• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনঃ বাংলাদেশের নয়া রাজনৈতিক ব‍্যবস্হার বিশ্লেষণ

প্রকাশ: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৩:৩৫
আপডেট: সোমবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৩:৩৫

তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনঃ বাংলাদেশের নয়া রাজনৈতিক ব‍্যবস্হার বিশ্লেষণ

৫ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ঐতিহাসিক দিন। কেননা এই দিনে একটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার নামে একটি অগণতান্ত্রিক ও ফ‍্যাসিবাদী সরকারের বিদায় এবং আরেকটি নতুন রাজনৈতিক ব‍্যাবস্হার গোড়াপত্তনের মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় ছিল প্রিয় বাংলাদেশ! আর সেই অপেক্ষার পালা এবং একটি রাজনৈতিক ব‍্যবস্হার নতুন যুগে শুরু হলো দীর্ঘ ১ বছর ৪ মাস পর জনাব তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে।

রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৮১৪ সালে একটি অবিস্মরণীয় রাজনৈতিক নির্বাসন হয়েছিল (যদিও এটা প্রথম নয়) নেপোলিয়ন বোনাপোর্তকে আলবা দ্বীপে পাঠানোর মাধ্যমে।নেপালিয়নের নির্বাসনের এক বছরের মধ্যেই তিনি ফ্রান্সে ফিরে আসেন এবং শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন।যদিও তিনি একশো দিনের পরিকল্পনার মধ্যেই ডিউক অব ওয়েলিংটনের যৌথ বাহিনীর কাছে ওয়াটারলো যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পরের বছর ১৮১৫ সালে আবার ও সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হন।

সুতরাং দুটি রাজনৈতিক নির্বাসনের গল্পে শিক্ষণীয় ও করণীয় বিষয়গুলো আলোচনার শেষাংশে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এবার আসা যাক জনাব তারেক রহমানের রাজকীয় স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের নতুন অধ্যায় ও আকাঙ্ক্ষার আলোকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিক বিশ্লেষণ।তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রত‍্যাবর্তন তার দলীয়, জাতীয় ও আঞ্চলিক/আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আলোচনা করা যায়।প্রথমেই জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়গুলোর বিশ্লেষণ করা যাক।

প্রথমতঃ রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির দলীয় পুনরুজ্জীত (Rejuvenation) ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার দিকে এগিয়ে যাবে।বিশেষ করে বেগম জিয়ার অসুস্থতার ফলে যে রাজনৈতিক সংকট ও শূন্যতা বিএনপিকে ধীরগতির মনে হত এখন তা অতিক্রম করে তৃণমূল নেতা-কর্মীদেরকে উজ্জীবিত করে তোলার মাধ্যমে তা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে।

দ্বিতীয়তঃ রাজনীতি বিজ্ঞানের জনক এরিস্টটল মানুষকে রাজনৈতিক জীব (Political being) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। সুতরাং সেই রাজনৈতিক জীবের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন (Psychological reset) রাজনৈতিক ব্যবস্হায় প্রাতিষ্ঠানিক রূগ্নতা দূরকল্পে, এবং সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়ার পথ প্রশস্ত হবে।

তৃতীয়তঃ জনাব তারেক রহমানের সক্রিয় উপস্থিতি বিএনপির দলীয়ভাবে রাজনৈতিক সংহতি (Political mobilization) ও নেতৃত্ব বৃদ্ধি পাবে। কারণ তার দীর্ঘ নির্বাসনের ফলে দেশে যে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা ও সংকটের জন্ম দিয়েছে তা থেকে বেরিয়ে আসতে তার সক্রিয় উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল।

চতুর্থতঃ রাজনৈতিক কৌশলগত দিক বিবেচনায় বলা যায় তার প্রত‍্যাবর্তনের ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগীদের (Political rivalries) সাথে একটা স্হির অথচ ধীর সম্পর্কের সৃষ্টি হবে। জনাব তারেক রহমান বরাবরই ৭১ এবং ২৪ শের সম্মিলিত রাজনৈতিক প্রয়াসে দেশ পরিচালনা করতে চান। সেই দিক থেকে বলা যায় এনসিপি ও সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হবে। অপরদিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের সাথে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে ধীর ও গভীর প্রতিযোগিতা এবং প্রতিবাদ বৃদ্ধি পাবে। কারণ তাদের রাজনৈতিক ম‍্যান্ডেট হিসেবে একাত্তরের চেয়ে চব্বিশের চেতনায় বিশ্বাসী।বিশেষ করে ফ‍্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর যে রাজনৈতিক দৃশ্যপট (Political landscape) তৈরি হয়েছে তা খুব শীঘ্রই পরিবর্তন হবে।

পঞ্চমতঃ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে তার এই প্রত‍্যাবর্তন শীঘ্রই আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির পুনরুদ্ধার হবে। কারণ প্রশাসনের গভীরে রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটা প্রভাব লক্ষণীয় ভাবে দেখা যাবে। তারেক রহমান এমন বাংলাদেশ গড়তে চান, যেখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান, পাহাড় থেকে সমতল সবাই নিজের দেশকে ধারণ করবে এবং একজন মায়ের মতো দেশকে ভালোবাসবে ও নিরাপদ মনে করবে।

ষষ্ঠতঃ বিগত ফ‍্যাসিবাদী সরকারের ১৫ বছরের গণমাধ্যম সংস্কৃতি কিংবা গণমাধ্যমের সংবাদের প্রকাশের ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা ও ওজনপ্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু তারেক রহমানের নেতৃত্বে গুন হলো তিনি সমালোচনাকে ধারণ করতে পারেন। তাই নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গণমাধ্যমগুলোতে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, জনাব তারেক রহমান মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নেতা মার্টিন লুথার কিংয়ের বিখ্যাত একটি উক্তি, “I have a dream” এর আদলে উজ্জীবিত হয়ে বলেছেন, “I have a plan”। কিন্তু তার এ বক্তব্য ইতিমধ্যে ভারতীয় গণমাধ্যমে বিকৃতি ব‍্যাখ‍্যার মাধ‍্যমে ভারত বিরোধী বক্তব্য হিসেবে প্রচারিত হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের গনমাধ্যমেও এই জাতীয় অপপ্রচারের পাল্টা খবর প্রচারিত হয়েছে, যা পরিবর্তিত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের গণমাধ্যমের জন্য অপরিহার্য। এখানে উল্লেখ‍্য যে, জনাব তারেক রহমানের “I have a plan” মর্ম কথা হলো তিনি বাংলাদেশকে এবং দেশের জনগণের জন্য, রাজনৈতিক স্হিতিশীলতা ও উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি এবং পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে সবার আগে বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বুঝিয়েছেন।তাছাড়া তিনি শেষ করেছেন, “We have a plan” কথাটি বলে। যার মর্মার্থ হলো সবাইকে নিয়ে তিনি তার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চান। সুতরাং বলা যায় তিনি স্বপ্ন দেখা শেষ করে ইতিমধ্যে তিনি তার পরিকল্পনাসমুহ গত ১৭ বছরে নির্বাসিত জীবনে আত্মস্থ ও পর্যবেক্ষণ করেছেন । এখন তা সুযোগ পেলে বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হবে। আশা করা যায় তারেক রহমানের “রাজনৈতিক নয়া দর্শন” রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনবে। আর এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।

এবার আসা যাক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার নেতৃত্বের প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দিকসমূহের বিশ্লেষণ।

প্রথমতঃ তারেক রহমান ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে একটি দর্শন ঘোষণা করেছেন, তা হলো “দিল্লী নয়, পিন্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ”। সুতরাং বলা যায়, “Foreign policy shifts” একটা সময়ের ব‍্যাপার মাত্র। যদিও বর্তমান মধ‍্যবর্তী সরকার তা শুরু করে দিয়েছেন। কিন্তু এই পরিবর্তন ভারতের নির্ভরশীল নীতি থেকে সরে আসার সূত্রপাত মাত্র। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সামরিক, প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ নির্ভরতা, অর্থনৈতিক নীতি এবং উন্মুক্ত অর্থনৈতিক করিডোরের পথে নতুন করে দরকষাকষির হবে। অর্থাৎ ঐতিহাসিক জোটবদ্ধতার চেয়ে জাতীয় স্বার্থের আলোকে সম্পর্ক পুননির্ধারণ করা হবে।

দ্বিতীয়তঃ বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার জন্য স‍্যাবোটেজ, গুপ্ত হামলা ও গুপ্ত রাজনৈতিক কৌশল এবং ফ‍্যাসিস্ট সরকারের বলপ্রয়োগ রিটার্ন নীতি দায়ী। আর এই নীতির সাথে বৃহৎ আঞ্চলিক শক্তির ছায়া শক্তি জড়িত। বাংলাদেশের উপরিউক্ত দৃশ‍্যপট তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ফলে একটা শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং এই বাস্তবতায় অগ্রসর হতে পারলে খুব দ্রুত আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাও (Regional Stability) রক্ষা পাবে।

তৃতীয়তঃ ভূরাজনৈতিক সমতার (Geopolitical balancing) ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ভারতকে কেন্দ্র করেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সেক্ষেত্রে চীন, পাকিস্তান এবং পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কৌশল ( Multi disciplinary strategy) গ্রহণ করা হবে।

সুতরাং তারেক রহমানের রাজনৈতিক ব‍্যাবস্হার নতুন রাজনৈতিক দর্শন জাতিকে এবং তার নেতৃত্বকে নতুনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যেখানে তিনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে প্রত‍্যাশিত এক নতুন বাংলাদেশ গঠনের পরিকল্পনা করেছেন। যে বাংলাদেশে জুলাই যোদ্ধা হাদির স্বপ্নের গণতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে, আধিপত্যবাদ শক্তির গুপ্তচরেরা নিপাত যাবে, সর্বোপরি এক মায়ের মতো নিরাপদ বাংলাদেশের পরিকল্পনা করেছেন। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রধান কারিগর হলেন, এদেশের তারুণ্যের শক্তি, কৃষক-শ্রমিকের শক্তি এবং শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
এমতাবস্থায়, তারেক রহমানের নেতৃত্বে আগামী বাংলাদেশ কেমন হবে, তার পরিবর্তিত রূপরেখা ঠিক নেপোলিয়ন বোনাপোর্তের একশ দিনের পরিকল্পনার মতোই, আগামী একশ দিনের মধ্যে পরিস্থিতির দিক নির্ধারিত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, তারেক রহমানের “আমাদের পরিকল্পনা” বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া তথা বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন জাতির নতুন পরিচয় ও আত্মমর্যাদার নতুন ইতিহাস রচিত হবে। আর সে জন্য প্রয়োজন দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি গণতান্ত্রিক প্লাটফর্মে ফিরে আসা।

মোঃ শাহজাহান মিয়া
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক জাতীয় বিতার্কিক
বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত
shahjahanau.bd@gmail.com

বার্তা প্রেরক,
ইয়াসমিন আক্তার
বিশেষ প্রতিনিধি
জনতার আওয়াজ,লন্ডন ।