• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

রাজনীতি

স্থানীয় সরকার নির্বাচন: জামায়াত প্রস্তুতিতে এগিয়ে, ধীরগতি বিএনপিতে

প্রকাশ: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬ ১০:০৩
আপডেট: শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬ ১০:০৩

স্থানীয় সরকার নির্বাচন: জামায়াত প্রস্তুতিতে এগিয়ে, ধীরগতি বিএনপিতে

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশে সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়াতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে তপশিল ঘোষণার আগেই ভোটের মাঠের প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মাঠের প্রস্তুতির ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বছরের শেষ দিকে এই নির্বাচন হতে পারে ধরে নিয়ে সিটি করপোরেশন থেকে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত বেশিরভাগ স্থানেই এরই মধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করে ভোটের প্রস্তুতিতে অনেকটাই এগিয়ে গেছে জামায়াতে ইসলামী। অন্যদিকে, প্রার্থী বাছাইয়ের অভ্যন্তরীণ জটিলতা এবং নীতিনির্ধারকদের ভোটের কৌশল নির্ধারণে ধীরগতির কারণে প্রস্তুতিতে পিছিয়ে রয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি।

অবশ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, আগাম প্রস্তুতিতে জরুরি হলেও সামগ্রিকভাবে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় ইস্যু, ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচন পরিচালনার সামগ্রিক পরিবেশ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তাদের জোট শরিকদের তৃণমূল পর্যায়ের পরিচ্ছন্ন ইমেজের নেতাদেরও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রয়েছে, যা ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মাঠপর্যায়ের বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর একাধিক নেতাকর্মীর সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, প্রার্থী বাছাই, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে জামায়াত তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয় রয়েছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি)—স্থানীয় নির্বাচনের এই চার স্তরের বেশিরভাগ পর্যায়েই একক প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে দলটি। প্রার্থীরাও গণসংযোগ করছেন। সেই তুলনায় বিএনপির প্রার্থী চূড়ান্তকরণ ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি একই গতিতে এগোয়নি। প্রতিটি এলাকায় একাধিক প্রার্থী গণসংযোগে নেমেছেন। অনেক জায়গায় তৃণমূলের অসন্তোষ মেটাতেই ব্যস্ত সময় পার করতে হচ্ছে দলটির নীতিনির্ধারকদের। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে অনেকেই ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তৎপর হওয়া দলটি জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।


বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপির তুলনায় জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা অনেক কম। বিএনপির মতো এত বেশি প্রার্থী নেই। তাই তারা আগেভাগেই প্রার্থী ঘোষণা ও নির্বাচনি প্রস্তুতি নিতে পারছে।’


তিনি আরও বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের সময়ও তারা (জামায়াত) নির্বাচনের অনেক আগেই প্রার্থী ঘোষণা করেছিল। জামায়াত আগে প্রার্থী ঘোষণা করতে পারে, কারণ তাদের প্রার্থীর সংখ্যা কম। অনেক এলাকায় তাদের একজন করে সম্ভাব্য প্রার্থী থাকায় কেন্দ্র থেকে গণসংযোগের চালানোর নির্দেশনা দেওয়া সহজ হয়েছে। তবে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা বেশি, তাই আগে ঘোষণা দেওয়া সহজ নয়। প্রার্থী বেশি থাকলেও বাছাইয়ে কোনো অসুবিধা হবে না।’

বিএনপির সূত্র জানায়, সবশেষ অনুষ্ঠিত দলটির স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূলকে কার্যক্রম জোরদার করতে বলা হয়েছে। খুব শিগগির দলের সাংগঠনিক টিমের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রার্থীদের জীবন-বৃত্তান্ত সংগ্রহ করবে হাইকমান্ড। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের মধ্যে এই কাজ শেষ হতে পারে। পৌরসভা বা উপজেলায় মিত্রদের সমর্থন দেওয়া হবে কি না তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে।

এরই অংশ হিসেবে দুই দফায় গত ১৮ ও ২৫ জুলাই বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান রংপুর বিভাগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি জনপ্রিয়তাকেই প্রধান মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনায় রেখে প্রার্থী বাছাইয়ে নির্দেশনা দেন। ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বাছাইয়ে থানা-উপজেলা এবং পৌর ও উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী বাছাইয়ে জেলার নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোনো সমস্যা হলে প্রথমে জেলা, পরে বিভাগীয় পর্যায়ের নেতারা সমাধানের চেষ্টা করবেন। নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পরপরই দলীয় প্রার্থীদের সমর্থন দেবে হাইকমান্ড।

বিএনপির জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতার সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতা ও পদের লোভ নিয়ে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ে কোন্দল ও গ্রুপিং তীব্র রূপ নিয়েছে। দলীয় প্রতীক না থাকায় অনেক জায়গাই প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়াতে চাইবেন। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী, এসব ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ঠেকানোই এখন তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। স্থানীয় নির্বাচনে দলের সম্ভাব্য প্রার্থী নির্ধারণ ও নির্বাচনি প্রস্তুতির বিষয়ে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। তাদের মতে, নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর প্রস্তুতির গতি আরও বাড়বে। নির্বাচনি পরিস্থিতি বিবেচনায় দল প্রয়োজনীয় সময়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামবে।

বিএনপির ‘ধীরে চলো নীতি’র বিপরীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে জামায়াত। দলটি সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচন থেকে শুরু করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার নির্বাচনের জন্যও একক প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। দলীয় সূত্র বলছে, ১২টি সিটি করপোরেশন, ৩৩০টি পৌরসভা, ৪ হাজার ৫৮১টি উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে ৮০ শতাংশের বেশি প্রার্থী ইতোমধ্যে অনুমোদন দিয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটগত সমীকরণের কারণে মনোনয়ন না পাওয়া সিনিয়র ও যোগ্য নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেসব এলাকায় দলের নিজস্ব শক্তিশালী প্রার্থী নেই, সেখানে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমর্থন দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, তৃণমূল থেকে পাঠানো সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা কেন্দ্রীয়ভাবে অনুমোদন করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলীয় প্রতীক না থাকায় ‘উন্নয়ন ফোরাম’ ব্যানারে অনেক প্রার্থী ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছেন। তারা নিজস্ব ছবি-সংবলিত ব্যানার-পোস্টার টানানোর পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন এবং আগাম সমর্থন চাইছেন। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোও এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। দলীয় সূত্রের দাবি, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) জোটের বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীরা অনেক এলাকায় জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে একযোগে জনসংযোগ চালাচ্ছেন।

জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কালবেলাকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। জাতীয় নির্বাচনে জোট হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শরিকদের সঙ্গে জোট করা হবে না। জোট শরিকরা দলীয়ভাবেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে।’

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের কালবেলাকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দল জেলা, উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই করে মতবিনিময় সভা ও জনসংযোগের মাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। যেহেতু নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না, তাই কেন্দ্রীয়ভাবে সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে দল কাজ করবে। তিনি জানান, সারা দেশে অধিকাংশ এলাকার প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ প্রায় চূড়ান্ত।’

জামায়াতের একাধিক নেতা কালবেলাকে বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে একক প্রার্থী চূড়ান্তকরণের মূল লক্ষ্য হলো ভোটের মাঠে দলীয় ভোট যাতে ভাগ না হয়। ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক বৈঠক, সম্ভাব্য প্রার্থীদের মূল্যায়ন এবং ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভোটের মাঠে থাকতে পারে আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিকরা

নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের ক্লিন ইমেজের নেতা ও সাবেক মেয়র বা চেয়ারম্যান ভোটের মাঠে থাকতে পারে এমন আলোচনা রয়েছে। তাদের সঙ্গে জাতীয় পার্টিসহ (জাপা) শরিক দলের তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাই নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। ইসি সূত্রমতে, স্থানীয় নির্বাচন নির্দলীয় ও প্রতীকহীন হওয়ায় নির্দিষ্ট কোনো দলের নেতাকর্মীদের নির্বাচন থেকে বিরত রাখার আইনি সুযোগ কমিশনের নেই। তবে আওয়ামী লীগের নেতাদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ বন্ধ রাখতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) চিঠি দিয়েছে জামায়াত। অন্যদিকে, বিষয়টি আদালত ও কমিশনের ওপর ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। যেহেতু এবার নির্দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে, সেহেতু কেউ অংশ নিতে চাইলে তাকে নিরুৎসাহিত করা হবে না— এটা দলের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত। তবে দলীয়ভাবে অংশ নেব কি না, কাউকে সর্মথন দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে দলীয় ফোরামে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হবে।’

যা বলছেন বিশ্লেষকরা

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কেবল আগাম প্রস্তুতিই ভোটের ফলাফল নির্ধারণ করে না। প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় ইস্যু, ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং নির্বাচন পরিচালনার সামগ্রিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী কালবেলাকে বলেন, ‘বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের প্রার্থীরা গণসংযোগ চালাচ্ছেন। নির্বাচন ও পরিবেশ কতটা সুষ্ঠু থাকে, স্থানীয় এমপিদের আচরণ কেমন থাকে, প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকছে কি না, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা—চার বিষয়ের ওপর ভোটের ফলাফল নির্ভর করবে। আবার বিএনপির প্রশাসকরাও পদে থেকে ভোটের মাঠ গোছাচ্ছে, যা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।’