• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

বিশেষ কলাম

নিজেদেরই হতে হবে ত্রাতা

প্রকাশ: শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৫ ৭:০১
আপডেট: শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি, ২০২৫ ৭:০১

নিজেদেরই হতে হবে ত্রাতা

মারুফ কামাল খান
বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো কমতি নেই। আমরা অভিযোগপ্রবণ জাতি। আমি নিজেও চাইলে একশ’ একটা অভিযোগ তুলতে পারি। আমরা তাদের কাছে আশা করেছিলাম অনেক বেশি। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত পাঁচ মাসের পারফর্মেন্স-এ সে আশা পূর্ণ হয় নি। আমরা মনে করি ‘বড়ো ভালো হতো আরো ভালো হলে।’
এখন সভা-সমিতির ঝাঁঝালো ভাষণে কান পাতলে, টিভির টকশো শুনলে, চায়ের কাপে তোলা ঝড়ের আওয়াজে মনযোগ দিলে, পত্রিকাগুলোর উপসম্পাদকীয় পড়লে দেখা যায়, শোনা যায় কেবলই আক্ষেপ। যার সার কথা, ‘এতো রক্ত দিয়ে পরিবর্তন এনে কী লাভ হলো?’ কেউ কেউ আবার এক কদম আগে বাড়িয়ে ঠারে-ঠোরে বলে দিচ্ছেন, ‘আগেই ভালো ছিল।’ সব মানা যায়, কিন্তু ‘আগেই ভালো ছিল’ শব্দগুচ্ছ শুনলেই মেজাজ তিরিক্কি হয়ে যায়। চোখ বুঝে বলে দেওয়া যায়, এরা পতিত ফ্যাসিস্ট রেজিমের দোসর কিংবা সুবিধাভোগী। তবে ওরা মিথ্যে কিন্তু বলছে না। আগে তো ভালোই ছিল ওরা। একমাত্র ওরাই ভালো ছিল দেশের সকলের ভালো কেড়ে নিয়ে।
আচ্ছা, এরা কি মানুষ? মানুষের তো একটু হলেও হায়া-শরম থাকে, চক্ষুলজ্জা থাকে। কিন্তু এদের তো চোখের কোনো পর্দাই নেই। পতিত ফ্যাসিবাদের পলাতক মক্ষীরাণী হাসিনা ও তার স্বজনগোষ্ঠী হতে শুরু করে লীগের ওয়ার্ড শাখার পাতি নেতাটি পর্যন্ত লুটপাট, দুর্নীতি, অনিয়ম ও চুরি-ডাকাতির মাধ্যমে দেশ-জনতার যে পরিমাণ সম্পদ করায়ত্ত ও বিদেশে পাচার করেছে তার বিভৎস ছবি তো এখন একটু একটু করে রোজ প্রকাশিত হচ্ছে। ওদের পালের গোদা হাসিনার পরিবার যে আপাদমস্তক একটা লুটেরা ও দুর্বৃত্ত পরিবার তা’ দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও ওদের শাগরেদ-চ্যালারা সমাজে মুখ দেখায় কী করে? ‘আগেই ভালো ছিল’ বলতে ওদের বুক কি একটুও কাঁপে না?
স্বাধীনতার পর মুজিবী দুঃশাসনে দেশে যখন শতাব্দির ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নেমেছে, লঙ্গরখানায় এক টুকরো শুকনো রুটির জন্য যখন কংকালসার শিশুরা শীর্ণ হাত বাড়িয়ে থাকতো, কাফনের কাপড় জোটাতে না পেরে কলাপাতা মুড়িয়ে যখন লাশ দাফন করতে হতো, তখন শেখ মুজিব তার পারিবারিক সব বিলাসবহুল উৎসবের ফাঁকে আবেগঘন কণ্ঠে বলতেন, ‘বাংলার মানুষকে আমি বড় ভালোবাসি!’ একই ভাবে সম্পদ ও ক্ষমতার প্রকট লোভী হাসিনার নিকটাত্মীয়রা যখন তার প্রশ্রয় ও অনুমোদনে দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদের পর্বত তৈরি করছিল তখন হাসিনাও তার ব্যাঙ্গাত্মক ক্রুর হাসি চেপে স্তাবকদের শোনাতেন, ‘আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আমি দেশের মানুষকে কিছু দিতে এসেছি।’ এমনই জালিয়াত, প্রতারক ও অভিনয়-পটু এই পরিবার আগাগোড়া মানুষের আবেগ নিয়ে খেলে দেশটার সাড়ে সর্বনাশ করে ছেড়েছে। এখনো ওরা অন্যদের সমালোচনা করে এবং কেঁদেকেটে আরেকবার সুযোগ চায় দেশ লুট করার, ফ্যাসিবাদী রেজিম পুনঃস্থাপনের।
কতো নিরপরাধ মানুষ যে হত্যা করেছে হাসিনা তার সাড়ে পনেরো বছরের জালিমী শাসনে তার কোনো লেখাজোখা নেই। ছাত্রগণঅভ্যুত্থান দমাতে ‘চব্বিশের জুলাই-আগস্টেই নারী ও শিশুসহ দুই হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে তার হুকুমে। ভিন্নমতের মানুষদের অপহরণ-গুম-খুন, গেস্টাপো কায়দায় পৈশাচিক নির্যাতনের কুখ্যাত গুপ্তকারা ‘আয়নাঘর’ স্থাপন, মিথ্যা ও কল্পিত অভিযোগে গায়েবি মামলায় বিরোধী দলের লাখ লাখ নেতা-কর্মীকে কারাগারে নিক্ষেপ, তাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য-চাকরি সহ সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা এবং ভিন্নমত প্রচারের সব অধিকার রহিত করার মাধ্যমে হাসিনা এই রাষ্ট্রকে মধ্যযুগীয় এক সামন্তশাসনে ঠেলে দিয়েছিলেন।
ক্ষমতা করায়ত্ত করার আগে হাসিনা মানুষের ‘ভোট ও ভাতের অধিকার’ প্রতিষ্ঠার নামে নৈরাজ্যকর ও বিধ্বংসী আন্দোলনের নজির স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর তিনি মানুষের ভোটের অধিকার হরণ করে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করেন। জিনিসপত্রের দাম বাড়তে বাড়তে তার শাসনে আকাশ ছুঁলেও প্রতিবাদ করার কোনো জো ছিল না। আর এখন তার বশংবদেরা দ্রব্যমূল্য নিয়ে কোন মুখে কথা বলে? মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া এই ফ্যাসিবাদীদের নির্বাচনে জনগণের ভোট চাইবার কোনো অধিকার কি আদপেই আছে? এই যে হাসিনার ফ্যাসিবাদী রেজিমের যৎকিঞ্চিত নমুনা তুলে ধরলাম, এখন দেশে কি সে অবস্থা আছে? ড. ইউনূসের সরকার প্রত্যাশিত ভালো হয়তো করতে পারছে না কিন্তু হাসিনার শাসনকালের ভয়াবহ অন্যায়-অনাচারগুলো থেকে তো অন্ততঃ বিরত আছে। এটাই বা কম কিসে? এখান থেকে আগের বিভৎসতায় ফিরে যাবার কথা কোনো সুস্থ মানুষ কি ভাবতে পারে?
আওয়ামী ফ্যাসিবাদের একটি পুরনো অস্ত্র হচ্ছে মিথ্যার তুবড়ি ছোটানো, অপপ্রচার ও ইতিহাসের বিকৃতি। যে-কোনো তথ্যকে চোখের পলকে মুচড়ে অন্য আদল দিয়ে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ও নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে ওদের জুড়ি মেলা ভার। মানুষের জীবনবিনাশী আন্দোলনে ক্ষমতার মসনদ থেকে বিতাড়িত হবার পর হাতে গোণা কয়েক মাস না পেরুতেই ওরা আবার সেই পুরনো অপকৌশল নিয়ে মাঠে নামার পাঁয়তারা করছে। মুজিব ও হাসিনা উভয়েই তাদের ক্ষমতার জন্য কত মানুষকে যে উস্কে দিয়ে আত্মাহুতির পথে ঠেলে দিয়েছেন তার ইন্তেহা নেই। কিন্তু কখনো কারো বিপদে তারা পাশে দাঁড়ান নি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে মুজিব দেশবাসীকে হানাদার বাহিনীর কামানের গোলার সামনে অরক্ষিত রেখে নিজে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানে চলে গিয়েছিলেন। হাসিনাও বিপদ দেখলেই বারবার নিজে পালিয়ে আত্মরক্ষা করেছেন। হাসিনা প্রায়ই বলতেন, ‘প্রয়োজনে বাবার মতো বুকের রক্ত দিয়ে দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করবো।’ নিজেকে সাহসী এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাপুরুষ প্রমাণ করতে হাসিনা হরেক রকম গল্প ফাঁদতেন, কথামালা সাজাতেন। কিন্তু বাস্তবে জনগণ তার ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করা মাত্র এক আত্মপ্রেমী ভীতু নারী নিজের প্রাণ বাঁচাতে ইন্ডিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নিলেন। ক্ষমতা ছেড়ে নিজের দেশে থেকে জেল ও মামলা মোকাবিলার সাহসশূন্য হাসিনা কি আর কখনো এদেশে রাজনীতি করার অধিকার রাখেন?
হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমে হত্যা-পীড়ন, দখল, দলীয়করণ, বিচারহীনতা তো ছিলই তার ওপর ছিল অসম্মান ও মানসিক অত্যাচার। শাসক দলের বাইরে সব নাগরিককে হাসিনা অধিকার-বঞ্চিত দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিকে অধঃপতিত করেছিলেন। কোথাও সামান্য একটু প্রতিবাদ হলেই হাসিনা দেশের নাগরিকদের গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি সহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি এমন ভাবে দিতেন যেন এগুলো তার পৈত্রিক সম্পত্তি। যখন তখন যাকে তাকে অপমান করে বলতেন, “এদেশ আমার। আমার বাবা এদেশ স্বাধীন করেছেন।” বিপুল প্রাণের বিনিময়ে সাধারণ মানুষ যুদ্ধ করে যে স্বাধীনতা এনেছে সেই স্বাধীনতাকে হাসিনা তার বাবার অর্জন বলে জাহির করতেন। জাতির কাছে যে মুজিবের কৃতজ্ঞ থাকার কথা সেই মুজিবের কাছে জাতিকে কৃতজ্ঞ থাকতে বলতেন হাসিনা। এমন উদ্ধত ও গণবিরোধী মানসিকতার কাউকে কি গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুযোগ দেওয়া উচিত?
মেঘে মেঘে বেলা তো কম হোলো না। বাংলাদেশের বয়স ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ দশক ছুঁয়েছে। জাতি হিসেবে আমাদের আবেগ থিতিয়ে এখন অনেকটাই সাবালক হবার কথা। কারো উস্কানিতে নয়, নিজেদের ভালোটা এখন খুব ঠান্ডা মাথায় নিজেদেরই বুঝে নেওয়ার সময়। আমাদের দেশের সর্বস্তরের মানুষ ফ্যাসিবাদের লেলিয়ে দেওয়া ঘাতকের মারণাস্ত্রের সামনে তাদের সাহসী তরুণ সন্তানদের বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে দেখে, গোলাপের মতো রক্ত ঝরিয়ে তাদেরকে একের পর এক নৃশংস ভাবে হত্যা করতে দেখে ফুঁসে উঠেছিলেন। কোনো বিদেশী পরাশক্তি এসে এখানে দুর্বিনীত খুনি স্বৈরতন্ত্রকে উৎখাত করেনি। কোনো রাজনৈতিক দলের মুখ পানে চেয়ে তারা বসে থাকে নি। মানুষ দৃপ্ত শপথে বলীয়ান হয়ে যখন নিজেরাই নিজেদেরকে রক্ষা করতে সন্মিলিতভাবে রাজপথে নেমে এসেছে তখনই ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়ে পালিয়ে গেছে।
দুঃশাসনের রেজিম বিতাড়নের পর এদেশের সাধারণ মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখেছে এখন রাজনীতি সুন্দর হবে, গণতন্ত্রের পথ মসৃণ হবে, দেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, মানুষ সব অধিকার ফিরে পাবে, অন্যায় অপরাধের বিচার হবে, সাধারণের ভাগ্য বদলাবে। এইসব স্বপ্ন স্বয়ংক্রিয় ভাবে বাস্তবায়িত না হলে হতাশায় মুষড়ে পড়লে চলবে না। কারো খেয়ালখুশির ওপর সবকিছু সঁপে না দিয়ে নিজেদের ভাগ্য নিজেদেরকেই বদলাতে হবে। অধিকারগুলো আদায় করতে হবে। জনগণ যখন যা যেমন করে চায় তাতেই সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে সন্মত হতে বাধ্য করতে হবে। যে জনগণ কারো খেলার ঘুঁটি হয় তাদের মুক্তি নেই। জনগণের সাহসী সংগ্রামে যে পরিবর্তন এসেছে, সে পরিবর্তনকে তাদের জীবনে তাদেরকেই অর্থবহ করে তুলতে হবে। কোনো ত্রাতা এসে আমাদেরকে ত্রাণ করে দিয়ে যাবে না। তাই কারো কাছে নয় ত্রাণের প্রার্থনা। তরিতে পারার শক্তি নিজে অর্জন করতে হবে। নিজেদের ভেতরে অসম্ভবকে সম্ভব করার যে প্রবল আত্মশক্তি লুকিয়ে আছে, আজ হোক সেই শক্তির বোধন।
মারুফ কামাল খান : সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক।
ই-মেইল : mrfshl@gmail.com


সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ


সম্পাদক: আব্দুল আজিজ

উপদেষ্টা সম্পাদক: সায়েক এম রহমান
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: রাশেদুর রহমান (রকেস )
পরিচালক: মোঃ দেলোয়ার হোসেন আহাদ

ইংলান্ড অফিস: 13 Wimpole Court, Wimpole Street, Portsmouth, PO1 1QT, United Kingdom
বাংলাদেশ অফিস: রুম-১৪০৫ (লিফট-১৩), শাহ আলি প্লাজা, মিরপুর ১০, ঢাকা-১২১৬
ই-মেইল: sheershakhoboronline@gmail.com


WP2Social Auto Publish Powered By : XYZScripts.com