জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
মন্ত্রী-এমপিদের এলাকায় জমে উঠেছে ঈদ-রাজনীতি। দীর্ঘ ১৮ বছর পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। তাই এবার সম্পূর্ণ ভারমুক্ত পরিবেশে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করবেন দলের সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি নেতারাও। তাদের কাছে এবারের ঈদ কেবল উৎসব নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছাকাছি যাওয়ার আরেকটি বড় উপলক্ষও। এ জন্য অধিকাংশ নেতাই ছুটে গেছেন নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায়। অবশ্য কেউ কেউ ঢাকায় ঈদ করবেন। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে পাঠানো উপহারসামগ্রী বিতরণ এবং গণসংযোগের মাধ্যমে এলাকার পাড়া-মহল্লায় এখন পুরোদমে চলছে ‘ঈদ-রাজনীতি’।
বিএনপির ২০৯ জন ও জোট শরিকদের ৩ জন এবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। এদের মধ্যে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য হয়েছেন ১৪৩ জন। নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন ৪১ জন। এসব নির্বাচনি এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও ঈদ সামনে রেখে নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, জনসংযোগ এবং সামাজিক কার্যক্রমে ব্যস্ত সময় পার করছেন। নিজ নিজ নির্বাচনি এলাকায় গিয়ে তারা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন এবং ঈদ উপহার বিতরণসহ বিভিন্ন সহায়তামূলক কর্মসূচি চালাচ্ছেন।
একই সঙ্গে বিগত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্যাতিত নেতা-কর্মী এবং গুম-খুনের শিকার নেতা-কর্মীদের পরিবারের পাশেও দাঁড়াচ্ছেন তারা। এদিকে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা নেতা-কর্মীদের বিশৃঙ্খলা এড়াতে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে বিএনপির হাইকমান্ড।
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৮ বছর পর দেশের মাটিতে ঈদ উদযাপন করবেন। ঈদের দিন সকালে জাতীয় ঈদগাহে নামাজ আদায় শেষে তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যাবেন। সেখানে কূটনীতিক, শিক্ষাবিদসহ সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। পরে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট নাগরিক, আলেম-ওলামা, শিল্পী-সাহিত্যিক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন তিনি। দিন শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে শেরেবাংলা নগরে বাবা প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করবেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, জাতীয় ঈদগাহে নামাজ আদায়ের পর সকাল ১০টায় যমুনায় শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান শুরু হবে।
জানা গেছে, বিএনপির বেশির ভাগ মন্ত্রী ও সিনিয়র নেতা এবার ঢাকার জাতীয় ঈদগাহে নামাজ আদায় করবেন। এরপর তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যমুনায় গিয়ে ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এর মধ্যে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রামে ঈদ করবেন।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন। ঈদের সময় তিনি সেখানেই থাকবেন। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়েছে। গতকাল বুধবার মির্জা আব্বাস তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, দলের অধিকাংশ সিনিয়র নেতা ঢাকায় ঈদ করবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঈদের নামাজ ও শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে তারা নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে জনগণের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন।
দলীয় সূত্র জানায়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ত্রাণভান্ডার থেকে প্রতিটি নির্বাচনি এলাকায় শাড়ি, থ্রি-পিস ও হাজি রুমাল দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রী-এমপি এবং নেতারা ঈদ উপলক্ষে গরিব ও দুস্থ মানুষের মধ্যে জাকাত ও ফিতরা, খাদ্যসামগ্রী, পোশাক ও নগদ অর্থ বিতরণ করছেন। পাশাপাশি রাস্তা সংস্কার, মসজিদে অনুদান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে মতবিনিময় সভাও করছেন তারা। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে ঈদকার্ড ও এসএমএস পাঠিয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়া, ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমে গণসংযোগ করছেন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিভিন্ন প্রার্থী ও তাদের সমর্থনকারী নেতারা।
এদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে ঈদের এই জনসংযোগকে কৌশল হিসেবে দেখছে দলটি। বিশেষ করে যেসব আসনে অভ্যন্তরীণ কোন্দল রয়েছে, সেখানে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে নেতারা সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। জামায়াতের কাছে পরাজিত ৭৮টি আসনেও দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে ঈদ-রাজনীতির জনসংযোগকে কাজে লাগাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও শুভেচ্ছা বিনিময়ের মাধ্যমে এলাকায় ব্যাপক প্রচার ও গণসংযোগ চালাচ্ছেন।
বিএনপির একাধিক সংসদ সদস্য ও নেতা বলেন, ঈদের আগে রমজান মাসজুড়েই তারা মানুষের পাশে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে ইফতার পার্টি না করে অসহায়, দুস্থ ও গরিব মানুষের মধ্যে ইফতার ও খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন। সেই সঙ্গে ঈদ উপহারসামগ্রীও বিতরণ করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী প্রথম ঈদের দিনগুলোতেও মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন তারা।
স্থানীয়দের মতে, ঈদের আগে জনপ্রতিনিধিদের এমন সরব উপস্থিতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এতে একদিকে যেমন এলাকার সমস্যা সরাসরি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগির সুযোগও বাড়ছে।
ঈদ ঘিরে এই নিবিড় জনসংযোগ একদিকে যেমন সামাজিক সম্প্রীতি বাড়াচ্ছে, তেমনি চাঙা করে তুলছে তৃণমূলের রাজনীতিকেও। মোটাদাগে দলের সিংহভাগ নেতাই ঈদের সময় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। দলের সাতজন স্বতন্ত্র এমপিও একই লক্ষ্য নিয়ে এলাকামুখী হচ্ছেন।
নেতা-কর্মীদের নিয়ে মুক্ত পরিবেশে ঈদ উদযাপন করবেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ও সিরাজগঞ্জ-৬ আসনের এমপি ডা. এম এ মুহিত।
তিনি বলেন, ‘পরিবারের সদস্য, দলীয় নেতা-কর্মী ও নিজ সংসদীয় আসনের সাধারণ মানুষের সঙ্গে ১৮ বছর পর মুক্ত পরিবেশে ঈদ করব।’
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ঈদের নামাজ আদায় করবেন বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি এবার প্রথম সংসদ সদস্য হয়েছেন।
খবরের কাগজকে সেলিম বলেন, বিএনপি দীর্ঘ ১৮ বছর পর জনগণের ভোটে সরকার গঠন করেছে। রাষ্ট্র পরিচালনার পবিত্র দায়িত্ব দিয়েছে জনগণ। চাপমুক্ত পরিবেশে নেতা-কর্মীরা মানুষের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করবেন। তবে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।
জামায়াতে ইসলামী
সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় নেতারাও তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এলাকায় যাচ্ছেন। বিশেষ করে নির্বাচনে যারা পরাজিত হয়েছেন, তাদের সমর্থক ও অনুসারীদের হতাশা কাটিয়ে চাঙা করতেই এলাকায় গেছেন অনেকে।
ঢাকার মিরপুরে মনিপুর গার্লস হাইস্কুল মাঠে সকাল ৮টায় ঈদের নামাজ আদায় করবেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এরপর তিনি সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। পরদিন সিলেট মহানগর ও জেলা জামায়াত আয়োজিত পৃথক স্থানে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করবেন। ঈদের তৃতীয় দিন তিনি মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন।
এমন পরিস্থিতিতে জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতির স্থবিরতা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে। বিএনপি ও জামায়াতের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের কেন্দ্রীয় নেতারা এলাকামুখী হওয়ায় সারা দেশে চাঙা হয়ে উঠেছে ঈদ-রাজনীতি।

