• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

মতামত

উপমহাদেশে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা উদ্বিগ্নতা ও তারেক রহমানের দেশে ফেরা

প্রকাশ: শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ ৩:৫২
আপডেট: শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ ৩:৫২

উপমহাদেশে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা উদ্বিগ্নতা ও তারেক রহমানের দেশে ফেরা

ব‍্যারিস্টার নাজির আহমদ

উপমহাদেশে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতারা কত যে অনিরাপদ তা কয়েকটি উদাহরণ থেকে স্পষ্ট বোঝা যাবে। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি নয়া দিল্লিতে ‘বিড়লা ভবন’ এর মাঠে এক অনশনকালে নথুরাম গডসে নামক এক হিন্দুমহাসভার এক চরমপন্থীর গুলি ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীর প্রাণ কেড়ে নেয়। এর অনেক পর ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে ফুল দিতে গিয়ে আত্মঘাতী হামলা চালানো হয়। যার ফলশ্রুতিতে রাজীব গান্ধী নিহত হলেন। রাজীব গান্ধীর মাতা ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকেও তার দুই দেহরক্ষী একেবারে সামনে থেকে ৩০টিরও বেশি গুলি ছুড়ে হত্যা করে।

অপরদিকে ১৯৫১ সালে ১৬ অক্টোবর রাওয়ালাপিন্ডির পৌরসভা পার্কের এক সভায় পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেয়ার কথা ছিল। ঐ সভায় মঞ্চ থেকে মাত্র ১৫ গজ দূরে উপবিষ্ট থাকা সাদ আকবর নামক এক আততায়ী তাকে গুলি করে। লিয়াকত আলী খানের বুকে দুটি গুলি লেগেছিল। তিনি নিহত হন। তাকে হত্যার কারণ এখনও রহস্যাবৃত। পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে বিরোধী দলের নেতা থাকাকালীন প্রকাশ্য রাজনৈতিক জনসভায় বক্তৃতারত অবস্থায় গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।

শুধু উন্নয়নশীল বা তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বের দেশের নেতারাই নন, বরং উন্নত দেশেও জনপ্রিয় নেতাদেরও নিরাপত্তা উদ্বিগ্নতা আছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিরোধী দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনি প্রচারণার এক জনসভায় বক্তৃতারত অবস্থায় গুলি করে তাকে মেরেই ফেলেছিল প্রায়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছেন। শুধু তাই নয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জেএফ কেনেডিও প্রেসিডেন্ট থাকাকালে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। যার রহস্য এখনো উদঘাটিত হয়নি।

মুসলমানদের তীর্থভূমি মক্কা ও মদিনা যে দেশে অবস্থিত সে দেশের বাদশাহও তো নিকটাত্মীয় দ্বারা নিহত হন। ১৯৭৫ সালের ২৫ মার্চ সৌদি আরবের তৎকালীন বাদশাহ ফয়সল তার ভাতিজা ফয়সল বিন মুসাইদকে অভ্যর্থনার জন্য এগিয়ে যান। যখন রীতি মেনে ভাইপোকে চুম্বনের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানাতে যাবেন, ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটে। নিজের পকেট থেকে হঠাৎ বন্দুক বের করেন তার ভাতিজা, বাদশাহ ফয়সলকে লক্ষ্য করে তিনবার গুলি চালান তিনি এবং তাতে বাদশাহ ফয়সল নিহত হন।

বাংলাদেশেও তো দুই দুইজন সাবেক রাষ্ট্রপতি ক্ষমতায় থাকাকালীন অবস্থায় নিহত হন। কাদের দ্বারা নিহত হন তা তো জাতির কাছে স্পষ্ট। পতিত সরকার প্রধান শেখ হাসিনাও তো ২০০৪ সালের ২১ আগস্টে নিহত হয়ে গিয়েছিলেন প্রায়। অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। যদিও ঐ সময় হাল আমলের মতো এতো অজনপ্রিয় ছিলেন না তিনি।

তারেক রহমান উপমহাদেশের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক দল ও বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক এবং জনপ্রিয় দলের কার্যত প্রধান ব‍্যক্তি। তাঁর দল তো বটেই, বাংলাদেশের মধ‍্যে অসম্ভব জনপ্রিয় নেতা তিনি। তাঁর অনুপস্থিতি তাঁর জনপ্রিয়তাকে অনন‍্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তাঁর দল নির্বাচনে জয়ী হলে তিনিই হবেন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।

তারেক রহমান জিয়া পরিবারের লিগ‍্যাসি বহনকারী আমাদের প্রজন্মের সর্বশেষ ব‍্যক্তি, জিয়া বংশের চেরাগ। তিনিই বর্তমান বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে একমাত্র সৌভাগ্যবান ব‍্যক্তি যাঁর পিতা ছিলেন রাষ্ট্রপতি, মাতা ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। নিশ্চয়ই তাঁর নিরাপত্তার ব‍্যাপারটি সর্বোচ্চ বিবেচনার দাবি রাখে তাঁর দলের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে এবং আগামীর বাংলাদেশের স্বার্থে।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হননি। দেশের সবকিছুর উপর এবং সব বিভাগের উপর তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টত পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এখনও পতিত সরকার কর্তৃক গণঅভ্যুত্থান ঠেকানোর নামে তাদের দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে দেয়া মারাত্মক বিধ্বংসী অস্ত্রগুলো (যেমন AK-47, এসএমজি, lethal weapon, গ্রেনেড ইত্যাদি) উদ্ধার করা যায়নি।

তাছাড়া তারেক রহমানকে যারা নির্মমভাবে নিপীড়ন ও নির্যাতন করেছিল ঐ সময়ে মাঠ পর্যায়ের বা জুনিয়র পর্যায়ের কর্মকর্তা হলেও হাল আমলে তারা অনেক উঁচু ও প্রভাবশালী পদে ও অবস্থানে আছেন বা রয়েছেন। এছাড়া তাঁকে নিয়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রও তো একবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না।

সবকিছু মিলিয়ে তারেক রহমানের নিরাপত্তা উদ্বিগ্নতা স‍ত‍্যিই বাস্তব ও যৌক্তিক। সুতরাং এ নিয়ে না বুঝে, অতি আবেগী হয়ে, শুধু বিরোধিতার কারণে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় হালকা বা তীর্যক মন্তব্য করা ঠিক নয়। তাঁর মাতা বাংলাদেশের একাধিক বারের প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়া আজ গুরুতর অসুস্থ। যে কোনো সন্তানই এই সময় মায়ের পাশে যাবেন ও থাকবেন – এটা স্বাভাবিক। তারেক রহমান যেতেন ও থাকতেন। তবে তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টি এখন আর শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বা তাঁর পারিবারিক বিষয় নয়। এ ব্যাপারটির সাথে জড়িয়ে আছে আগামীর বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের নেতৃত্ব।

তারেক রহমান অবশ্যই দেশে যাবেন, তাঁকে যেতেই হবে। তাকে তাঁর দলের হাল ধরতে হবে। তাঁর বিশাল দলে তাঁর বিকল্প আর কেউ নেই। তবে তাঁর আসার আগে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে শতভাগ সরকারকে ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্র চিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

ইমেইল: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk