জাফর পাঠান
বাংলা কবিতার দীর্ঘ অভিযাত্রায় ছন্দ কখনো কবিতার শরীর, কখনো তার গতি, আবার কখনো তার অন্তর্নিহিত সংগীত হয়ে উঠেছে। অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্তের মতো প্রতিষ্ঠিত ছন্দপদ্ধতি বাংলা কবিতাকে দিয়েছে সুসংহত কাঠামো ও শ্রুতিমাধুর্য। একই সঙ্গে কবিরা যুগে যুগে প্রচলিত কাঠামোর ভেতরে নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেছেন। সেই অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় ‘মুক্তবৃত্ত ছন্দ’ নামে একটি প্রস্তাবিত ছন্দপ্রকরণের ধারণা সামনে এনেছেন কবি জাফর পাঠান।
এই প্রকরণের মূল উদ্দেশ্য ছন্দকে পরিত্যাগ করা নয়; বরং কবিতার ভাব, আবেগ ও বক্তব্যের স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে ছন্দের কাঠামোর একটি ভারসাম্য তৈরি করা।
ভাব আগে, ছন্দ তার সহযাত্রী
মুক্তবৃত্ত ছন্দের মূল দর্শনকে একটি বাক্যে প্রকাশ করা যায়—
“ভাব ছন্দের অনুসারী নয়; ছন্দ ভাবের অনুসারী।”
কবিতার ভাবকে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচে জোর করে বসানোর পরিবর্তে এখানে ছন্দকে ভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এই স্বাধীনতা কোনোভাবেই ছন্দহীনতা বা নিয়মহীনতা নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো—নিয়মের মধ্যেই সৃজনশীল স্বাধীনতা তৈরি করা।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কবিতার বক্তব্য, আবেগ, উচ্চারণ ও গতি ছন্দের কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
প্রবর্তনের পটভূমি
কবি জাফর পাঠানের বক্তব্য অনুযায়ী, মুক্তবৃত্ত ছন্দের প্রাথমিক ধারণার বিকাশ ২০১৬ সালের দিকে। পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁর কবিতায় এই পদ্ধতির প্রয়োগ করেন এবং কাব্যগ্রন্থ দুর্বহ দুর্দিন-এ এর ব্যবহারকে আরও সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেন।
দুর্বহ দুর্দিন গ্রন্থের প্রকাশিত বই-পরিচিতিতেও গ্রন্থটির কবিতাগুলোকে ‘মুক্তবৃত্ত ছন্দে’ রচিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে এই কাব্যগ্রন্থকে প্রকরণটির একটি ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে দেখা যায়।
মাত্রা: স্বাধীনতার ভেতরের শৃঙ্খলা
মুক্তবৃত্ত ছন্দের কাঠামোয় মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই প্রকরণে মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষরকে একমাত্রা হিসেবে বিবেচনা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। যুক্তাক্ষর বা বদ্ধাক্ষরও একমাত্রা হিসেবে গণ্য হবে। একইভাবে ‘ৎ’ ও ‘ং’-এর ক্ষেত্রেও একমাত্রার হিসাব প্রযোজ্য।
তবে মুক্তবৃত্তের বিশেষত্ব কেবল মাত্রা গণনায় নয়; বরং কীভাবে সেই মাত্রা পংক্তি ও স্তবকের মধ্যে বিন্যস্ত হবে, তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্তবকের ভেতরে মাত্রাসাম্য
এই প্রকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো স্তবকের অভ্যন্তরে মাত্রাসাম্য।
একটি কবিতায় যতগুলো স্তবকই থাকুক, একটি নির্দিষ্ট স্তবকের অন্তর্ভুক্ত পংক্তিগুলোর মাত্রাসংখ্যা একই থাকবে। অর্থাৎ কোনো স্তবকের প্রথম পংক্তি যে সংখ্যক মাত্রায় নির্মিত, সেই স্তবকের অন্যান্য পংক্তিতেও একই মাত্রাসংখ্যা বজায় থাকবে।
কিন্তু পুরো কবিতার প্রতিটি স্তবকে একই মাত্রাসংখ্যা থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
কবি চাইলে প্রথম স্তবকে এক ধরনের মাত্রাসংখ্যা, পরবর্তী স্তবকে অন্য মাত্রাসংখ্যা এবং তার পরের স্তবকে আবার ভিন্ন মাত্রাসংখ্যা ব্যবহার করতে পারেন। এর উদ্দেশ্য হতে পারে কবিতার ভাবের পরিবর্তন, আবেগের ওঠানামা, বক্তব্যের গতি অথবা কবিতার দৃশ্যমান অবয়বকে আরও নান্দনিক করে তোলা।
এখানে তাই স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা পাশাপাশি অবস্থান করে:
স্তবকান্তরে স্বাধীনতা, স্তবকের ভেতরে সাম্য।
মাত্রাসংখ্যার পরিবর্তন ও কবিতার অবয়ব
একটি কবিতার সব স্তবক একই দৈর্ঘ্য ও একই মাত্রাসংখ্যায় নির্মিত হলে তার মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ছন্দগত ঐক্য তৈরি হয়। আবার স্তবকভেদে মাত্রাসংখ্যা কম-বেশি করলে কবিতার অবয়বে বৈচিত্র্য আসে।
এই বৈচিত্র্য শুধু দৃষ্টিনন্দনতার জন্য নয়; ভাবের সঙ্গে এর সম্পর্কও রয়েছে। কোনো জায়গায় কবিতার বক্তব্য দ্রুত এগিয়ে যেতে পারে, কোথাও তা বিস্তৃত হতে পারে, আবার কোথাও আবেগের ঘনত্ব বাড়তে পারে। সেই প্রয়োজন অনুযায়ী স্তবকের মাত্রাসংখ্যায় পরিবর্তন আনার সুযোগ মুক্তবৃত্ত ছন্দের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
তবে পরিবর্তনটি হবে পরিকল্পিত। একটি স্তবকের পংক্তিগুলোর মধ্যে মাত্রাসংগতি নষ্ট করা এই প্রকরণের উদ্দেশ্য নয়।
অন্ত্যমিলের ভূমিকা
মুক্তবৃত্ত ছন্দে অন্ত্যমিল কবিতার শ্রুতিগত সৌন্দর্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পংক্তির শেষে মিলধর্মী ধ্বনি ব্যবহারের ফলে কবিতায় আবৃত্তিযোগ্যতা ও সংগীতধর্মিতা বৃদ্ধি পায়।
দুর্বহ দুর্দিন কবিতায় এর ব্যবহার সরাসরি লক্ষ্য করা যায়। বাংলা-কবিতা ডট কমে প্রকাশিত কবিতার শুরুতেই রয়েছে—
“ছি: কি বর্বর ভয়াবহ- জঘন্য- বর্তমান চরাচর”
“চিত্রপটে ঝরে রক্তাশ্রু ঝরঝর।”
এখানে ‘চরাচর’ ও ‘ঝরঝর’-এর শেষ ধ্বনিগত মিল পংক্তিদ্বয়ের মধ্যে শ্রুতিগত সম্পর্ক তৈরি করেছে।
আবার—
“কি ভয়ংকর লীলা-খেলা- জীবন নিয়ে চলছে হেলা”
“কাটে দীপ্র দুর্দৈবের অদৈব বেলা।”
এখানে ‘হেলা’ ও ‘বেলা’-র অন্ত্যমিল পংক্তিদ্বয়ের ছন্দগত ঐক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে।
কবিতাটির অন্যান্য অংশেও ‘কুহর/বহর’, ‘নীরবতা/দাম্ভিকতা’, ‘নির্দয়/হৃদয়’, ‘উল্লাস/বিলাস’ ইত্যাদি মিলধর্মী শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।
অন্ত্যমিলের এই ব্যবহার মুক্তবৃত্ত ছন্দের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রুতিগত বৈশিষ্ট্যকে প্রকাশ করে।
পর্ব ও যতি
মুক্তবৃত্ত ছন্দে পর্ব ও যতি পরিত্যক্ত নয়। বরং কবিতার ভাব, উচ্চারণ ও বক্তব্যের প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলোর বিন্যাসে স্বাধীনতা রাখা হয়েছে।
একটি পংক্তির অভ্যন্তরে কোথায় স্বাভাবিক বিরাম আসবে, কোথায় বক্তব্যের ওপর জোর পড়বে, কিংবা কোথায় উচ্চারণের গতি পরিবর্তিত হবে—এসব বিষয় ছন্দের প্রয়োগে গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে মুক্তবৃত্ত ছন্দে মাত্রা, পর্ব, যতি ও অন্ত্যমিলকে বিচ্ছিন্ন উপাদান হিসেবে নয়; বরং একটি সমন্বিত ছন্দব্যবস্থার অংশ হিসেবে দেখা হয়।
‘দুর্বহ দুর্দিন’: একটি ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত
তাত্ত্বিক কোনো ছন্দপ্রকরণের কার্যকারিতা বোঝার জন্য তার বাস্তব প্রয়োগ দেখা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে জাফর পাঠানের দুর্বহ দুর্দিন উল্লেখযোগ্য।
বাংলা-কবিতা ডট কমে কবিতাটি ৭ আগস্ট ২০২২ তারিখে প্রকাশিত হয়েছে। কবিতাটির পংক্তিবিন্যাসে অন্ত্যমিলের ধারাবাহিকতা যেমন আছে, তেমনি স্তবকভিত্তিক কাঠামোর মধ্যেও একটি পরিকল্পিত ছন্দবোধ লক্ষ্য করা যায়।
এ ধরনের প্রয়োগ থেকে বোঝা যায়, মুক্তবৃত্ত ছন্দের ধারণাটি শুধু একটি তাত্ত্বিক বক্তব্য হিসেবে সীমাবদ্ধ নয়; কবিতার বাস্তব নির্মাণেও এটি প্রয়োগ করা হয়েছে।
প্রচলিত ছন্দের সঙ্গে সম্পর্ক
মুক্তবৃত্ত ছন্দকে প্রচলিত বাংলা ছন্দের সম্পূর্ণ বিকল্প বা প্রত্যাখ্যান হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং এটি ছন্দচর্চার একটি পৃথক প্রস্তাব হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রচলিত ছন্দের অনেক কাঠামোয় নির্দিষ্ট মাত্রা বা অক্ষরবিন্যাস একটি কবিতার বিভিন্ন পংক্তিতে তুলনামূলকভাবে স্থির থাকে। মুক্তবৃত্ত ছন্দে সেই কাঠামোর মধ্যে স্তবকভেদে পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে।
তাই এর বিশেষত্ব ‘নিয়ম নেই’—এমন নয়। বরং বিশেষত্ব হলো নিয়মের প্রকৃতি ভিন্ন।
দৃশ্যমান সৌন্দর্য ও ছন্দ
আধুনিক কবিতা শুধু আবৃত্তির জন্য নয়; মুদ্রিত বই, পত্রিকা ও ডিজিটাল পর্দায় পাঠের জন্যও নির্মিত হয়। ফলে কবিতার দৃশ্যমান অবয়বও নান্দনিকতার অংশ হয়ে উঠেছে।
মুক্তবৃত্ত ছন্দে স্তবকভেদে মাত্রাসংখ্যার পরিবর্তনের সুযোগ কবিকে সেই দৃশ্যমান অবয়ব নিয়ে কাজ করার একটি অতিরিক্ত স্বাধীনতা দেয়। একই সঙ্গে ছন্দের শ্রুতিগত সৌন্দর্য ও কবিতার দৃশ্যমান বিন্যাস—দুই দিককে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি হয়।
মুক্তবৃত্ত ছন্দের মূল বৈশিষ্ট্য
মুক্তবৃত্ত ছন্দের ধারণাকে সংক্ষেপে কয়েকটি নীতিতে প্রকাশ করা যায়—
ভাবের স্বাধীনতা;
ছন্দের শৃঙ্খলা;
স্তবকের ভেতরে মাত্রাসাম্য;
স্তবকান্তরে মাত্রার বৈচিত্র্য;
পংক্তিতে অন্ত্যমিল;
প্রয়োজন অনুযায়ী পর্ব ও যতির বিন্যাস।
এই বৈশিষ্ট্যগুলো মিলেই প্রকরণটির নিজস্ব কাঠামো নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে।
উপসংহার
কবিতার ইতিহাসে নতুন ছন্দের ধারণা কখনোই কেবল একটি নিয়মের জন্ম নয়; এর সঙ্গে যুক্ত থাকে কবির ভাষাবোধ, শ্রুতিবোধ ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গি। ‘মুক্তবৃত্ত ছন্দ’ সেই অর্থে বাংলা কবিতার ছন্দচর্চায় একটি প্রস্তাবিত নতুন প্রয়াস।
এর মূল লক্ষ্য ছন্দকে ভেঙে দেওয়া নয়, বরং কবিতার ভাবের সঙ্গে ছন্দের সম্পর্ককে আরও নমনীয় করা। একটি স্তবকের মধ্যে মাত্রাসাম্য বজায় রেখে স্তবকান্তরে মাত্রার পরিবর্তনের সুযোগ, অন্ত্যমিলের ব্যবহার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পর্ব ও যতির বিন্যাস—এই সমন্বয়ই এর কাঠামোর ভিত্তি।
কবি জাফর পাঠানের দুর্বহ দুর্দিনসহ প্রকাশিত কবিতায় এই প্রকরণের প্রয়োগ দেখা যায়। ভবিষ্যতে ছন্দবিশারদ, কবি ও সাহিত্যসমালোচকদের আলোচনার মাধ্যমে এই প্রকরণের তাত্ত্বিক মূল্য, সীমা ও সম্ভাবনা আরও গভীরভাবে পর্যালোচিত হতে পারে।
বাংলা কবিতার ছন্দভুবনে শেষ কথা বলে কিছু নেই। নতুন ভাবনা, নতুন প্রয়োগ এবং নতুন বিতর্কই সাহিত্যকে গতিশীল রাখে। সেই ধারায় মুক্তবৃত্ত ছন্দ একটি প্রস্তাব—একটি অনুসন্ধান—এবং কবিতার ভাব ও ছন্দের সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখার একটি প্রয়াস।
তথ্যসূত্র
১. জাফর পাঠান, দুর্বহ দুর্দিন, সাহিত্যদেশ।
২. বাংলা-কবিতা ডট কম, জাফর পাঠানের কবি-প্রোফাইল।
৩. বাংলা-কবিতা ডট কম, ‘দুর্বহ দুর্দিন’, প্রকাশ: ৭ আগস্ট ২০২২।
৪. রকমারি, দুর্বহ দুর্দিন—গ্রন্থের প্রকাশিত বিবরণ।

