• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

প্রত্যাবর্তন বনাম নির্বাসন: আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ছবি

প্রকাশ: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৭:০৮
আপডেট: শনিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৭:০৮

প্রত্যাবর্তন বনাম নির্বাসন: আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ছবি

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মুহূর্ত থাকে, যা শুধু একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না—তা হয়ে ওঠে সময়ের প্রতীক। তারেক রহমানের দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন ভেঙে দেশে ফেরা তেমনই এক প্রতীকী মুহূর্ত। এটি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতার প্রত্যাবর্তন নয়; বরং আরেক সম্ভাবনাময় অধ্যায়ের সূচনা।

বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে তারেক রহমান যা লিখেছেন, তা ছিল সরাসরি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়—কিন্তু তার তাৎপর্য গভীরভাবে রাজনৈতিক। ক্ষমতা, সম্মান, অবমাননা—সবকিছুই আল্লাহর হাতে—এই বাণী যেন গত দেড় দশকের বাংলাদেশের ক্ষমতার রাজনীতির প্রতিচ্ছবি। শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ না করেও তারেক রহমান বুঝিয়ে দিয়েছেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, নির্বাসনও নয়।

১৭ বছর আগে যে মানুষটিকে ‘পলাতক’, ‘দণ্ডপ্রাপ্ত’, ‘রাজনীতি থেকে নির্বাসিত’ হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছিল, তিনি আজ ফিরছেন ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে। বিমানবন্দরে নেমে জুতা খুলে খালি পায়ে দেশের মাটিতে পা রাখা, একমুঠো মাটি হাতে তুলে নেওয়া—এসব নিছক আবেগী দৃশ্য নয় শুধু। তারেক রহমান জানেন, রাজনীতি শুধু বক্তব্যে হয় না, দৃশ্যেও হয়।

অন্যদিকে, এই দৃশ্যের বিপরীত প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন শেখ হাসিনা। যিনি টানা দেড় দশক রাষ্ট্রক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন, যিনি নিজেকে ‘অপরিহার্য’ মনে করেছিলেন, তিনি আজ দেশের বাইরে—ভারতে আশ্রিত। ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, যিনি অন্যকে নির্বাসনে পাঠিয়েছিলেন, তিনিই আজ কার্যত নির্বাসিত।

ভারতীয় একটি গণমাধ্যম তাঁকে “নিয়তির সন্তান” আখ্যা দিয়ে লিখেছিল, তাঁর ফেরাকে দেখছে এক প্রকার ইতিহাসের পূর্ণচক্র হিসেবে। একসময় শেখ হাসিনার শাসনামলে যাঁর নাম উচ্চারণ পর্যন্ত দেশের মিডিয়ায় নিষিদ্ধ ছিল, আজ তাঁকেই ভারতের গণমাধ্যমসহ বিদেশি মিডিয়ায় স্বাগত জানানো হচ্ছে—এ যেন নিয়তিরই খেলা।

এই প্রত্যাবর্তন বনাম নির্বাসনের দ্বন্দ্বই আগামীর বাংলাদেশের রাজনৈতিক মনস্তত্ত্ব নির্ধারণ করবে।

প্রতিশোধ নয়, পরিকল্পনার ভাষা : গণসংবর্ধনা মঞ্চে তারেক রহমানের বক্তব্য ছিল লক্ষণীয়ভাবে সংযত। কোনো প্রতিশোধের হুমকি নেই, নেই বিদ্বেষের আগুন। বরং তিনি বলেছেন—“একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই”, “সময় এসেছে সবাই মিলে দেশ গড়ার”, “হ্যাভ অ্যা প্ল্যান”। এই ভাষা স্পষ্টতই একটি রিব্র্যান্ডিং।

দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি ছিল আন্দোলননির্ভর রাজনীতি করা একটি দল। কিন্তু তারেক রহমানের বক্তব্যে উঠে এসেছে পরিকল্পনা, নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ—যা একটি সরকার-প্রস্তুত দলের ভাষা। প্রশ্ন হলো, এটি কি কেবল বক্তৃতার কৌশল, নাকি সত্যিই বিএনপি একটি নতুন রাজনৈতিক দর্শনের দিকে হাঁটছে?

উত্তাল প্রেক্ষাপটে প্রত্যাবর্তন: তারেক রহমান এমন এক সময়ে দেশে ফিরলেন, যখন বাংলাদেশ কার্যত একটি রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশ এখন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ—যা স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন।

এই শূন্যতায় বিএনপি সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু এই শক্তি যেমন সম্ভাবনার, তেমনি ঝুঁকির। সাম্প্রতিক সহিংসতা, মগবাজারে ককটেল বিস্ফোরণ, আন্দোলন সংশ্লিষ্ট নেতাদের রহস্যজনক মৃত্যু—সবই জানান দিচ্ছে, দেশ এখনো স্থিতিশীল নয়।

এই বাস্তবতায় তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—তিনি কি পরিস্থিতিকে শান্ত করতে পারবেন?

ভারত ফ্যাক্টর: অস্বস্তি ও সম্ভাবনা: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে জটিল। তিস্তা ইস্যুতে তারেক রহমানের কড়া অবস্থান, সীমান্ত হত্যা নিয়ে সোচ্চার বক্তব্য—এসব দিল্লির অস্বস্তির কারণ হতে পারে।

তবে বাস্তবতা বদলেছে। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ, শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রিত—এই প্রেক্ষাপটে ভারত নতুন বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য। বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে, দিল্লির সামনে বিকল্প খুব বেশি থাকবে না। তারেক রহমান স্পষ্টভাবেই বলেছেন – ‘না দিল্লি, না পিণ্ডি, না অন্য কেউ- বাংলাদেশ আগে।’ বরং ‘বাংলাদেশ-প্রথম’ নীতিতে বিশ্বাসী, পাকিস্তানের সঙ্গেও সমদূরত্ব বজায় রাখা একজন নেতা—ইউনূস প্রশাসনের কথিত প্রো-পাকিস্তান ঝোঁকের চেয়ে ভারতের কাছে হয়তো কম ঝুঁকিপূর্ণই মনে হতে পারে।

নরেন্দ্র মোদির খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ এবং বিএনপির কৃতজ্ঞতা—এই বার্তা বিনিময় কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ইঙ্গিত দেয়, দুই পক্ষই সম্পর্কের নতুন অধ্যায় খুলতে আগ্রহী, যদিও শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার বিষয়টি দীর্ঘদিনের অস্বস্তি হয়ে থাকবে।

বিএনপির সামনে কঠিন প্রশ্ন: তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য যেমন আশীর্বাদ, তেমনি পরীক্ষাও। ১৭ বছরের অনুপস্থিতির পর তিনি কি মাঠের রাজনীতিকে বুঝতে পারবেন? জামায়াতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা, তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা, রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চাপ—সবকিছু একসঙ্গে মোকাবিলা করা সহজ নয়।

তবে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার পর বিএনপি নতুনভাবে আরো সংগঠিত হতে পারে। তাঁর উপস্থিতি মাঠে কর্মীদের মনোবল বাড়াবে, আন্তর্জাতিক মহলেও বার্তা দেবে—বিএনপি ফের শক্তিশালী হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তিনি কি অতীতের বিএনপিকে ফিরিয়ে আনবেন, নাকি একটি নতুন বিএনপি গড়বেন?

বাংলাদেশ এখন প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠনের রাজনীতি চায়। যদি তারেক রহমান সেই আকাঙ্ক্ষা বুঝতে পারেন, তবে তার প্রত্যাবর্তন ইতিহাসে ইতিবাচক অধ্যায় হিসেবেই লেখা হবে। দেশের সম্ভাব্য পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এর মধ্যে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছে।

একজন দীর্ঘ নির্বাসনের পর দেশে রাজকীয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন, অন্যজন দীর্ঘ শাসনের পর নিজেই নির্বাসিত। এই দুই বিপরীত যাত্রাপথই আজ বাংলাদেশের রাজনীতিকে নতুন প্রশ্নে, নতুন সংজ্ঞায় দাঁড় করিয়েছে। এক সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল, সেটিই আজ বিচার করছে তাকেই।

প্রত্যাবর্তন আর নির্বাসনের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আজ নিজেকেই প্রশ্ন করছে—আমরা কোন পথে যাব? ক্ষমতার পুনরাবৃত্তির পথে, নাকি একটি নতুন রাজনৈতিক চুক্তির পথে?

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজারই শুরু।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: niazjournalist@gmail.com