মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা
মায়ের ডাক
একজন বাবা নিখোঁজ হয়েছেন। কেটে গেছে প্রায় ছয় বছর। কিন্তু তাঁর একমাত্র ছোট্ট মেয়েটি আজও বিশ্বাস করে—একদিন হয়তো বাবা ফিরে আসবেন। দরজায় কড়া নাড়বেন। তাকে কাছে টেনে নিয়ে বলবেন, ‘মাইমুনা, কেমন আছিস?’
কিন্তু সেই দিনটি আর আসছে না।
দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকার পরিচিত ব্যবসায়ী মো. সাইফুল ইসলাম। ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর দুপুরের পর থেকে তাঁর কোনো সন্ধান নেই—এমনটাই পরিবারের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, সেদিন প্রকাশ্য সড়ক থেকে সাদা পোশাকধারী কয়েকজন অস্ত্রধারী ব্যক্তি তাঁকে হাতকড়া পরিয়ে জোরপূর্বক একটি কালো রঙের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি নিখোঁজ।
সময়ের হিসাবে প্রায় ছয় বছর। কিন্তু সাইফুল ইসলাম কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর আজও মেলেনি।
‘গুম হওয়া’ মানুষটির পরিচয়
জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাইফুল ইসলামের জন্ম ৭ জুলাই ১৯৮৪। তাঁর পিতা আবু ছিদ্দিক এবং মাতা ছায়ানারা বেগম। কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার গৌরীপুর এলাকার মেজবাহ উদ্দিন বাড়িতে তাঁর পারিবারিক ঠিকানা।
স্থানীয়ভাবে তিনি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরিবার ও স্বজনদের কাছে তিনি ছিলেন একজন দায়িত্বশীল মানুষ, একজন স্বামী এবং একজন বাবা।
কিন্তু একটি ঘটনার পর তাঁর জীবনের সব পরিচয় যেন একটি শব্দে আটকে গেছে—‘নিখোঁজ’।
সেই দুপুরের পর আর ফেরেননি সাইফুল
পরিবারের পক্ষ থেকে দাউদকান্দি থানায় দেওয়া লিখিত আবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন দুপুর আনুমানিক ২টা ৪০ মিনিটের দিকে সাইফুল ইসলাম ও তাঁর সঙ্গে থাকা একজন সাক্ষী গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় ছিলেন।
এ সময় কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি সেখানে আসে। পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কারও হাতে পিস্তল ও ওয়াকিটকি ছিল। পরে সাইফুল ইসলামকে হাতকড়া পরিয়ে জোরপূর্বক একটি কালো রঙের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
এরপর থেকেই বন্ধ হয়ে যায় তাঁর মোবাইল ফোন।
বাড়িতে আর ফেরেননি সাইফুল।
পরিবারের কাছে আসেনি কোনো ফোনকল। আসেনি কোনো নির্ভরযোগ্য খবর। শুধু দিন গড়িয়েছে, মাস পেরিয়েছে, বছর পেরিয়েছে।
খোঁজ করতে করতে ক্লান্ত পরিবার
সাইফুল নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবার সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ শুরু করে। কুমিল্লা ডিবি অফিস, র্যাব-১১, ডিবি-২, দাউদকান্দি থানা এবং আশপাশের বিভিন্ন জায়গায় তাঁর সন্ধান চাওয়া হয় বলে পরিবারের আবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
আত্মীয়স্বজনের বাড়ি থেকে শুরু করে পরিচিতজনদের কাছে, সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে—যেখানে কোনোভাবে সাইফুলের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে বলে মনে হয়েছে, সেখানেই ছুটেছেন তাঁর স্বজনরা।
কিন্তু প্রতিবারই ফিরে আসতে হয়েছে খালি হাতে।
একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের জন্য সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো—অপেক্ষা।
কারণ মৃত্যু সংবাদে অন্তত শোকের একটি শেষ থাকে। কিন্তু নিখোঁজের ক্ষেত্রে থাকে শুধু অনিশ্চয়তা।
বাবার অপেক্ষায় ছোট্ট মাইমুনা
সাইফুল ইসলামের জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায় সম্ভবত তাঁর একমাত্র মেয়ে মাইমুনাকে ঘিরে।
মাইমুনার জন্ম ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর। বর্তমানে সে গৌরীপুর আনন্দ মাল্টিমিডিয়া স্কুলে পড়াশোনা করছে।
বাবা যখন নিখোঁজ হন, তখন মাইমুনা ছিল একেবারেই ছোট।
সে বাবার স্নেহ-ভালোবাসা পাওয়ার বয়সেই বাবাকে হারিয়ে ফেলেছে—তবে মৃত্যুর মাধ্যমে নয়, এক অনিশ্চিত নিখোঁজের মাধ্যমে।
আজ মাইমুনা বড় হচ্ছে। স্কুলে যাচ্ছে, পড়াশোনা করছে, জীবনের নতুন নতুন বিষয় শিখছে। কিন্তু তার শৈশবের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর আজও নেই—
‘আমার বাবা কোথায়?’
প্রচারপত্রে মাইমুনার ছবি দিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে হৃদয়বান মানুষের কাছে সাইফুলের সন্ধান চাওয়া হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছে, সাইফুলের কন্যার আর্তনাদ শুনে কোনো সহৃদয়বান ব্যক্তি তাঁর সন্ধান পেলে যেন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রচারপত্রের শেষ কথাগুলো আরও হৃদয়স্পর্শী—অসহায় সাইফুলের পরিবার আজও তাঁর ফিরে আসার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে।
স্ত্রীও পাননি স্বামীর সান্নিধ্য
সাইফুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী ফাতেমা ইসলাম সিমলা ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
বিয়ের মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁদের সংসারে নেমে আসে অন্ধকার।
স্বামী-স্ত্রীর স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন, সন্তানের সঙ্গে বাবার সম্পর্ক—কোনোটিই দীর্ঘদিন উপভোগ করার সুযোগ পাননি ফাতেমা ইসলাম সিমলা ও তাঁদের একমাত্র সন্তান মাইমুনা।
একজন স্ত্রী জানেন না তাঁর স্বামী কোথায়।
একটি সন্তান জানে না তার বাবা কোথায়।
আর একটি পরিবার জানে না—তাদের প্রিয় মানুষটি আদৌ কোনোদিন ফিরে আসবেন কি না।
‘দয়া করে সাইফুলের সন্ধান দিন’
নিখোঁজ হওয়ার পর সাইফুলের ছবি দিয়ে বিভিন্ন এলাকায় প্রচার চালানো হয়েছে। পরিবার ও স্বজনদের পক্ষ থেকে মানুষের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে—কেউ যদি তাঁর সন্ধান পান, তাহলে তাঁর বড় ভাই মো. জাহিদুল ইসলামকে জানানোর জন্য।
এই আবেদন শুধু একটি নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধানের আবেদন নয়; এটি একজন মেয়ের বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি, একজন স্ত্রীর স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আকুতি এবং একটি পরিবারের দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটানোর আকুতি।
ছয় বছর পরও অমীমাংসিত প্রশ্ন
সাইফুল ইসলামকে কারা নিয়ে গেল?
তাঁকে কেন নিয়ে যাওয়া হয়েছিল?
তিনি কোথায় আছেন?
তাঁকে কি কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পরিচয়ে আটক করা হয়েছিল?
যদি আটক করা হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা আইনি কার্যক্রম নেওয়া হয়েছিল কি?
আর যদি তিনি কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকেন, তাহলে তাঁকে প্রকাশ্য এলাকা থেকে তুলে নেওয়ার পর তাঁর পরিবারের কাছে কোনো তথ্য দেওয়া হলো না কেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আজও অমীমাংসিত।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও সাইফুলের নিখোঁজ হওয়ার প্রকৃত কারণ নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্যই চূড়ান্ত ভিত্তি হতে পারে।
সময় চলে যায়, অপেক্ষা শেষ হয় না
২০২০ সালের সেই দিনটির পর প্রায় ছয় বছর পেরিয়ে গেছে। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে গেছে। ছোট্ট মাইমুনা এখন স্কুলে পড়ে। তার বয়স বেড়েছে, পৃথিবী সম্পর্কে তার ধারণা বেড়েছে।
শুধু বদলায়নি একটি অপেক্ষা—
বাবা ফিরে আসার অপেক্ষা।
হয়তো মাইমুনা আজও মনে মনে ভাবে, একদিন তার বাবা ফিরে আসবেন। হয়তো কোনো এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে সে দেখবে—বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন তার বাবা।
সাইফুল ইসলামের পরিবারও সেই আশাটুকু আঁকড়ে বেঁচে আছে।
একজন নিখোঁজ মানুষের সন্ধান শুধু তাঁর পরিবারের অধিকার নয়; এটি মানবিক মর্যাদা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্নও।
তাই আজও পরিবারের আকুতি—
সাইফুল ইসলামের সন্ধান চাই।
তিনি কোথায়—সত্যটি জানতে চাই।
দীর্ঘ ছয় বছরের অপেক্ষার অবসান চাই।
আর ছোট্ট মাইমুনার একটাই চাওয়া—
‘আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন।’

