জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
বদলে গেছে পঞ্চগড়-১ আসনে ভোটের সমীকরণ ও হিসাব নিকাশ। এ আসনে এতদিন মনে করা হচ্ছিল বিএনপি ও জামায়াত মনোনীত প্রার্থীর মধ্যে মূল ভোটযুদ্ধ হবে। কিন্তু জামায়াত জোটের প্রার্থী পরিবর্তন হওয়ায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরের জয় একরকম নিশ্চিত হয়ে গেছে বলে সর্বস্তরের মানুষ মনে করছে। এবারের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা ইকবাল হোসাইন দীর্ঘদিন ধরে মাঠ সাজানোর কাজে ব্যস্ত ও তৎপর ছিলেন। দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি দলের নেতাকর্মীদের তৃণমূল পর্যায়ে দলকে শক্তিশালী করতে সক্রিয় ছিলেন। ভোটযুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত ও দলমত র্নির্বিশেষে সকল স্তরের ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কৌশলী কার্যক্রম চালিয়ে যান। এতে তিনি অনেকখানি সফলও হন। আওয়ামী লীগ সমর্থিত মুসলমান-হিন্দু ভোটাররাও তাকে ভোট দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছিল। ইকবালের প্রার্থিতার কারণে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরের জয়লাভ অতো সহজ হবেনা। তাকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি হতে হবে বলে অনেকে মনে করেছিল। কিন্তু ইকবাল হোসাইনকে বাদ দিয়ে এনসিপি’র সারজিস আলমকে মনোনয়ন দেয়ার জন্য পাল্টে যায় প্রেক্ষাপট। সারজিসকে ১১ দলীয় জোটের মনোনয়ন দেয়াকে ভালোভাবে নেয়নি জামায়াত ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা। অসন্তুষ্ট ও ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ার পাশাপাশি ভোটাররা নীরব ভূমিকাই অবতীর্ণ হয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। অনেকে ব্যক্তি ইকবাল ও দাঁড়িপাল্লা প্রতীক না থাকায় ভোট দিবে না বলে জানা গেছে। এ আসনটিতে বিএনপির ভোট বেশি বলে মনে করা হলেও গ্রুপিং-এর কারণে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে জেলা ও পৌর বিএনপি’র সম্মেলন হয়নি। এতে গ্রুপভিত্তিক নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক দূরত্বের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বেশকিছু নেতাকর্মীর কর্মকাণ্ডের জন্য নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কোনো কোনো নেতাকর্মী দাবি করেছে গ্রুপিং ও দ্বন্দ্ব থাকলেও সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী বিএনপিপ্রার্থী ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরের পক্ষে কাজ করবে। বর্তমানে গ্রুপিং ও দূরত্ব নিরসনের জন্য চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে বিএনপির একটি গ্রুপের নেতা সাবেক মেয়র তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের সঙ্গে নওশাদ জমিরের বসার কথা রয়েছে। বাংলাদেশ জাসদ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক প্রধান শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার জন্য চালিয়ে যাচ্ছেন কৌশলী কার্যক্রম। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধানও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিলেন। তার বাবা জাগপা প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত শফিউল আলম প্রধানের জনপ্রিয়তায় এ আসনে এখনো একটি ভোট ব্যাংক রয়েছে। রাশেদ প্রধানও ১১ দলীয় জামায়াত জোটের মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। কিন্তু হলফনামা না দেয়ার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বাতিল করেন। অবশ্য তিনি নির্বাচন কমিশনে আপিল করে মনোনয়ন ফিরে পান। কিন্তু জোটের মনোনয়ন না পাবার কারণে তিনি নির্বাচন করবেন না বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা জাগপার সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার বিপ্লব। এদিকে, এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হলেও অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারণা চলছে। প্রার্থী ও তাদের কর্মীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার পাশাপাশি মাঠে ঘাটে ও হাটবাজারে ভোটারদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করছেন। করছেন লিফলেট বিতরণ। প্রার্থীরা আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির ভোট টানার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত এ দু’টি দলের ভোটাররা ভোট দিতে যাবে কিনা এবং দিলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কতোসংখ্যক কাকে ভোট দেবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছে না। পঞ্চগড় সদর উপজেলার ধাক্কামারা ইউনিয়নের কমলাপুর এলাকার কামরুল ইসলাম কামু বলেন, ইকবালকে বাদ দিয়ে জামায়াত জোটের মনোনয়ন সারজিসকে দেয়ার কারণে আমাদের এলাকার নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। প্রার্থী ও প্রতীকের জন্য অনেকেই ভোট দিতে যাবেনা। সাধারণ ভোটাররাও চুপচাপ হয়ে গেছে। মালাদাম এলাকার আমিনার রহমান বলেন, প্রার্থী পরিবর্তনে অসন্তোষ দেখা দিলেও শেষমেশ নেতাকর্মী ও ভোটাররা ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী সারজিসকেই ভোট দিবে। পঞ্চগড় বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী রাজু আহমেদ বলেন, আমি জামায়াত করিনা। তবে ব্যক্তি ইমেজের কারণে ইকবাল প্রার্থী হলে তাকে ভোট দিতাম। তেঁতুলিয়ার এক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সফিকুল ইসলাম বলেন, সবাই মনে করেছিল নওশাদ জমির ও ইকবালের মধ্যে মূল ভোটের লড়াই হবে। কিন্তু এখন সেটি আর হবেনা। পঞ্চগড় পৌর এলাকার জামায়াত নেতা মোঃ হাসান আলী বলেন, সারজিসকে জেতানোর জন্য জেলা জামায়াতের আমীর ইকবাল হোসাইনসহ সকল পর্যায়ের নেতাকর্মী নির্বাচনী প্রচারণা, সভা-সমাবেশে ও গণসংযোগে তার পাশে থাকবেন। সুজনের পঞ্চগড় জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম ভূট্টো বলেন, বিএনপি’র বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে আসার জন্য নতুন ও ভাসা ভোটাররা বিএনপি’র দিকে ঝোঁকার সম্ভাবনা রয়েছে। ৫ই আগস্টে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে। ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সের ভোটার তিনবার ভোট দিতে না পারার কারণে নতুন ভোটার সময় উপযোগী প্রার্থীর দিকে ধাবিত হতে পারে। গণভোট বিড়ম্বনায় ফেলে দিচ্ছে ভোটারদের। এ ছাড়া প্রোপাগান্ডা, গুজব, ভোট তর্কের জন্য ভোট প্রদানে নিরুৎসাহী হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

