জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের তদন্তে শিগগিরই ‘দৃশ্যমান অগ্রগতি’ দেখা যাবে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সব মামলার বিচারকাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়াসহ সাত দফা দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রতিনিধিদল।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের কাছে এই স্মারকলিপি জমা দেন ১১ দলীয় জোটের নেতারা।
এ সময় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের নেতৃত্বে, সাংসদ রোকেয়া বেগম, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদসহ জোটের শীর্ষ নেতা এবং জুলাই আন্দোলনে নিহতের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
স্মারকলিপিতে দেওয়া ৭ দফা দাবি তুলে ধরে জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর মানুষের মধ্যে একটি পারসেপশন তৈরি হয়েছে যে, বিচারের গতিটা ধীর হয়ে গেছে। আমরা আশা করি, আপনারা জনগণকে সেই আস্থা দেবেন। আমাদের মূল ফোকাস হচ্ছে জুলাই গণহত্যা।
জোটের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, বাড্ডা, মিরপুর ১০, পল্টন ও মোহাম্মদপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত গণহত্যার দ্রুত তদন্ত। হত্যায় অভিযুক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দ্রুত গ্রেফতার। ঢাকার বাইরে ৬১টি জেলায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা। আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের যেসব নেতা রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন, তাদের গ্রেফতার করা, সাক্ষীদের নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিতে পারা।
গণহত্যায় উসকানিদাতা ও অপপ্রচারকারীদের আইনের আওতায় আনা।
গুম-খুন এবং মরদেহ পোড়ানোর সঙ্গে জড়িত ডিজিএফআই, এনএসআইসহ সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করা এবং গুম সংক্রান্ত মামলাগুলোর ধীরগতি দূর করা এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মূলহোতারা বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। সরকার তার প্রত্যাবর্তনের জন্য চিঠি পাঠানোর কথা বলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু চিঠি পাঠানোর মধ্যেই যেন কার্যক্রম সীমাবদ্ধ না থাকে। ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতে হাজির করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার এমনভাবে সম্পন্ন করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদের পথ স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে আইনের কোনো দুর্বলতা বা ফাঁক রাখা যাবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ সময় আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জনবল ও বাজেট সংকট সমাধানের দাবি জানান। তিনি বলেন, চিফ প্রসিকিউটরকে দ্রুত বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার কথা বারবার বলা হচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও সম্পদ দেওয়া হচ্ছে না। স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়ের উচিত ট্রাইব্যুনালে পর্যাপ্ত প্রসিকিউটর, ইনভেস্টিগেটর নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় রিসোর্স বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
মতবিনিময় সভায় বিচার কার্যক্রমের অগ্রগতি তুলে ধরে চিফ প্রসিকিউটর জানান, ইতোমধ্যে আবু সাঈদ হত্যা মামলা, রামপুরা এবং হাসানুল হক ইনুর ঘটনায় দায়ের করা মামলাসহ তিনটি মামলার জাজমেন্ট (রায়/সিদ্ধান্ত) সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ওবায়দুল কাদের, মাহবুব উল আলম হানিফ, জিয়াউল হাসান এবং শহীদ জাবেরের মামলাসহ আরও চারটি মামলার জাজমেন্ট আগামী মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে।
জুলাইয়ের ঘটনাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ট্রাইব্যুনালে জমা পড়া ৫৯০টি অভিযোগের মধ্যে ১০৯টি অভিযোগ তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তিনি জানান, শাপলা চত্বরসহ ১২টি তদন্ত প্রতিবেদন খুব দ্রুত সম্পন্ন করে আনুষ্ঠানিক চার্জ দাখিল করা হয়েছে। এছাড়া আমির হোসেন আমু, দীপু মনিসহ গত দেড় বছর ধরে আটকে থাকা অনেক হাইপ্রোফাইল আসামির তদন্ত প্রতিবেদনও প্রস্তুত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে জুলাইয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সব মামলা তদন্ত প্রতিবেদন ও জাজমেন্টের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার লক্ষ্য রয়েছে।
গুমের প্রায় চার হাজার মামলার তালিকা পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সার্ভিং অফিসার থেকে শুরু করে গুমের ঘটনায় জড়িত অনেক সেনা সদস্যের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সেগুলোর কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগ এবং তৎকালীন ভিসিসহ যাদের ইন্ধনে নারকীয় ঘটনা ঘটেছিল, সে সংক্রান্ত প্রতিবেদনও তারা হাতে পেয়েছেন। আগামী সপ্তাহের মধ্যে এসব প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
এদিকে ১১ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে দেওয়া স্মারকলিপি গ্রহণ করে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ একটি সংগঠন হিসেবে কী ধরনের অপরাধ করেছে, সে বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আরও গতিশীল করেছেন। তিনি বলেন, এই সংগঠনের বিরুদ্ধে তদন্ত খুব দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এর দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু আওয়ামী লীগ সংগঠন হিসেবে না, আরও যদি কোনো সংগঠন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে, যাদের কারণে দীর্ঘদিন ধরে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে, তারাও এখান থেকে রেহাই পাবে কি না আমি জানি না। সেই জায়গা থেকেও আমরা কাজ করছি।












