• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

বাংলাদেশে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সুবিধা: রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উপর অযৌক্তিক

প্রকাশ: বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৬:২২
আপডেট: বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৬:২২

বাংলাদেশে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সুবিধা: রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উপর অযৌক্তিক

ব‍্যারিস্টার রফিক আহমেদ, লন্ডন ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠনের পথে । নবনির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন, তা হলো, আমাদের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা (এমপি) কত টাকা বেতন পান? তাঁদের পেছনে রাষ্ট্র কত খরচ করে?

শুধু বেতন নয়, বরং বেতনের বাইরে থাকা অগণিত সুযোগ-সুবিধা, ভাতা এবং সরকারি ব্যয়ের একটি দীর্ঘ তালিকা আছে, যা প্রায়ই জনমনে অজানা থেকে যায়।

মন্ত্রী ও এমপিদের বেতন: প্রত্যক্ষ সুবিধা

সরকারি কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ বেতনপ্রাপ্ত ব্যক্তি। রাষ্ট্রপতি মাসিক ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং প্রধানমন্ত্রী মাসিক ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা বেতন পান । মন্ত্রীদের মাসিক বেতন ১ লাখ ৫ হাজার টাকা, প্রতিমন্ত্রীদের ৯২ হাজার টাকা এবং উপমন্ত্রীদের ৮৬ হাজার ৫০০ টাকা । অন্যদিকে, সাধারণ সংসদ সদস্যদের মাসিক মূল বেতন ৫৫ হাজার টাকা । (দৈনিক ইত্তেফাক ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, যুগান্তর ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, প্রথম আলো ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

এই বেতন প্রথম দৃষ্টিতে হয়তো অনেকের কাছে অত্যধিক মনে নাও হতে পারে, কিন্তু প্রকৃত চিত্র হলো, বেতন এই সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে একটি গৌণ অংশ মাত্র। আইন অনুযায়ী, এই বেতন-ভাতার ওপর তাদের কোনো আয়কর দিতে হয় না, যা সাধারণ নাগরিকদের জন্য একটি অকল্পনীয় বিশেষ সুবিধা। বিবিসি নিউজ বাংলা ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, দ‍্যা ডেইলি স্টার বাংলা ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, যুগান্তর ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)

বেতনের বাইরেও অগণিত সুবিধা: অপ্রকাশিত কোষাগার

একজন মন্ত্রী বা এমপির পেছনে সরকারের প্রকৃত খরচ শুরু হয় বেতনের পরে। বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিপুল পরিমাণ ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের উপর মূল বোঝা। নিচের ছকটি একজন সংসদ সদস্যের মাসিক নগদ আয়ের একটি চিত্র তুলে ধরেছে:

সুবিধার খাত মাসিক পরিমাণ (টাকায়)
মূল বেতন ৫৫,০০০
নির্বাচনী এলাকা ভাতা ১২,৫০০
পরিবহন ভাতা ৭০,০০০
অফিস ব্যয় ভাতা ১৫,০০০
আপ্যায়ন ভাতা ৫,০০০
টেলিফোন ভাতা ৭,৮০০
লন্ড্রি ভাতা ১,৫০০
ক্রোকারিজ ও টয়লেট্রিজ ভাতা ৬,০০০
চিকিৎসা ভাতা ৭০০
মাসিক মোট নগদ আয় (প্রায়) ১,৭৩,৫০০

উপরোক্ত ছকটি কেবলমাত্র নগদ ভাতার হিসাব। এছাড়াও রয়েছে আরও বিপুল পরিমাণ অ-আর্থিক সুবিধা ।

শুধু মাসিক নগদ ভাতাই নয়, এর বাইরেও বিপুল পরিমাণ অর্থ সরকারকে গুনতে হয়। যেমন:

বাসস্থান: মন্ত্রীরা বিনা ভাড়ায় সরকারি বাসভবন পান, যার গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিফোন বিল সরকার বহন করে। সরকারি বাসায় না থাকলে ভাড়া বাবদ মন্ত্রী পান ৮০ হাজার টাকা, আর প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পান ৭০ হাজার টাকা ।

বাড়ি সাজানো: সরকারি বাসা সাজাতে মন্ত্রী পান বছরে ৫ লাখ টাকা, আর প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী পান ৪ লাখ টাকা ।

গাড়ি ও যাতায়াত: মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা সরকারি খরচে গাড়ি ও জ্বালানি সুবিধা পান । এমপিরা পান শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা, যা কয়েক লাখ টাকা সাশ্রয় করে ।

স্বেচ্ছাধীন তহবিল: দাতব্য কাজের জন্য একজন মন্ত্রী পান বছরে ১০ লাখ টাকা, প্রতিমন্ত্রী পান সাড়ে ৭ লাখ এবং এমপিরা পান ৫ লাখ টাকা । এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর জন্য এই তহবিলের পরিমাণ ১.৫ কোটি টাকা ।

জনবল: মন্ত্রীরা উপসচিব পদমর্যাদার একান্ত সচিবসহ বিপুল সংখ্যক কর্মচারী সুবিধা পান, যাদের বেতন-ভাতার পুরো ভার সরকারকেই বহন করতে হয়।

সমালোচনার দিক: বৈষম্য ও জবাবদিহির অভাব

এই বিপুল সুবিধা পাওয়ার পরও প্রশ্ন থেকে যায়—এর কি কোনো যৌক্তিকতা আছে? প্রথমত, যখন দেশের সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে, তখন একজন সংসদ সদস্যের মাসিক প্রায় ১.৭৩ লাখ টাকা নগদ আয় এবং তার ওপর আরও অগণিত অপ্রত্যক্ষ সুবিধা নৈতিকভাবে কতটুকু সমর্থনযোগ্য? ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় নেই, তাই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এই ব্যয় কমানো জরুরি ।

দ্বিতীয়ত, থোক বরাদ্দের টাকা থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের প্রকল্প বরাদ্দে সংসদ সদস্যদের প্রায় একচ্ছত্র আধিপত্য জবাবদিহির সংস্কৃতিকে বাধাগ্রস্ত করে । এই অর্থ কোথায়, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার কোনো স্বচ্ছ হিসাব সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ নেই।

তৃতীয়ত, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের মন্ত্রীরা সাইকেল চালিয়ে অফিসে যান, অথচ বাংলাদেশের মন্ত্রী ও এমপিদের জন্য বিলাসবহল গাড়ি, বিপুল সংখ্যক গৃহকর্মী এবং সরকারি বাসস্থানকে

প্রয়োজনীয়’ সুবিধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা একটি ‘শাসক শ্রেণী’র জন্ম দিয়েছে। ফেসবুকের এক সাধারণ মন্তব্যে যেমন উঠে এসেছে, “এত সুযোগ-সুবিধার পরেও দুর্নীতি করে, বিদেশে টাকা পাচার করে এদেশের এমপিরা!” —এই ক্ষোভ সাধারণ মানুষের মনে গভীরে প্রোথিত।

উপসংহার

বাংলাদেশের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার বর্তমান কাঠামো অত্যন্ত অসম ও অস্বচ্ছ। এটি যেমন রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়, তেমনি প্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যে এক বিস্তৃত ব্যবধান সৃষ্টি করে। নতুন সরকার গঠনের এই সময়ে প্রয়োজন এই কাঠামোর একটি আমূল সংস্কার। একটি স্বাধীন বেতন-ভাতা কমিশন গঠন করে বাস্তবসম্মত বেতন নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় ভাতা বাতিল এবং সব ধরনের সুবিধাকে করের আওতায় আনা জরুরি। যতক্ষণ না পর্যন্ত জনগণের টাকায় পরিচালিত এই সুবিধাগুলোর উপর জনগণের প্রশ্ন তোলার ও জানার অধিকার নিশ্চিত না হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত গণতন্ত্র ও সুশাসনের প্রত্যাশা করা দুরাশা মাত্র।


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com