শীর্ষ খবর ডেস্ক
ছবি : সংগৃহীত
উৎসবপ্রিয় বাঙালির প্রতিটি আনন্দ-আয়োজনের সঙ্গে একসময় গভীর সম্পর্ক ছিল ব্যান্ডপার্টির। বিয়ে, পূজা-পার্বণের মতো পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে যাত্রাপালা, বাউলগান, ষাঁড়ের লড়াই কিংবা নৌকাবাইচ–যেকোনো আয়োজনকে প্রাণবন্ত করে তুলতে ব্যান্ডপার্টির কোনো বিকল্প ছিল না।
কিন্তু আধুনিকতার উত্তাপ, পরিবর্তিত সময় আর চারপাশের সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় বদলে গেছে উৎসবের ধরন। স্থবির হয়ে পড়েছে লোকসংস্কৃতির স্বাভাবিক গতি। আর এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে পড়েছে সেসব মানুষের ওপর, যারা আবহমান কাল ধরে মানুষের ঘরে ঘরে সুর আর আনন্দ ফেরি করে বেড়াতেন।
নিদারুণ অভাব আর কষ্টে অনেকে ঐতিহ্যবাহী এই পেশা আঁকড়ে রাখার আকুল সংগ্রাম করলেও, বেশির ভাগ শিল্পীই বেঁচে থাকার তাগিদে বাধ্য হচ্ছেন পেশা বদলাতে।
শিল্প-সংস্কৃতির জনপদ হিসেবে খ্যাত নেত্রকোনার ব্যান্ডপার্টির সুনাম ছিল দেশজুড়ে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে যাত্রাপালা, নাটক, শোভাযাত্রা, উরস, পূজা কিংবা বিয়ে-সুন্নতে খাতনার অনুষ্ঠান–সবখানেই ডাক পড়ত এখানকার বাদ্যযন্ত্রীদের। এই চাহিদাকে ঘিরে জেলা সদরের সাতপাই, পুকুরিয়া, পূর্বধলার কালডোয়ার, নারায়ণডহর, মোহনগঞ্জের মাঘান, দৌলতপুর, বারহাট্টার কাকুড়া, আটপাড়ার তেলিগাতি ও রামসিধসহ নানা গ্রামে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য ব্যান্ডপার্টি।
মাত্র এক দশক আগেও জেলায় অন্তত ৫০টি ব্যান্ডপার্টি সক্রিয় ছিল। ক্ল্যারিয়োনেট, স্যাক্সোফোন, ট্রামপেট, সানাই, অর্গান, বেসড্রাম, সাইডড্রাম, বেনজো, বোঙ্গো, ঝুনঝুনি, ঢাক আর ঢোলের তাল-ঝংকারে তারা মুখরিত করতেন সব অনুষ্ঠান। অন্তত ৩০০ বাদ্যযন্ত্রীর আয়ের ওপর নির্ভর করত দেড় হাজারের বেশি মানুষের অন্নসংস্থান। কিন্তু সেই জৌলুস এখন অতীত। এই শিল্পীদের কোনো সংগঠন তো দূরের কথা, প্রশাসন কিংবা কারও কাছে একটি তালিকাও নেই।
সুর ও ছন্দের এই কারিগরদের দুর্দশার সূচনা অবশ্য আজ নয়। নব্বইয়ের দশকে অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে যাত্রাশিল্পের ওপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে প্রথম বড় ধাক্কাটি আসে। কারণ, যাত্রাশিল্পের সঙ্গে ব্যান্ডপার্টির সম্পর্ক ছিল অঙ্গাঙ্গি। এরপর শিল্প-সংস্কৃতির বাধা হিসেবে সামনে আসে উগ্র জঙ্গিবাদী তৎপরতা।
তখনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির ছন্দপতন ঘটে। ২০২০ সালের করোনা মহামারিতে যখন সব ধরনের জনসমাগম ও অনুষ্ঠানাদি বন্ধ করে দেওয়া হয়–তখনো লম্বা সময়ের জন্য আবার বেকার হয়ে পড়েন তারা। সর্বশেষ ২০২৪ সাল ও পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক-সামাজিক অস্থিরতা, ‘মব কালচার’, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মাজারে হামলা এবং লোকসাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধার কারণে জন্ম নেওয়া আতঙ্ক উৎসবের কলেবরকে একবারে সংকুচিত করে ফেলে। তাই সুদিন আর ফেরেনি ব্যান্ডপার্টির। বাদ্যযন্ত্রীদের মতে, সমাজ শান্ত থাকলে মানুষ আনন্দে থাকে, উৎসব করে।
কিন্তু বিশৃঙ্খলা, গোঁড়ামি আর উগ্রতা বাড়লে মানুষ আগে উৎসবের আড়ম্বরই বর্জন করে। এদিকে প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় মানুষের রুচিরও পরিবর্তন ঘটছে। তরুণ প্রজন্ম ঝুঁকে পড়ছে সাউন্ডবক্স, ডিজে কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক বিনোদনে। এগুলোও বাদ্যযন্ত্রী বা লোকশিল্পীদের জীবিকা কেড়ে নিচ্ছে।
বাস্তবতার এই নির্মম চাকা যেন পিষে ধরছে বাদ্যযন্ত্রীদের জীবন। বারহাট্টার আব্দুর রহিম ক্ল্যারিয়োনেট বাজিয়ে একসময় মাতাতেন চারপাশ; কাজের অভাবে পেটের টানে তিনি এখন রিকশার হ্যান্ডেল ধরেছেন। একই অবস্থা ঠাকুরকোনার অর্গান বাদক হোসেন আলীর, যার দিন চলে ট্রলার চালিয়ে।
উত্তর সাতপাইয়ের নিধূ দাসের ড্রামসেটের ঝংকারে একসময় কেঁপে উঠত যাত্রামঞ্চ, তিনি আজ রিকশাচালক। বিয়ের আসরে আনন্দ ছড়ানো রমজান আলীর সানাইয়ের সুর থেমে গেছে, তিনি এখন সেলুনে চুল-দাড়ি কাটেন। একইভাবে সেলুনের কাজ ধরেছেন মালনী এলাকার ঢোলবাদক কাজল চন্দ্র শীল। মোহনগঞ্জের ক্ল্যারিয়োনেট বাদক এরশাদ খুলেছেন চায়ের দোকান, আর পুকুরিয়ার সাইডড্রাম শিল্পী কামাল চালাচ্ছেন ছোট্ট এক মুদিদোকান।
ক্ষোভ আর কষ্টে রমজান আলী বলেন, ‘শখ করে বাঁশি (অর্গান) বাজানো শিখেছিলাম। আগে মাসে ৮-১০ দিন কাজ পেতাম, দিনশেষে দেড়-দুই হাজার টাকা আয় হতো। এখন মাসে দুটি কাজও মেলে না। তাই বাধ্য হয়ে সেলুনের কাজ নিয়েছি।’ ড্রামার নিধূ দাসের গলায় একই আকুতি, ‘আগে ব্যান্ডপার্টি ছাড়া বিয়েই হতো না। এখন সবাই সাউন্ডবক্স বাজায়, না হয় ডিজে আর ব্যান্ড সংগীতের আয়োজন করে।
খুব বেশি শৌখিন লোক ছাড়া এখন আর আমাদের কেউ ডাকে না।’ শারদীয় দুর্গোৎসবে বছরের সবচেয়ে বড় আয়ের মুখ দেখতেন এসব শিল্পীরা। কিন্তু সেখানেও এখন কাটছাঁট হচ্ছে বলে জানান পূর্বধলার ক্ল্যারিয়োনেট বাদক শহীদ মিয়া। আর মোহনগঞ্জের আব্দুর রহমান, যিনি বাঁশি বাজিয়ে একসময় নিজের একটি ব্যান্ডপার্টি গড়ে তুলেছিলেন, করোনাকালে নামমাত্র দামে বাদ্যযন্ত্রগুলো বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। বুকভাঙা কষ্টে তিনি বলেন, ‘বাঁশি শিখে নিজে যে ভুল করেছি, চাই না সন্তানরাও সেই ভুল করুক।’
জানা গেছে, আগে বিভিন্ন উপজেলায় বিভিন্ন নামের ব্যান্ডপার্টি ছিল। পার্টিগুলোর নির্দিষ্ট পোশাক-আশাকও ছিল। গুণ ও মানের প্রশ্নে একধরনের প্রতিযোগিতাও ছিল তাদের মধ্যে। এখন দু-একটি পার্টির নাম থাকলেও সুসংগঠিত অবস্থায় নেই। যে যখন কাজ পায়, সে তখন চার-পাঁচজনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাৎক্ষণিক একটি দল গঠন করে অনুষ্ঠানে যায়। আর আয়োজকরা পোশাকসহ ব্যান্ডপার্টি চাইলে ময়মনসিংহ বা নেত্রকোনার দু-একটি দোকান থেকে ভাড়া করে নিয়ে আসে। অভাবের তাড়নায় বাদ্যযন্ত্র বেচে দিয়ে অনেকেই এখন রিকশা, ইজিবাইক কিংবা দোকানদারিতে নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছেন।
শিল্পীদের এই দুর্দিন নিয়ে জেলা শিল্পকলা একাডেমির কালচারাল অফিসার আতিকুর রহমান বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তি ও রুচির পরিবর্তনের কারণে অনেক ঐতিহ্যই আজ ম্লান। তবু আমরা চেষ্টা করি বড় কোনো সরকারি আয়োজন বা শোভাযাত্রায় ব্যান্ডপার্টিকে যুক্ত রাখতে। এছাড়া সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে যে শিল্পীভাতা দেওয়া হয়, অনেক ব্যান্ডপার্টি শিল্পী তা পাচ্ছেন। নতুন করে আরও কিছু আবেদন সংগ্রহ করা হয়েছে। এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে আরও কী ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা নিয়ে আমরা কাজ করছি।’













