শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
রাজধানীর মহাখালী বাস টার্মিনালের যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমাতে অলস বাসগুলো পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকার ডিপোতে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় বাসের নিরাপত্তায় মালিক-শ্রমিকদের সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রতিটি বাসে ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ। মহাখালী টার্মিনালে এখন শুধু চলাচলরত বাস রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মালিক-শ্রমিক ও পুলিশের সমন্বিত প্রচেষ্টায় টার্মিনালের সামনের সড়কে যত্রতত্র বাস পার্কিংও কমেছে।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় মহাখালী বাস টার্মিনাল পরিবহন মালিক সমিতির সভাকক্ষে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে টার্মিনাল পরিবহন সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন পুলিশ ও মালিক পরিবহন সমিতির নেতারা।
মতবিনিময় সভায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মো. হুমায়ুন কবির খান বলেন, ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল মহাখালীতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গাড়ি আসে। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে এখানে প্রতিদিন যানজট ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিবহন খাতকে শৃঙ্খলিত ও পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে মহাখালী টার্মিনালকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টার্মিনালের ধারণক্ষমতার বাইরে থাকা গাড়িগুলো অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রাখার জন্য পূর্বাচলের ৩০০ ফিট এলাকায় জায়গা দেওয়া হয়েছে। সেখানে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা, শ্রমিকদের থাকার জন্য হোটেল এবং নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
এ উদ্যোগের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের জটিলতা পরিবর্তন করে মহাখালী টার্মিনাল থেকে অতিরিক্ত গাড়িগুলো পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। আশা করা হচ্ছে, এ কাজ সফল হলে মহাখালী টার্মিনাল যানজটমুক্ত হবে এবং শুধু চলাচলরত গাড়িগুলো টার্মিনাল থেকে পরিচালিত হবে।
তিনি আরও বলেন, এই কার্যক্রম চলার মধ্যেই গতকাল রাত থেকে বিভিন্ন টার্মিনাল ও স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ককটেল বিস্ফোরণ, গাড়িতে আগুন দেওয়া ও আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনা ঘটছে। মহাখালী টার্মিনালের মালিক-শ্রমিকরা এ পরিস্থিতিতে নিজেদের পুরোপুরি নিরাপদ মনে করছেন না। টার্মিনালের পাশের গুলশান এলাকায় কয়েক দিন আগে এবং এর দক্ষিণ পাশের কয়েকটি স্থানে দিনের বেলায়ও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় মালিক-শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধভাবে সচেতন থেকে এসব ঘটনা প্রতিহত করে টার্মিনালে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য প্রস্তুত রয়েছেন।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং ঢাকা মহানগরবাসী ও দেশবাসীকে কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মহাখালী টার্মিনালকে যাত্রীদের ব্যবহারের স্থান হিসেবে রেখে ডিপো হিসেবে ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ৩০০ ফিট সড়কে বাস রাখার জন্য জায়গা পাওয়া গেছে এবং সেটি উন্নয়ন করা হয়েছে। উন্নয়নকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। সেখানে চালকদের থাকা-খাওয়া, বিনোদন, বিশ্রাম, নিরাপত্তা এবং গাড়ি মেরামতসহ অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। গাড়ি টার্মিনাল থেকে ডিপোতে আনা-নেওয়ার কারণে প্রতি গাড়িতে গড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হলেও সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থার স্বার্থে মালিক-শ্রমিকরা তা মেনে নিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গাড়িতে আগুন দেওয়া, ককটেল নিক্ষেপ বা নাশকতার মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে সাইফুল আলম বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে মালিক-শ্রমিকদের সচেতন করা হয়েছে। কাজ শেষে গাড়ি রাস্তার পাশে, নির্জন বা অন্ধকার স্থানে না রেখে নিজস্ব গ্যারেজ বা টার্মিনাল এলাকায় নিরাপদে রাখার জন্য সারাদেশের মালিক-শ্রমিকদের বার্তা দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে নিরাপত্তার জন্য পুলিশের সহযোগিতা নেওয়া হবে। সন্দেহভাজন কাউকে পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের জন্যও মালিক-শ্রমিকদের অনুরোধ করা হয়েছে।
ডিএমপির ট্রাফিক গুলশান ডিভিশনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. তারেক জুবায়ের বলেন, মহাখালীকে যানজটমুক্ত রাখতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের নেতারা ও পুলিশ সকাল থেকে একসঙ্গে কাজ করছেন। বৃষ্টির মধ্যেও তারা এ কার্যক্রম চালিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীও মাঝে মাঝে মহাখালী সড়ক ব্যবহার করে সচিবালয়ে যাতায়াত করেন এবং এ সড়কটি যানজটমুক্ত থাকুক, যাতে নাগরিকদের ভোগান্তি না হয়, সেটিই প্রত্যাশা করেন।
তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। সবাই সজাগ ও সতর্ক থাকলে এসব ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি প্রতিটি বাসে ছোট আকারের ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখার জন্য পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। এটি যানবাহনের নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং যেকোনো অগ্নিকাণ্ড, তা নাশকতাজনিত হোক বা দুর্ঘটনাজনিত, দ্রুত নিয়ন্ত্রণে এনে জানমালের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করবে।
ডিএমপির ট্রাফিক-উত্তর বিভাগের যুগ্ম পুলিশ কমিশনার আ স ম শামসুর রহমান ভূঁঞা বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনারের নির্দেশে গতকাল রাতে কয়েকটি বাসে আগুন ও বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় সবাইকে সচেতন করতে আমরা এখানে এসেছি। ডিএমপি পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের পাশে রয়েছে। অলস সময়ে বাসগুলো যতটা সম্ভব টার্মিনালের ভেতরে রাখতে হবে। বাইরে রাখতে হলে চালক, হেলপার বা সংশ্লিষ্টদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। নির্জন বা দূরে রাখা গাড়িতেই অনেক সময় অগ্নিসংযোগ করা হচ্ছে। চলন্ত বাসে সন্দেহজনক যাত্রী, ব্যাগ বা বিস্ফোরক ব্যবহারের কোনো আলামত দেখলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে। যেকোনো সন্দেহজনক কার্যক্রম দেখলে জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে জানানোর আহ্বান জানাচ্ছি।
তিনি বলেন, মহাখালী ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মহাখালী বাস টার্মিনালের ডিপো ৩০০ ফিট এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। সেখানে প্রায় ১৫০টি বাস রাখার অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে এবং বাসগুলো নির্দিষ্ট সময়ে সেখান থেকে এসে যাত্রী নিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছে। একই সঙ্গে মহাখালী টার্মিনালের সামনের সড়কে এখন আর যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং করা হচ্ছে না। আগে সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করতে হতো, এখন এমন একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে গাড়ি যাত্রী নিয়ে চলে যায় এবং সড়কে অবৈধভাবে না দাঁড়ায়। মালিক-শ্রমিক ও প্রশাসনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মহাখালীর যানজট পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে।
সাময়িকভাবে বিভিন্ন বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় নগরবাসীকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সবাই সম্মিলিতভাবে সচেতন হলে দুর্বৃত্তদের এসব কর্মকাণ্ড প্রতিহত করা সম্ভব হবে।
মতবিনিময় সভায় ট্রাফিক গুলশান বিভাগের এডিসি মো. জিয়াউর রহমান, মহাখালী বাস টার্মিনাল সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি মো. সিরাজুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. কামরুল ইসলাম বাবুলসহ অন্যান্য নেতারা।













