জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
বাংলাদেশকে ‘জাতি রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখার ধারণার সমালোচনা করে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ এফ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন স্বতন্ত্র জাতিসত্তার মানুষের বসবাস রয়েছে। তাদের সবাইকে জোর করে বাঙালি পরিচয়ে অভিহিত করার চেষ্টা করা হলে পাকিস্তান রাষ্ট্র যে ভুল করেছিল, সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হবে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত ‘তাজউদ্দীন আহমদ স্মারক বক্তৃতা-২০২৬’-এ স্মারক বক্তার বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশ কোনো জাতি রাষ্ট্র নয়। এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করে। তাদের নিজস্ব ভাষা ও জাতিসত্তা রয়েছে। আমরা যদি তাদের জোর করে বাঙালি হতে বলি, তাহলে পাকিস্তান আমাদের ওপর যে সাংস্কৃতিক আধিপত্য চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, আমরাও একই কাজ করব।’
তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘‘এখন থেকে আমরা কেউ বাঙালি, সিন্ধি বা পাঞ্জাবি নই; আমরা সবাই পাকিস্তানি।’’ সেই চিন্তার ধারাবাহিকতায় উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করে একটি একক পাকিস্তানি জাতি গড়ে তোলার চেষ্টা হয়েছিল।’
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধানে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’কে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার মধ্যেও একই ধরনের সংকীর্ণতার ঝুঁকি তৈরি হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, স্বাধীনতার পর দেশের রাজনৈতিক গতিপথ কোন দিকে যেতে পারে, তা নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ গভীরভাবে চিন্তা করেছিলেন। তিনি বাকশাল, ত্রিদলীয় ঐক্যজোট এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আগেভাগেই নানা আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আরও বলেন, তাজউদ্দীন আহমদ সমাজতান্ত্রিক ধারার একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন। তবে সে ধরনের রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় সংগঠন ও নেতৃত্বের ঘাটতিও তিনি অনুভব করেছিলেন। তিনি বলেন, তাজউদ্দীন আহমদ আমাদের জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। তার অবদানকে স্মরণ করে আমরা গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তাজউদ্দীন আহমদের কন্যা শারমিন আহমদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ আমাদের মা এবং বাংলাদেশ তার সন্তান। ১৯৭১ সালের সংকটময় সময়ে তাজউদ্দীন আহমদ জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, একাত্তরের প্রজন্ম যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে রক্ত দিয়েছিল, তার পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো সম্ভব হয়নি। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে হবে এবং দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে হবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, স্বাধীনতার মূল চেতনা ও গণতন্ত্র যখন বাধাগ্রস্ত হয়, তখন এর পরিণতি কী হতে পারে সে বিষয়ে তাজউদ্দীন আহমদ আগেই সতর্ক করেছিলেন। তিনি বলেন, ১৯৭৫ এবং ২০২৪ সালে আমরা সেই সতর্কবার্তার প্রতিফলন দেখতে পেয়েছি। বাংলাদেশ নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদের যে স্বপ্ন ছিল, বর্তমান সরকার সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে আমরা মনে করি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. আবুল কালাম সরকার এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মো. মেহেদী হাসান খান।
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘তাজউদ্দীন আহমদ বৃত্তি’ও প্রদান করা হয়।

