• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

গতানুগতিক নির্বাচন বনাম আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব: একটি সমাধানের খোঁজে

প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই, ২০২৫ ৪:১৮
আপডেট: বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই, ২০২৫ ৪:১৮

গতানুগতিক নির্বাচন বনাম আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব: একটি সমাধানের খোঁজে

ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ

প্রাককথন

বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলে আসছে। প্রচলিত একক সংখ্যাগরিষ্ঠ (FPTP) পদ্ধতি এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (PR) পদ্ধতির প্রতিটিরই নিজস্ব সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে এই দুই প্রক্রিয়ার কোনোটিই জনগণের সার্বিক মতামতের যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করতে এককভাবে সক্ষম নয়। এই প্রেক্ষাপটে, আমি দ্বি-দফা ভোটিং পদ্ধতির একটি বাস্তবভিত্তিক প্রস্তাব তুলে ধরছি, যার মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিত্ব ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার মধ্যে একটি ভারসাম্য রচনা সম্ভব।

প্রচলিত পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা

১. অপচয়িত ভোটের সমস্যা: FPTP পদ্ধতিতে বিজয়ী ছাড়া বাকি সব প্রার্থীর ভোট কার্যত মূল্যহীন হয়ে যায়। এতে করে বহু ভোটারের মতামত সংসদে প্রতিফলিত হয় না।

২. ক্ষুদ্র দলগুলোর সংকট: উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও ছোট দলগুলো আসন পায় না, ফলে তারা নীতিনির্ধারণ থেকে বাদ পড়ে যায়।

৩. অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিনিধিত্ব: একটি দল জাতীয়ভাবে জনপ্রিয় হলেও নির্দিষ্ট নির্বাচনী এলাকার বৈষম্যের কারণে সংসদে কম আসন পেতে পারে।

আনুপাতিক পদ্ধতির চ্যালেঞ্জ

১. রাজনৈতিক অস্থিরতা: PR পদ্ধতিতে প্রায়শই জোট সরকার গঠন হয়, যা সিদ্ধান্তগ্রহণকে জটিল করে তোলে। ইসরায়েল ও ইতালির অভিজ্ঞতা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

২. স্থানীয় প্রতিনিধিত্বের দুর্বলতা: দলীয় তালিকার ভিত্তিতে নির্বাচন হলে ভোটারদের সাথে প্রার্থীর প্রত্যক্ষ সম্পর্ক ক্ষীণ হয়।

৩. জটিল প্রক্রিয়া: ভোট গণনা এবং আসন বণ্টনের পদ্ধতি (যেমন: ড’হন্ড্ট, সেন্ট-লাগু ইত্যাদি) অধিকাংশ ভোটারের কাছে দুর্বোধ্য।

সমাধান: দ্বি-দফা ভোটিং পদ্ধতির প্রস্তাব

প্রস্তাবিত মডেল অনুযায়ী, নির্বাচন হবে দুটি ধাপে:

১. প্রথম দফা: প্রচলিত FPTP বা PR পদ্ধতিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

২. দ্বিতীয় দফা: যদি কোনো দল বা প্রার্থী ৫০% এর বেশি ভোট বা আসন না পায়, তবে শীর্ষ দুই দল/প্রার্থীর মধ্যে রান-অফ ভোটিং হবে।

এই পদ্ধতির মূল সুবিধাসমূহ:

১. জনগণের প্রকৃত মতামতের প্রতিফলন: দ্বিতীয় দফার মাধ্যমে ভোটাররা আরও পরিণত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কৌশলগত ভোট কমে যায়।

২. বৈধতার ভিত্তি মজবুত হয়: বিজয়ী প্রার্থী নিশ্চিতভাবে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রতিনিধিত্ব করেন।

৩. স্থিতিশীলতা ও ন্যায্যতার সমন্বয়: PR-এর ন্যায্যতা এবং FPTP-এর স্থিতিশীলতা—দুইয়ের সুফল একসঙ্গে পাওয়া সম্ভব।

আন্তর্জাতিক প্রয়োগ ও উদাহরণ

১. ফ্রান্স: রাষ্ট্রপতি ও আইনসভা নির্বাচনে রান-অফ পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২. ভারত: কিছু রাজ্যে নির্দিষ্ট নির্বাচনে আংশিকভাবে এই মডেল অনুসরণ করা হয়েছে।

৩. চিলি, কলম্বিয়া ও উরুগুয়ে: এই লাতিন আমেরিকান দেশগুলোতে দ্বি-দফা নির্বাচন জনপ্রিয় ও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের মাধ্যমে প্রকৃত জনপ্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হলে আমাদের প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে চিন্তা করতে হবে। দ্বি-দফা ভোটিং পদ্ধতি এমন একটি বাস্তবসম্মত সমাধান, যা রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে এনে স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও সমবয়সি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে।

“নির্বাচন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; এটি হওয়া উচিত জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নির্ভরযোগ্য প্রতিফলন।”—

ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ
ও সমাজ-চিন্তক