রাজবাড়ী প্রতিনিধি
ছবি সংগৃহীত
রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুরে প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ হলে শুধু রাজবাড়ী নয়, দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের ২৪ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষ এর সুফল পাবেন বলে জানিয়েছেন পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।
তিনি দাবি করেন, এ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীভাঙন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য, নৌযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে বদলে যাবে এ অঞ্চলের অর্থনীতি।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার হাবাসপুর কে রাজ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জনসভার আগে বেলা ১১টার দিকে পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন-অর-রশিদ হারুনসহ সংশ্লিষ্টরা হাবাসপুরে পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের প্রস্তাবিত স্থান সরেজমিন পরিদর্শন করেন।
জনসভায় পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘পদ্মা ব্যারেজ শুধু একটি বাঁধ বা অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্প নয়; এটি দেশের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। ২৪ জেলার প্রায় সাত কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে এই প্রকল্পের সম্পর্ক রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘পদ্মা ব্যারেজ বাংলাদেশের একটি মাস্টারমাইন্ড মেগা প্রজেক্ট। এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ২৪টি জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটবে। কৃষিতে বিপ্লব হবে, বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, মাছের উৎপাদন বাড়বে। এর সঙ্গে আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হবে।’
পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘হাবাসপুর এলাকায় একসময় পদ্মা নদী অনেক দূরে ছিল। নদীভাঙনে ভাঙতে ভাঙতে এখন নদী মানুষের বসতবাড়ির কাছে চলে এসেছে। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি ও প্রবল স্রোতে ভাঙন ও প্লাবন দেখা দেয়। আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় পানির সংকট। বছরের পর বছর এ অঞ্চলের মানুষ কখনো বন্যা, কখনো ভাঙন, আবার কখনো পানির সংকটের সঙ্গে লড়াই করছেন।’
তিনি বলেন, ‘শুধু রাজবাড়ীর মানুষই নয়, উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৪ জেলার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পানি সংকট ও নদীভাঙনের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের পাশাপাশি নদী, খাল-বিল ও জলাশয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।’
পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ দীর্ঘদিনের উল্লেখ করে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশি-বিদেশি পানি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। সাক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ২০০৪ সাল থেকে বিস্তারিত সমীক্ষার কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘২০০৪ সাল থেকে কারিগরি সমীক্ষা নিয়ে আমরা এগিয়ে এসেছি। আজ ২০২৬ সালে এসে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য একনেকে অনুমোদন পেয়েছে। আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এখন বাস্তবে রূপ দেওয়ার সময় এসেছে।’
সরকারের পক্ষ থেকে পদ্মা ব্যারেজকে অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আগামী বছরের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চের মধ্যে যেকোনো সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রকল্পটির উদ্বোধন করতে পারেন।’
মন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এ অঞ্চলে কৃষি বিপ্লব ঘটবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, মাছের উৎপাদন বাড়বে। আধুনিক প্রযুক্তির নানা সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হবে। এর মধ্য দিয়ে ২৪টি জেলার অর্থনৈতিক রূপান্তর ঘটানো সম্ভব হবে।’ প্রকল্পের আওতায় নেভিগেশন লক, বিভিন্ন ধরনের গেট ও পানি নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামো থাকবে বলে জানান তিনি। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সংরক্ষণ ও সরবরাহের ব্যবস্থাও থাকবে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ মূল ব্যারেজে ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস, নেভিগেশন লক ও গাইড বাঁধ থাকবে। প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।’
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের মাধ্যমে দুই ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনার কথাও জানান পানিসম্পদমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের সঙ্গে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পে দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মোট প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, কৃষি উৎপাদন ও মাছের উৎপাদন বাড়লে এ অঞ্চলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতির গতি আরও বাড়বে।’
গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশের পানির ন্যায্য হিস্যা ও অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। নতুন চুক্তিতে গ্যারান্টি ক্লজ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানান তিনি।’
তিনি বলেন, ‘পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করা এবং দেশের নদ-নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। পদ্মা ব্যারেজসহ বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য দেশজুড়ে খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান পানিসম্পদমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য রয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, জলাবদ্ধতা কমানো, কৃষিতে সেচ সুবিধা বাড়ানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ হলে নদীভাঙন, বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমের পানির সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করা কঠিন। পদ্মার পাড়ের মানুষ বছরের পর বছর প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছেন। পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ হলে আপনাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দাবি বাস্তবায়নের পথ তৈরি হবে।’
প্রকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা চেয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, ‘বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় সাময়িকভাবে মানুষের কিছুটা কষ্ট হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল অনেক বেশি হবে। এ কারণে প্রকল্পের কাজে স্থানীয় জনগণকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।’
তিনি বলেন, ‘পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও জনগণের সহযোগিতায় আগামী দিনে পদ্মা ব্যারেজকে দৃশ্যমান করা হবে। ইনশাল্লাহ, এই প্রকল্পের মধ্য দিয়ে আপনাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।’
উল্লেখ্য, গত ১৩ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি হিসেবে প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প ব্যয় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩।
এ জনসভায় আরও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য হারুন-অর-রশিদ হারুন। হাবাসপুর ইউনিয়ন বিএনপির আয়োজনে অনুষ্ঠিত জনসভায় সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান প্রামাণিক।

