• যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত
  • জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • sheershakhoboronline@gmail.com

নির্বাচন

কক্সবাজার-১: সালাহউদ্দিনে উদ্দীপ্ত বিএনপি, মাঠে সরব জামায়াতও

প্রকাশ: শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৬:৪৪
আপডেট: শনিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ ৬:৪৪

কক্সবাজার-১: সালাহউদ্দিনে উদ্দীপ্ত বিএনপি, মাঠে সরব জামায়াতও

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনটি নির্বাচনি প্রচারে এখন মুখর। প্রতিদিনই পথসভা, উঠান বৈঠক এবং ঘরে ঘরে ভোটারদের সঙ্গে মতবিনিময় হচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক উভয়েই মাঠে সক্রিয়।

গত ফেব্রুয়ারি থেকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাঠে আছেন। করেছেন বড় ধরনের শোডাউনও। এ কারণে ভোটারদের কাছে নির্বাচনি প্রচারণা একপেশে মনে হচ্ছিল। এই দীর্ঘ সময় ধরে দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনের কারণে সালাউদ্দিন আহমদ মাঠে ছিলেন না। সম্প্রতি তিনি মাঠে নামার পর বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা উদ্দীপ্ত হয়ে উঠেছেন। তাদের সরব উপস্থিতি ভোটের মাঠকে গরম করে তুলেছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ প্রার্থী হওয়ার পর প্রথমবারের মতো বেশ কয়েক দিন চকরিয়া ও পেকুয়ার প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে গণসংযোগ চালিয়েছেন। তিনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা এবং তরুণদের সঙ্গে কথা বলেছেন, অভিযোগ শুনেছেন এবং নিজের হাতে সমস্যার তালিকা নোট করে নিয়েছেন। তার প্রচারে নারী ভোটারদের জন্য একাধিক মহিলা সমাবেশের আয়োজন হয়েছে।

চকরিয়া ও পেকুয়ায় বিএনপির সহযোগী ৯টি সংগঠনের নেতা-কর্মীরা ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড কমিটি গঠন করেছেন। বেশির ভাগ সংগঠন তাদের কমিটি ঘোষণা করেছে কাউন্সিল বা সম্মেলনের মাধ্যমে, যা নির্বাচনি প্রস্তুতির বলা যায়। প্রচারেও এসেছে গতি।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি গঠন করা হলেও তারা কাউন্সিল বা সম্মেলন করেনি। সংগঠনটি মূলত ভেতরে-ভেতরে কাজ করছে। ছাত্রশিবির ও মহিলা জামায়াত বিভিন্ন কমিটি গঠন করে এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। তাদের অধিকাংশ কার্যক্রম গোপনে পরিচালিত হচ্ছে।

পেকুয়ার রিয়াদ নামের এক সিএনজি অটোরিকশা চালক খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগ সমর্থক। ভোট দেব না ভেবেছিলাম। কিন্তু সালাহউদ্দিন আহমদকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি থাকলে উন্নয়ন হবে। আমার মা-বাবার কাছ থেকে শুনেছি, তিনি মন্ত্রী থাকতে অনেক উন্নয়ন করেছিলেন।

সালাহউদ্দিনের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি
নির্বাচনি মাঠে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি। উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতিগুলো হচ্ছে- মাতামুহুরি নামে নতুন উপজেলা গঠন, বদরখালী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণ, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ, মাতামুহুরি নদীর ওপর নতুন সেতু ও একটি মন্দির নির্মাণ, রিজার্ভ এলাকাবাসীদের বন্দোবস্ত প্রদান, লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, মৎস্যজীবীদের হয়রানি বন্ধ, বদরখালী–মগনামা-রাজাখালী এলাকায় খাতুনগঞ্জ ধরনের ব্যবসায়িক কেন্দ্র স্থাপন, চকরিয়া-পেকুয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। এছাড়া তার কাজের অগ্রাধিকারের মধ্যে আছে বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান, কৃষি ও ফ্যামিলি কার্ড প্রদান, চিকিৎসা সুবিধা ইত্যাদি। তার দেওয়া এসব প্রতিশ্রুতির কথা এখন চায়ের দোকান থেকে পাড়ার আড্ডা– সর্বত্রই ভোটারদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। জনগণের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠছেন তিনি।

জামায়াতের প্রচারণা
জামায়াতের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুকও প্রতিদিন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। সামাজিক আয়োজন এবং ফ্রি চিকিৎসা ক্যাম্পের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন। বিশেষ করে মহিলা ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর জন্য মহিলা দলের কর্মীদের ব্যবহার করছেন। শিক্ষার্থী ও সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করছেন।

এলাকার সচেতন লোকজন বলছেন, কেন্দ্রীয় ও প্রভাবশালী নেতা হওয়ায় সালাহউদ্দিন আহমদ নির্বাচনি প্রচারে কম সময় পাচ্ছেন। জামায়াতের প্রার্থী এই সুযোগকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন।

পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে সালাহউদ্দিন আহমদ চকরিয়া ও পেকুয়ার স্কুল, কলেজ, স্টেডিয়াম, রাস্তা ও ব্রিজের ব্যাপক উন্নয়ন করেছিলেন। বিশেষ করে পেকুয়া থেকে সরাসরি বাঁশখালী যাওয়ার নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং মহেশখালী-চট্টগ্রামের দূরত্ব ৫০ কিলোমিটার কমিয়ে আনেন। তখন তিনি পেকুয়া নামে নতুন উপজেলাও করেন।
চকরিয়ার জামায়াত নেতা হাফেজ মোহাম্মদ কলিম উল্লাহ বলেন, ‘আমরা ন্যায় ও ইনসাফের রাজনীতি চাই। আমাদের প্রার্থী নির্বাচিত হলে ইউনিয়ন ভিত্তিতে গরিবদের জন্য জাকাত বিতরণ করা হবে।’

পেকুয়ার আরেক জামায়াত নেতা মোহাম্মদ ইলিয়াছ বলেন, ‘আমাদের প্রার্থী বেকারত্ব কমাবেন, লবণের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করবেন, শিক্ষার্থীদের চাকরির ব্যবস্থা করবেন এবং দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার জন্য কাজ করবেন।’

চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান জালাল আহমদ শিকদার জানিয়েছেন, তারা উঠান বৈঠক ও ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাচ্ছেন এবং তাদের বিশ্বাস বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদ নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়ী হবেন।

প্রচার কৌশল
নির্বাচনি প্রচারণায় লিঙ্গভিত্তিক তৎপরতা লক্ষ করা গেছে। পুরুষদের ক্ষেত্রে বিএনপি সবচেয়ে সক্রিয়, মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন দলের নেতা-কর্মীরা। অন্যদিকে জামায়াতের মহিলা কর্মীরা সক্রিয়। তারা প্রতিটি পাড়ায় গ্রুপভিত্তিতে কাজ করছে। বিশেষ কৌশল হিসেবে স্থানীয় মহিলাদের নিযুক্ত করছে। বাইরের কেউ ওই এলাকায় সরাসরি কাজ না করায় তারা তাদের কার্যক্রমে গোপনীয়তা রক্ষা করছে।

রাজুর বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার
পেকুয়ার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজুর বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার করার পর সালাহউদ্দিন ও রাজুর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে। এখন রাজু বিএনপির জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন।
উল্লেখ্য, এই আসনে ১৯৯১ সালে জামায়াতের এনামুল হক মনজুর নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ধানের শীষ প্রতীকে এমপি হন বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও তিনি নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালে নির্বাচিত হন তার স্ত্রী অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমদ। ২০১৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ ইলিয়াস, ২০১৮ সালে আওয়ামী লীগের জাফর আলম নির্বাচিত হন।

এই আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন ড. মাইমুল আহসান খান। তিনি একজন শিক্ষিত, শান্ত স্বভাবের মানুষ। পেশাগত জীবনে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী ব্যক্তি। তবে মনোনয়ন পাওয়ার পর এখনো তিনি এলাকায় আসেননি।

স্থানীয়দের মতে, ড. মাইমুল এলাকার রাজনীতিতে নতুন মুখ হওয়ায় তার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বজায় রাখা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামের প্রার্থীদের বিপরীতে ভালো কিছু করা সহজ হবে না বলে মনে করছেন সাধারণ ভোটাররা।

অনেক ভোটার বলছেন, তিনি শিক্ষিত ও ভালো মানুষ, কিন্তু নির্বাচনে জেতার জন্য মাঠে নামা, ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া, এসব গুরুত্বপূর্ণ ধাপ তিনি এখনো শুরু করেননি। ফলে বড় দুই দলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া তার জন্য কঠিন হবে।

অনেক ভোটার মনে করেন, শিক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মানুষ রাজনীতিতে আসা ইতিবাচক দিক এবং তিনি যদি এলাকায় এসে সক্রিয় প্রচার শুরু করেন, তাহলে নতুন প্রজন্মের কিছু ভোট তিনি পেতে পারেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আলহাজ সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে এলাকার এমন উন্নয়ন করবেন যা সাধারণ মানুষ কল্পনাও করতে পারবেন না। তিনি জানান, বেকারদের জন্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি তার প্রধান অঙ্গীকার। অতীতে এই আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি কাজের মাধ্যমে কতটা উন্নয়ন করেছেন তা প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ভোটাররা ভালোভাবেই জানেন, তিনি নির্বাচিত হলে কী করতে পারবেন। তার মতে, নেতৃত্বের যোগ্যতাই প্রধান। যে নেতা কাজ করেন তিনিই যোগ্য নেতা।

জামায়াত প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক বলেছেন, ‘মাঠে-ময়দানে আমরা ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটাররা এবার আমাদের পক্ষে একাট্টা হয়েছে।

আমরা নির্বাচিত হলে সবাইকে নিয়ে চকরিয়া-পেকুয়ার উন্নয়নের জন্য কাজ করব। কর্মসংস্থান তৈরি ও বেকারত্ব দূরীকরণের জন্য আমি পরিকল্পিতভাবে কাজ করব।

সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসামুক্ত সম্প্রীতির চকরিয়া-পেকুয়া প্রতিষ্ঠাই আমাদের মূল লক্ষ্য।’