ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ, লন্ডন
বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তবে বাস্তবতা হলো—প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় যদি কড়া নজরদারির আওতায় না আসে এবং ব্যয়-সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত না করা যায়, তাহলে নির্বাচন যথাযথ ও অর্থবহ হওয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থেকে যায়। নির্বাচনী ব্যয়ের অসামঞ্জস্য, কালোটাকার ব্যবহার এবং আচরণবিধি লঙ্ঘন নির্বাচনের সমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্ত বিদ্যমান আইন, তার সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় কিছু সুপারিশ আলোচনা করা জরুরি।
(১) নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে যা আছে
বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্ত মূল আইন ও বিধান পাওয়া যায় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), নির্বাচন কমিশনের জারি করা বিধিমালা এবং আচরণবিধিতে। এসব আইনে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যয়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব এবং নির্বাচন শেষে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রকৃত ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সীমার অতিরিক্ত ব্যয় করলে প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে বা ভবিষ্যতে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হতে পারে। কাগজে-কলমে এসব বিধান যথেষ্ট শক্ত মনে হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল।
(২) এগুলো মনিটর করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই
বিদ্যমান আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—নির্বাচনী ব্যয় মনিটর করার জন্য কার্যকর, স্বাধীন ও বাস্তবসম্মত কোনো কাঠামোর অভাব। নির্বাচন কমিশন মূলত প্রার্থীদের দাখিলকৃত হিসাবের ওপর নির্ভর করে, যা অনেক ক্ষেত্রেই বাস্তব ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নির্বাচনী প্রচারে পোস্টার, ব্যানার, মিছিল, যানবাহন, মিডিয়া প্রচার ও জনসভায় বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও তার সঠিক হিসাব কখনোই প্রতিফলিত হয় না।
মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণকারী কর্মকর্তা থাকলেও তাঁদের ক্ষমতা সীমিত এবং রাজনৈতিক চাপের কারণে অনেক সময় তাঁরা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেন না। ফলে নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
(৩) আচরণবিধি লঙ্ঘনে শক্তহাতে শাস্তি নিশ্চিত করা
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন বাংলাদেশের নির্বাচনে একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগে প্রচারণা, সরকারি সম্পদের ব্যবহার, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অতিরিক্ত ব্যয় ও কালোটাকার ব্যবহার—এসবের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি খুব কমই দেখা যায়।
যদি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে আইন তার কার্যকারিতা হারায়। জরিমানা, প্রার্থিতা স্থগিত, এমনকি গুরুতর অপরাধে নির্বাচন বাতিলের মতো ব্যবস্থা বাস্তব ও দৃশ্যমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
(৪) প্রতিটি আসনে বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন মনিটরিং টিম গঠন
নির্বাচনী ব্যয় ও আচরণবিধি মনিটরিংয়ের জন্য প্রতিটি সংসদীয় আসনে বা একাধিক আসন নিয়ে বিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ টিম গঠন করা সময়ের দাবি। এই টিমে একজন বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট, একজন নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি, একজন হিসাব নিরীক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
এই টিম মাঠপর্যায়ে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করবে, অভিযোগ গ্রহণ করবে এবং প্রাথমিকভাবে তাৎক্ষণিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখবে। প্রয়োজনে একটি টিম একাধিক নির্বাচনী এলাকায় কাজ করতে পারবে, তবে তাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
(৫) অন্যান্য সুপারিশ
নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণকে কার্যকর করতে আরও কিছু বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরিঃ
ক. নির্বাচনী ব্যয়ের ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করা, যাতে প্রতিটি ব্যয় রিয়েল-টাইমে নথিভুক্ত হয়।
খ. নির্বাচনী ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাব বাধ্যতামূলক করা এবং নগদ লেনদেন কঠোরভাবে সীমিত করা।
গ. গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে মনিটরিং প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা।
ঘ. নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করা, যাতে তারা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে আইন প্রয়োগ করতে পারে।
উপসংহার
নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কোনো গৌণ বিষয় নয়; এটি সুষ্ঠু নির্বাচনের মূল ভিত্তি। আইন থাকলেই যথেষ্ট নয়—তার কার্যকর প্রয়োগ, কঠোর নজরদারি এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই হলো আসল চ্যালেঞ্জ। উপরের সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশে নির্বাচনী প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও জনগণের আস্থাভাজন হয়ে উঠবে—যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য অপরিহার্য।

