আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সংগৃহীত ছবি
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য আসামে দুই মাসের মধ্যে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের ঠিক আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রকাশ্যে দলের কর্মী ও সমর্থকদের আহ্বান জানিয়েছেন, বাংলাভাষী মুসলমানদের—যাদের তিনি ‘মিঁয়া’ হিসেবে উল্লেখ করেন—সর্বাধিক হয়রানির মধ্যে রাখা হোক।
২০১৬ সালে আসামে ক্ষমতায় আসার পর থেকে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং তার দল বিজেপি এই জনগোষ্ঠীকে ঘিরে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করে আসছে। ২০২১ সালে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর এই বয়ান আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এবার নির্বাচনের প্রাক্কালে তিনি সরাসরি কোনও রাখঢাক না রেখে এই জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছেন।
গত মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ডিব্রুগড়ের একটি সরকারি অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী প্রথমবার প্রকাশ্যে স্বীকার করেন, রাজ্যে বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ সংশোধন (স্পেশাল রিভিশন বা এসআর) প্রক্রিয়া চলছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ মুসলিম নাগরিকের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে। তিনি জানান, এটি এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল।
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, “‘মিঁয়া মুসলমানদের’ বিরুদ্ধে অভিযোগ না করলে মনে হবে আসামে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর অস্তিত্ব নেই। তাই তাদের চাপের মধ্যে রাখা প্রয়োজন, না হলে তারা জমি, সম্পত্তি ও রাজনৈতিক অধিকার দখল করবে। এটি আমাদের ‘অস্তিত্বের লড়াই’। এই অবস্থানের মাধ্যমে সরকারের লক্ষ্য হলো প্রতিরোধ প্রদর্শন করা।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা যদি মিঁয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের না করি, তাহলে মনে হবে অসমীয়ারা দুর্বল। দলের সদস্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যত বেশি সম্ভব অভিযোগ দায়ের করতে এবং তা শুধুমাত্র মিঁয়া মুসলমানদের বিরুদ্ধে। তাদের চাপে রাখা হবে। যদি তারা ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে কাজের সুযোগ দখল করে, তবে আমরা তা প্রতিরোধ করব।”
হিমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রকাশ্যে জানিয়েছেন কীভাবে এই ‘চাপ’ সৃষ্টি করা হবে। তিনি বলেন, “গুয়াহাটিতে অনেক মুসলিম অটোচালক রয়েছে। অটোতে উঠার পর অতিরিক্ত ভাড়া চাইলে কম দিতে হবে। প্রয়োজনে তাদের শারীরিকভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কন্ট্রাক্টারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, মিঁয়া মুসলমানদের কাজের সুযোগ থেকে সরিয়ে স্থানীয় অসমীয়াদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ভোটার তালিকা থেকে শুরু করে সকল জায়গায় সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ করতে হবে। অসমীয়াদের জন্য এটি দায়িত্ব।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পর রাজ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে অনেকে প্রকাশ্যে কথা বলছেন না। কিছু কেউ জানিয়েছেন, আসামে এক সময় প্রতিবাদের পরিবেশ ছিল, কিন্তু এখন সরকার বা মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কথা বলা নিরাপদ নয়।
গুয়াহাটির হাইকোর্টের আইনজীবী হাফিজ রশিদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, “মুখ্যমন্ত্রী যে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়েছেন, তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া দ্রুত দেখা দিতে পারে। যদি দলের লোকেরা এই নির্দেশ পালন করে, তা সংবিধান ও নাগরিক অধিকার লঙ্ঘন করবে। আমরা আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছি। এটি সংবিধান-বিরোধী।”
তিনি আরও বলেন, মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন হিন্দুরাও এই বক্তব্যের বিরোধিতা করছেন।
এদিকে আসামের বিরোধী দলনেতা দেবব্রত শইকিয়া সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে চিঠি পাঠিয়ে অভিযোগ করেছেন, ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে এবং তা সংবিধানসম্মত ভোটাধিকার ক্ষুণ্ণ করছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে মিঁয়া জনগোষ্ঠীর উপর ইচ্ছাকৃতভাবে নোটিস জারি করা হচ্ছে তাদের চাপে রাখতে ও ভোগান্তিতে ফেলতে। দেবব্রত শইকিয়ার মতে, এটি ভয় দেখানো, হয়রানি এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভোটাধিকার হরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
কংগ্রেস নেতা ও প্রাক্তন বিজেপি সদস্য আমিনুল হক লস্কর বলেছেন, “মুখ্যমন্ত্রীর এই আচরণ সংবিধানের লঙ্ঘন। তিনি নির্বাচন কমিশনের কাজের ওপর হস্তক্ষেপ করছেন, যা আইনসিদ্ধ নয়। এটা শুধু রাজনৈতিক নয়, দেশের সংবিধান ও ভোটাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন।” তিনি মনে করেন, হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই বক্তব্যের পেছনে রাজনৈতিক ভয় কাজ করছে।
গত দু’বছর ধরে আসামের বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদ অভিযান চলছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী ‘মিঁয়া’ শব্দটি ব্যবহার করছেন, যা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি মুসলমানদের বোঝাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির স্লোগান ‘সরাইঘাটের যুদ্ধ’ এবং লাচিত বরফুকনের সঙ্গে মুঘলদের যুদ্ধকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়া হয়েছিল। এবার মুখ্যমন্ত্রী আরও একধাপ এগিয়ে ঘোষণা করেছেন, ২০২৬ সালের নির্বাচন হবে ‘আদি বাসিন্দা বনাম অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদিও শব্দ বদলানো হয়েছে, রাজনৈতিক বার্তার অর্থ প্রায় অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে।
সূত্র: ডয়চে ভেলে

