• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

জাতীয়

কংক্রিটের ঢাকায় পাখিদের ঠিকানা ‘আকাশ নীড়’

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৩৭
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৩৭

কংক্রিটের ঢাকায় পাখিদের ঠিকানা ‘আকাশ নীড়’

শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
কংক্রিটের নগরী ঢাকা। চারপাশে ইট-পাথরের ভবন, ব্যস্ত সড়ক আর মানুষের কোলাহল। বাড়ছে ভবনের উচ্চতা, ক্রমেই কমছে সবুজের পরিসর। এর প্রভাব পড়ছে নগরের জীববৈচিত্র্যের ওপরও। হারিয়ে যাচ্ছে পাখির নিরাপদ আশ্রয়, কমছে খোলা আকাশ ও প্রকৃতির সান্নিধ্য। এমন বাস্তবতায় ঢাকার একটি ছাদে তৈরি হয়েছে ব্যতিক্রমী এক ঠিকানা-‘আকাশ নীড়’।

‘পাখির রাজ্যে স্বাগতম’ স্লোগানকে সামনে রেখে ঢাকা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নির্মিত এ ছাদবাগানে একসঙ্গে মিলেছে সবুজ, ফুল, ফল, জলাধার, পাখির খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়। উদ্দেশ্য শুধু একটি ছাদকে সবুজে সাজানো নয়, বরং নগরের বুকে হারিয়ে যেতে বসা জীববৈচিত্র্যের জন্য তৈরি করা একটি নিরাপদ পরিসর।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) ‘আকাশ নীড়’ নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফরিদা খানম। এ সময় জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরীতে সবুজের জন্য একটু জায়গা, নির্মল বাতাসের জন্য একটু অবকাশ এবং পাখির কিচিরমিচির শোনার মতো শান্ত পরিবেশ দিন দিন দুর্লভ হয়ে উঠছে। তবে উদ্যোগ, ভালোবাসা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে কংক্রিটের শহরের বুকেও সবুজের পরশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘আকাশ নীড়’ শুধু একটি ছাদবাগান নয়, এটি নগরজীবনে সবুজ, জীববৈচিত্র্য ও পাখির নিরাপদ আবাস ফিরিয়ে আনার একটি ছোট কিন্তু অর্থবহ প্রয়াস। এখানে এমন একটি পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে পাখি শুধু আসবে না, নিরাপদে আশ্রয় নেবে, খাবার পাবে এবং নির্বিঘ্নে বিচরণ করতে পারবে।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ‘আকাশ নীড়ে’ রয়েছে ৫৮ প্রজাতির মোট ৪১৮টি গাছ। এর মধ্যে পাখিদের খাদ্যের উৎস ও পরাগায়নের জন্য রোপণ করা হয়েছে ৩০ প্রজাতির ২২৯টি ফুলের গাছ। রয়েছে ১৪ প্রজাতির ৪১টি ফলের গাছ, যা পাখিদের জন্য তৈরি করবে প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎস। জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করতে রয়েছে ১১ প্রজাতির ৪৪টি অর্নামেন্টাল গাছ।

পাখিদের জন্য রাখা হয়েছে পদ্ম ও শাপলায় সাজানো জলাধার এবং বার্ডস বাথ। নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য তৈরি করা হয়েছে বাঁশের কৃত্রিম ঝোপঝাড় ও পাখির ঘর। পাশাপাশি বড় ক্যানোপিযুক্ত গাছের পরিবেশও রাখা হয়েছে। স্থানীয় খরগোশ, বানর ও কাঠবিড়ালির জন্যও রয়েছে নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা।

জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম বলেন, ঢাকার প্রতিটি ভবনের ছাদ যদি একটু একটু করে সবুজ হয়ে ওঠে এবং প্রতিটি মানুষ নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অন্তত একটি গাছ রোপণ করেন, তাহলে এ শহর আরও বাসযোগ্য, সুন্দর ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে।

তিনি আরও বলেন, প্রকৃতিকে রক্ষা করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব। সবুজ মানেই শুধু সৌন্দর্য নয়, সবুজ মানেই প্রাণ, সুস্থতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ জীবন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার মো. মনিরুজ্জামান মিঞা বলেন, নগরায়ণের ফলে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে সবুজ এলাকা ও জীববৈচিত্র্যের পরিসর। এ বাস্তবতায় ছাদবাগান শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়, বরং নগরের পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর একটি উদ্যোগ।

তিনি বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও যদি নিজেদের ভবনের ছাদে সবুজায়ন করে এবং পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে, তাহলে সম্মিলিতভাবে নগরের পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বিভাগীয় কমিশনার বলেন, ‘আকাশ নীড়’ মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ককে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার একটি উদ্যোগ। এ ধরনের উদ্যোগ নগরবাসীর মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি আরও দায়িত্বশীল করে তুলতে পারে।

শুধু পাখি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, মানুষের জন্যও ‘আকাশ নীড়’কে রাখা হয়েছে স্বস্তির একটি জায়গা হিসেবে। নগরজীবনের ব্যস্ততা ও কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে এসে প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর জন্য এখানে তৈরি করা হয়েছে নান্দনিক বিশ্রামস্থল। রয়েছে ছাতা ও কাঠের চেয়ার। ফুলের সুবাস, সবুজের সমারোহ আর পাখির কলতানে জায়গাটি হয়ে উঠেছে নগরজীবনে প্রশান্তির এক ছোট্ট পরিসর।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, ‘আকাশ নীড়’কে শুধু একটি ছাদবাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একটি ধারণা হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়াই এ উদ্যোগের লক্ষ্য। একটি ভবনের ছাদ থেকে শুরু হয়ে এ ধারণা যদি ঢাকার অসংখ্য ছাদে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে কংক্রিটের নগরীতেও গড়ে উঠতে পারে সবুজের নতুন বলয়।