• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

জাতীয়

পরিবহণ খাতে প্রতিদিন শতকোটি টাকার চাঁদা আদায়ের অভিযোগ

প্রকাশ: রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৭:৩১
আপডেট: রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ৭:৩১

পরিবহণ খাতে প্রতিদিন শতকোটি টাকার চাঁদা আদায়ের অভিযোগ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
সংগৃহীত ছবি

রাজধানীসহ সারা দেশে প্রায় তিন হাজার স্পট থেকে প্রতিদিন প্রায় শতকোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই চাঁদাবাজির সঙ্গে সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতি, শ্রমিক সংগঠন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা জড়িত বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।

সারা দেশ থেকে প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এসব অর্থের বড় অংশ ভয়ভীতি দেখিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আদায় করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সড়ক পরিবহণ, সেতু, রেল ও নৌপরিবহণমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম শনিবার বলেন, “চাঁদাবাজি নেই আমি তা বলিনি। চাঁদা স্বেচ্ছায় দেওয়া হয়, আর চাঁদাবাজি জোরপূর্বক আদায় করা হয়। আমি চাঁদাবাজিকে সমর্থন করি না।”

তিনি আরও বলেন, চাঁদাবাজি একটি ফৌজদারি অপরাধ এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। প্রয়োজনে স্বরাষ্ট্র, সমবায় এবং তার মন্ত্রণালয় যৌথভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করতে পারে।

এর আগে এক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মালিক ও শ্রমিক সমিতি কল্যাণমূলক কাজে যে অর্থ নেয়, সেটি অলিখিত বিধির মতো।

কীভাবে আদায় হয়

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কোথাও টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার নামে, কোথাও পার্কিংয়ের নামে, আবার কোথাও পৌর টোলের সঙ্গে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য এবং থানা পুলিশের একটি অংশ এসব চক্রের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিরুপায় হয়ে পরিবহণ চালক ও মালিকরা বছরের পর বছর এসব অর্থ পরিশোধ করে আসছেন।

প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর

পরিবহণ খাতে চাঁদাবাজির কারণে ভাড়া বৃদ্ধি পায় এবং সবজি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এর চাপ পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। এতে মধ্যবিত্তের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক ও মালিকদের কল্যাণের নামে চাঁদা আদায় করা হলেও বাস্তবে এর ৯০ শতাংশই জোরপূর্বক আদায় করা হয়। টাকা না দিলে গাড়ি ভাঙচুর বা মারধরের ঘটনাও ঘটে। মাঠপর্যায়ে আদায়কৃত বিপুল অর্থ কোথায় যায় বা কারা ভাগ পায় সে বিষয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না।

প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মালিক-শ্রমিকদের অনেকে জানিয়েছেন, এই চাঁদার টাকার ওপর ভর করে স্বাধীনতার পর এক শ্রেণির নেতা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন। কেউ কেউ এমপি-মন্ত্রীও হয়েছেন। সরকার পরিবর্তন হলেও বিভিন্ন দলের প্রভাবশালী নেতারা আপসের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু রাখেন।

বিপরীতে সাধারণ শ্রমিকরা ন্যায্য বেতন-ভাতা পান না। তাদের কঠোর পরিশ্রমের বিপরীতে অনেক নেতা বিলাসী জীবনযাপন করেন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও প্রভাবশালীরা বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

যাত্রীকল্যাণ সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে

দেশে প্রায় ৮ হাজার সিটি বাস থেকে দৈনিক প্রায় ৬৪ লাখ টাকা, ৬০ হাজারের বেশি দূরপাল্লার বাস থেকে প্রায় ৩ কোটি টাকা, ঢাকার ১৮ হাজার সিএনজি অটোরিকশা থেকে প্রায় ২৭ লাখ টাকা, চট্টগ্রামের ১৫ হাজার সিএনজি থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা, ঢাকার প্রায় ১০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে প্রায় ১৫ কোটি টাকা, ঢাকার বাইরে ৫০ লাখ রিকশা থেকে প্রায় ৪০ কোটি টাকা, প্রায় ৪ লাখ ট্রাক থেকে দৈনিক প্রায় ৪০ কোটি টাকা, টেম্পো ও লেগুনা থেকে প্রায় ৬৪ লাখ টাকা, সব মিলিয়ে পরিবহণ খাত থেকে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি টাকা আদায় করা হয় বলে দাবি করা হচ্ছে।

যাত্রীকল্যাণ সমিতির মতামত

বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সড়কে চাঁদা ও চাঁদাবাজি দুটোই রয়েছে। মালিক ও শ্রমিক সংগঠন ছাড়াও পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীরাও এতে জড়িত।

তিনি জানান, সব পরিবহণে চাঁদাবাজি না হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিভিন্ন খাতে টাকা দিতে হয়। ডিজিটাল ভাড়া পরিশোধ ও ক্যামেরাভিত্তিক মামলা ব্যবস্থা চালু করলে এই সমস্যা কমবে বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও বলেন, সরকারকে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত সত্য প্রকাশ করতে হবে এবং প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নিতে হবে।

শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের বক্তব্য

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আব্দুর রহিম বক্স দুদু বলেন, ফেডারেশনের নামে সরাসরি চাঁদা তোলা বন্ধ হলেও নানা নামে অর্থ আদায় বন্ধ হয়নি।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম বলেন, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার জন্য সমঝোতার ভিত্তিতে কিছু অর্থ নেওয়া হয়, যা মালিকরা স্বেচ্ছায় দেন। তবে সড়কে পণ্যবাহী ট্রাক থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশের অবস্থান

বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (হাইওয়ে) মো. দেলোয়ার হোসেন মিঞা জানান, মহাসড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে মহাসড়কে তেমন চাঁদাবাজি নেই, তবে টার্মিনালকেন্দ্রিক কিছু অভিযোগ শোনা যায়।

জনমনে প্রতিক্রিয়া

মন্ত্রীর বক্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ দেশজুড়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। পরিবহণ খাতে চাঁদা ও চাঁদাবাজির বাস্তব চিত্র উদঘাটনে কার্যকর উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।