• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ও কিছু কথা : ড. আমিনুল ইসলাম

প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৭:১৯
আপডেট: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৭:১৯

‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ ও কিছু কথা : ড. আমিনুল ইসলাম

ড. আমিনুল ইসলাম

দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে বাংলাদেশে ফিরে ২৫ ডিসেম্বর জনাব তারেক রহমান যে ভাষণ দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে। এই ভাষণটির কয়েকটি দিক বিশেষভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

আমরা সাধারণত রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের ভাষণে দীর্ঘ ভূমিকা ও অতীতমুখী বক্তব্য শুনতে অভ্যস্ত। এ নিয়ে তরুণ প্রজন্ম অতীতে বহুবার অসন্তোষ প্রকাশ করলেও রাজনৈতিক আচরণে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। সে দিক থেকে তারেক রহমানের ভাষণটি ছিল ব্যতিক্রম। তিনি দীর্ঘ ভূমিকা এড়িয়ে গেছেন, কারও প্রতি বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করেননি। বরং সহজ, সরল ও প্রাঞ্জল ভাষায় নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এতে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট-তিনি পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কতটা বাস্তব রূপ পাবে?

রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ও সংস্কার আজ দেশের অধিকাংশ মানুষেরই প্রত্যাশা। তবে এই পরিবর্তন কোনো একক রাজনৈতিক দলের পক্ষে সম্ভব নয়। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে। অন্যথায় হোঁচট খাওয়ার যেমন আশঙ্কা থাকে, তেমনি লক্ষ্যে না পৌঁছানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়। সেই উপলব্ধি থেকেই হয়তো তারেক রহমান বলেছেন- “আমরা যে ধর্মের মানুষ হই, আমরা যে শ্রেণির মানুষ হই, আমরা যে রাজনৈতিক দলের সদস্য হই অথবা একজন নির্দলীয় ব্যক্তি হই; যেকোনো মূল্যে আমাদের এই দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।”

এই বক্তব্যে স্পষ্ট, তিনি দল-মত নির্বিশেষে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনার কথা ভাবছেন। কিন্তু বাস্তবে এর প্রতিফলন আমরা কতটা দেখতে পাব, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ক্ষমতায় গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন বা নিঃশেষ করার প্রবণতা আমাদের রাজনীতিতে বারবার দেখা গেছে। সেই প্রক্রিয়ারই অংশ হিসেবে তারেক রহমানকে দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। যারা অতীতে অপরাধ করেছে, তাদের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। তবে বাদবাকি সবাইকে নিয়েই তো সামনে এগোতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এমন প্রতিপক্ষদের সঙ্গে পথ চলা যে আবেগগতভাবে কঠিন; তা বলাই বাহুল্য। এই আবেগ ও অভিমান অতিক্রম করে তিনি কীভাবে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোবেন, সেই “প্ল্যান” কতটা প্রস্তুত, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।

তারেক রহমান তার বক্তব্যে সব ধর্ম ও শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন। অথচ বাস্তবতা হলো-আমাদের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থায় কৃষক, শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষের চাওয়া-পাওয়া খুব কমই গুরুত্ব পায়। এই জায়গায় বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স পয়েন্ট হতে পারে। সেখানে কৃষি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ডসহ কিছু বাস্তবমুখী প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে।

তবে প্রশ্ন থেকে যায়-এই ৩১ দফা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে? কত সময় লাগবে? এ বিষয়ে দলের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে কি না, তা জনগণ জানতে চায়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম বর্তমানকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা জানতে চায়-আগামী ছয় মাস বা এক বছরে তারা কী পাবে। দুই বা পাঁচ বছর পরের প্রতিশ্রুতি তাদের খুব একটা আশ্বস্ত করে না। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কথা যেন আমরা ভুলে না যাই। অর্থাৎ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদি বাস্তব ফলাফলও দেখাতে হবে।

তারেক রহমান শিশু, নারীসহ সব বয়সের মানুষের নিরাপত্তার কথা বলেছেন। কিন্তু গত ১৫ মাসে আমরা দেশে যেভাবে মব সংস্কৃতির বিস্তার দেখেছি, তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এটি যেন ধীরে ধীরে এক ধরনের ‘প্র্যাকটিসে’ পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ভাষণে তিনি মার্টিন লুথার কিং-এর বিখ্যাত উক্তির প্রসঙ্গ টেনে বলেন- “মার্টিন লুথার কিং-এর একটি বিখ্যাত উক্তি আছে- ‘আই হ্যাভ আ ড্রিম’। আজ বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে আমি বলতে চাই—‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’।”তিনি বলেছেন, তিনি দেশে শান্তি চান। কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠার সেই “প্ল্যান”গুলো কী, তা জনগণের সামনে স্পষ্ট করা জরুরি।

২৫ ডিসেম্বর তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে ঢাকায় যে বিপুল জনসমাগম হয়েছে, তা প্রমাণ করে- তারেক রহমান বিএনপির নেতা হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। এখন প্রশ্ন হলো-তিনি কি শুধু একটি দলের নেতা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবেন, নাকি দেশের সব নাগরিকের নেতা হয়ে উঠতে পারবেন?

দেশের মানুষের নেতা হতে হলে দলীয় গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে কাজ করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশ নানা ধরনের সংকট ও অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট, সামাজিক অস্থিরতা প্রকট। কখনো নারী নির্যাতন, কখনো ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা, আবার কখনো গণমাধ্যমের ওপর আঘাত। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।

এই পরিস্থিতিতে তারেক রহমান কি পারবেন সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের শান্তির দেশে রূপান্তর করতে? বাংলাদেশের মানুষ বারবার হোঁচট খেয়েও আবার বিশ্বাস করতে চায়। সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষার জায়গা থেকেই হয়তো লাখো মানুষ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে তাকে স্বাগত জানিয়েছে। এখন দেখার বিষয়- তিনি কি এই প্রত্যাশার প্রতিদান দিতে পারবেন?

ড. আমিনুল ইসলাম

লেখক ও প্রাবন্ধিক
ই-মেইল: tutul_ruk@yahoo.com