• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

জাতীয় বৈশিষ্ট্যে আমরা: ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ

প্রকাশ: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:৪৩
আপডেট: শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৮:৪৩

জাতীয় বৈশিষ্ট্যে আমরা: ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ

লন্ডন ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ ছোট দেশ—মানচিত্রে দেখলে মনে হয়, আহা! এতটুকু জায়গা। কিন্তু এই ছোট্ট দেশের মানুষের আবেগ, মতামত, দলাদলি ও ফেসবুকীয় জ্ঞান এত বিশাল যে, চাইলে পৃথিবীর মানচিত্রের বাইরে গিয়েও তার বিস্তার ঘটতে পারে!
আমরা এমন এক জাতি, যারা তিলকে তাল বানাতে ওস্তাদ। কারও বিয়েতে কে আগে সালাম দিল, কে কার পোস্টে ‘লাইক’ দিল না, কোন শিল্পী কোন অনুষ্ঠানে গান গাইল, কে কাকে ‘ভাই’ বলল আর কে ‘আপনি’ বলল—এসব বিষয় নিয়ে আমরা জাতীয় পর্যায়ের বিতর্ক করতে পারি।
আমাদের সবচেয়ে বড় গুণ হলো—আমরা কোনো বিষয়ে চুপ থাকতে পারি না। বিষয়টি জানি কি না, বুঝি কি না, সেটি দ্বিতীয় প্রশ্ন। মতামত আছে কি না—সেটিই আসল।
ফেসবুকে কোনো খবর দেখলাম। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য:
‘আমি আগেই বলেছিলাম!’
কী বলেছিলেন?
তা অবশ্য মনে নেই। কিন্তু বলেছিলেন—এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত!
আরেকজন লিখবেন, ‘দেশ শেষ!’
কীভাবে শেষ?
সেটা তিনি জানেন না। তবে দেশ শেষ—এ ব্যাপারে তার কোনো সন্দেহ নেই।
প্রশংসারও আছে বিপদ
আমাদের দেশে কাউকে একটু প্রশংসা করাও বিপজ্জনক কাজ।
ধরা যাক, আপনি লিখলেন—‘অমুক সাহেব খুব ভালো মানুষ।’
ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে আরেক পক্ষ হাজির—
‘ভালো মানুষ? আপনি কি তার ইতিহাস জানেন?’
আরেকজন বলবেন—
‘আপনি নিশ্চয়ই তার কাছ থেকে সুবিধা নিয়েছেন।’
তৃতীয়জন বলবেন—
‘এত প্রশংসা করার কী আছে? পৃথিবীতে আর কোনো ভালো মানুষ নেই?’
শেষ পর্যন্ত আপনি নিজেই ভাবতে বসবেন—মানুষটির প্রশংসা করলাম, নাকি জাতীয় সংকট সৃষ্টি করলাম?
আমাদের দলবদলও অসাধারণ
আমাদের আরেকটি বিশেষ প্রতিভা হলো—পক্ষ পরিবর্তন।
এখানে মতাদর্শ খুব শক্ত জিনিস নয়। পরিস্থিতি অনুযায়ী একটু বাঁকানো যায়, ভাঁজ করা যায়, প্রয়োজনে পকেটে ঢুকিয়েও রাখা যায়।
সকালবেলা যাকে নিয়ে ফেসবুকে যুদ্ধ করলেন, বিকেলে তার সঙ্গে চা খেতে বসে বলতে পারেন,
‘আরে ভাই, ওসব তো রাজনৈতিক কথা! ব্যক্তিগতভাবে কিন্তু আপনাকে আমি খুব পছন্দ করি।’
রাজনীতির মাঠে তো এই প্রতিভার কোনো তুলনাই নেই। আজ যে ব্যক্তি ‘জাতির শত্রু’, কাল তিনিই ‘জাতির আশা’। গতকাল যিনি ছিলেন ‘দুর্নীতির প্রতীক’, আজ তিনি হয়ে যেতে পারেন ‘অভিজ্ঞ ও দক্ষ নেতা’।
মানুষ বদলায় না—আমাদের ব্যাখ্যা বদলায়!
১৭৫৭ থেকেই কি এমন?
অনেকে বলেন, আমাদের এই দুরবস্থার শুরু ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ থেকে। তার আগে নাকি আমরা বেশ সুখে-শান্তিতে ছিলাম, ধনী ছিলাম, সভ্য ছিলাম। তারপর ব্রিটিশরা এসে সব নিয়ে গেল।
ব্রিটিশরা অনেক কিছু নিয়েছে—এ কথা ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু একটা জিনিস তারা নিয়ে যেতে পারেনি—আমাদের তর্ক করার অসাধারণ ক্ষমতা।
বরং সেটি আমরা উত্তরাধিকার সূত্রে আরও উন্নত করেছি।
১৭৫৭ সালের আগে মানুষ হয়তো জমিদার, নবাব ও রাজাদের সঙ্গে ঝগড়া করত। এখন আমরা মোবাইল হাতে নিয়ে সেই ঐতিহ্যকে বিশ্বব্যাপী সম্প্রচার করি।
আগে ঝগড়া হতো পাড়ায়।
এখন ঝগড়া হয় লাইভে।
আগে দশজন দেখত।
এখন দশ লাখ!
সভ্যতার অগ্রগতি বোধহয় এটাকেই বলে।
ধর্ম নিয়ে আমরা আরও বেশি সংবেদনশীল
আমাদের দেশে ধর্ম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ধর্মীয় অনুভূতি যতটা পবিত্র, তার অপব্যবহারও ততটাই বিপজ্জনক।

আমাদের জাতীয় রোগ: ‘আগে শেয়ার, পরে বিচার’
আমাদের দেশে তথ্য যাচাই করার পদ্ধতিটিও চমৎকার।
প্রথমে শেয়ার।
তারপর কমেন্ট।
তারপর গালি।
তারপর ঝগড়া।
সবশেষে জানা গেল—খবরটাই ভুল!
তখন আমরা কী করি?
পোস্টটি চুপচাপ ডিলিট করি।
কেউ জিজ্ঞেস করলে বলি—
‘ভাই, আমি তো শুধু শেয়ার করেছিলাম!’
অর্থাৎ আগুন লাগানোর দায় আমাদের নয়, দেশলাইয়ের!
আমরা সবাই বিশেষজ্ঞ
বাংলাদেশে বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য পড়াশোনা, গবেষণা বা অভিজ্ঞতার খুব বেশি দরকার নেই।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল খুলুন।
দুপুরের মধ্যে আপনি অর্থনীতিবিদ।
বিকেলে রাজনীতিবিদ।
সন্ধ্যায় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ।
রাতে চিকিৎসাবিজ্ঞানী।
পরদিন ক্রিকেট ম্যাচ হলে ক্রীড়া বিশ্লেষক।
আর নির্বাচন এলে আপনি এমন একজন রাজনৈতিক কৌশলবিদ, যাকে কোনো দল এখনো চিনতে পারেনি—এটাই তাদের দুর্ভাগ্য!
তাহলে আমরা কি সত্যিই আজব?
হ্যাঁ, কিছুটা আজব তো বটেই।
তবে আমাদের আজবত্বের মধ্যেও মজার সৌন্দর্য আছে। আমরা বিপদে একে অন্যের পাশে দাঁড়াই, আনন্দে একসঙ্গে উৎসব করি, অতিথিকে আপন করে নিই, অসুস্থের জন্য রক্ত দিই, দুর্যোগে মানুষের পাশে ছুটে যাই।
অর্থাৎ সমস্যা আমাদের মানুষ হওয়ায় নয়; সমস্যা হলো আমরা মাঝে মাঝে মানুষ হওয়ার চেয়ে ‘কোন দলের মানুষ’ সেটাকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি।
আমাদের দরকার একটু কম উত্তেজনা, একটু বেশি হাস্যরস; একটু কম গালাগালি, একটু বেশি যুক্তি; একটু কম ‘আমিই ঠিক’, একটু বেশি ‘দেখি তো, অন্যজন কী বলছে’।
সবচেয়ে বেশি দরকার—ফেসবুকের পোস্টকে আদালতের রায় মনে না করা।
কারণ মনে রাখা ভালো—
সব পোস্ট সত্য নয়, সব মন্তব্য জ্ঞান নয়, সব বিতর্ক জরুরি নয় এবং সব ঝগড়ায় জেতাও কোনো অর্জন নয়।
আমরা ছোট্ট দেশ। তাই দেশটাকে বড় করতে হলে অন্তত আমাদের মনের আকারটা বড় করতে হবে।
আর ততদিন পর্যন্ত আমরা সম্ভবত এমনই থাকব—
আজব দেশ, আজব জাতি, আজব আমাদের যুক্তি;
তবু এই আজব মানুষগুলোকেই নিয়ে আমাদের বাংলাদেশ—
ঝগড়ায় অমর, আবেগে অদ্বিতীয়, আর ফেসবুকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন!