতা পেশার সামগ্রিক মানকেও ক্ষুণ্ন করে। হলুদ সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ এখানে আলাদা করে বলারও প্রয়োজন পড়ে না—এর ক্ষতিকর প্রভাব আমরা বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি।
উন্নত সাংবাদিকতার জন্য কিছু পরামর্শ
প্রথমত, তদন্তসংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন করার আগে সাংবাদিকদের উচিত আইনগত সীমাবদ্ধতা ও নৈতিক দায়বদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকা।
দ্বিতীয়ত, অনুমান বা গুজবনির্ভর প্রশ্ন পরিহার করে তথ্যভিত্তিক ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকা জরুরি।
তৃতীয়ত, মিডিয়া হাউসগুলোকে তাদের সাংবাদিকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও নীতিমালাভিত্তিক কর্মশালা আয়োজন করতে হবে।
চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে স্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে — তদন্ত চলাকালীন কীভাবে, কতটুকু এবং কোন মাধ্যমে তথ্য প্রকাশ করা হবে।
সবশেষে বলা যায়, তদন্তের সাফল্য ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে শৃঙ্খলাবদ্ধ যোগাযোগ অপরিহার্য। একই সঙ্গে দায়িত্বশীল ও উন্নত সাংবাদিকতাই পারে জনস্বার্থ রক্ষা করতে, সত্য উদ্ঘাটনে সহায়ক হতে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থা বজায় রাখতে।

