জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলের মধ্যে দূরত্ব ঘোচার আভাস পাওয়া গেছে। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবার সমঝোতার পথে এগোচ্ছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা সরব হচ্ছে।
সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি, সাংবিধানিক সংস্কার এবং ১৮০ দিনের সময়সীমা নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান এখনো সরলরেখায় আসেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর যে বার্তা এসেছে, তাতে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিএনপি বলছে, জুলাই সনদের প্রতিটি অক্ষর বাস্তবায়ন করবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই করা হবে। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট চাইছে, গণভোটের ভিত্তিতে সনদের দ্রুত বাস্তবায়ন। ফলে বিরোধ এখন সনদ বাস্তবায়ন হবে কি না, তা নিয়ে নয়। কোন প্রক্রিয়ায় তা বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে।
বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে জোর আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক চাপও রয়েছে। সংবিধান সংশোধন নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের দেওয়া রায় বহাল রেখেছেন। হাইকোর্টের রায় বহাল থাকায় জামায়াত বা ১১ দল কিছুটা নমনীয় বলে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু জামায়াত সঠিক পথে না এসে রাজপথে আন্দোলনের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে বলে মনে করছে বিএনপি।
আর সেই অবস্থানে থেকে সংবিধান সংশোধনের জন্য গত ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। সরকারি দলের পক্ষ থেকে অনুরোধ সত্ত্বেও ওই কমিটিতে এখনো নাম দেয়নি ১১ দল।
জামায়াতের অভিযোগ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিএনপি সরকার বিষয়টি পাশ কাটানোর চেষ্টা করছে। এমনকি সনদ বাস্তবায়ন না হলে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিয়ে আসছে জোটটি।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপি বলছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে তাদের কোনো অনীহা নেই। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং সনদের প্রতিটি অক্ষর ধরে ধরে বাস্তবায়ন করবে। দলটির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও সনদ নিয়ে বিতর্কের অবসান চান বলে বক্তব্য রাখেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জুলাই সনদ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সরকার, সরকারি দল ও বিরোধী দলগুলো এ নিয়ে আলোচনা করতে পারে।
তাই প্রশ্ন সামনে এসেছে, তাহলে কি জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে কোনো সমঝোতা হচ্ছে।
বিএনপির একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও ৩১ দফার ভিত্তিতেই হবে রাষ্ট্র সংস্কার। এটা বিএনপি আগে থেকেই বলে আসছে, এখনো সেই অবস্থানে অটল আছে দলটি। জুলাই সনদ নিয়ে বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে জোর আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি সনদ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক চাপ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও রিজভীর এই বক্তব্যকে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি সমঝোতার ঘোষণা বলা না গেলেও এটি আলোচনার দরজা খোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা। কারণ জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে জুলাই সনদের আইনি ও সাংবিধানিক ভিত্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে আসছে। বিএনপিও এখন আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির কথা বলছে।
বিরোধের কেন্দ্রে ১৮০ দিন: জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হচ্ছে ১৮০ দিনের সময়সীমা। ঐকমত্য কমিশনের কাজ শেষে কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেছিলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবে এবং প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক সংস্কারগুলো সম্পন্ন করবে। ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশন শুরু হয়, সেই হিসেবে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সময় শেষ হবে। কিন্তু বিএনপির যেহেতু সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নেয়নি, তাই দলটির কাছে ১৮০ দিন গুরুত্বপূর্ণ নয়। তবে সমঝোতা হলে ১৮০ দিনের মধ্যে সম্ভব বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিএনপির ৯ আপত্তি, জামায়াতের একাধিক দাবি: জুলাই জাতীয় সনদের সমন্বিত খসড়ায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের একাধিক নোট অব ডিসেন্ট বা লিখিত আপত্তি রয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর আপত্তির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিএনপি ও তাদের মিত্রদের পক্ষ থেকে মোট ৯টি বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়েছিল। এসব আপত্তির মধ্যে সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি, সংসদের উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর), প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এবং আইনপ্রণেতাদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশ ও ভোট দেওয়ার মতো বিষয় রয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। দলটির যুক্তি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিশ্চিত করতে সনদের সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি থাকা জরুরি।
এখানেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে মূল মতপার্থক্য। বিএনপি চায় সাংবিধানিক ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে। জামায়াতের অবস্থান হলো, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত এবং পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করতে হবে।
আইনি প্রশ্নও বড় চ্যালেঞ্জ: জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি রয়েছে সাংবিধানিক ও আইনি প্রশ্ন। বিশেষ করে গণভোটের বৈধতা, গণভোটের ফল কীভাবে সংবিধানের সঙ্গে যুক্ত হবে এবং সংসদ কীভাবে সংস্কার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হবে এসব প্রশ্নের সমাধান এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাই সনদের যেসব বিষয় আইন করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব, সেগুলো সংসদীয় প্রক্রিয়ায় করা যেতে পারে। আর সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন হলে নির্ধারিত সাংবিধানিক পদ্ধতিই অনুসরণ করতে হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে জুলাই সনদ নিয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ সমঝোতা হয়নি। তবে দুই দলের বক্তব্যে এমন কিছু জায়গা তৈরি হয়েছে, যেখানে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিএনপি যেমন সনদ বাস্তবায়নে নিজেদের প্রতিশ্রুতির কথা বলছে, তেমনি জামায়াতও সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখেছে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে প্রধান বিরোধ এখন সনদ বাস্তবায়ন হবে কি না, কীভাবে, কত দ্রুত এবং কোন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন হবে– এটা নিয়েই প্রশ্ন।
এখানে বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, সনদের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার বজায় রেখে সাংবিধানিক বৈধতা নিশ্চিত করা। আর জামায়াতের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো, আন্দোলনের হুমকি না দিয়ে কীভাবে সংসদীয় ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিজেদের দাবিগুলো আদায় করা যায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা বলেন, আলোচনার বিষয়টি সামনে এসেছে, এটি সমসাময়িক রাজনীতির জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। অনেক বড় বড় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিষয়ও আলোচনার টেবিলেই সমাধান হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএনপি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বিষয়টির সমাধান চাচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো জনমতের (পপুলিজম) বিষয়টিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনাই একমাত্র সমাধানের পথ। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অর্থবহ আলোচনা হওয়া প্রয়োজন, আলোচনার বিকল্প নেই।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স খবরের কাগজকে বলেছেন, ‘জুলাই সনদ আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়ন করতে চাই। এ বিষয়ে বিএনপি সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, সংসদের বিরোধী দলগুলো সংসদে এক বক্তব্য রাখছেন, বাইরে গিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন।’
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে আমরা মাঠে আছি। সরকারের পক্ষ থেকে এখনো আলোচনার প্রস্তাব আসেনি। আমরাও চাই আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হোক।
ফলে সামনের দিনগুলোতে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে একটি সমঝোতার কাঠামো তৈরি হতে পারে– এমন সম্ভাবনা রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা দিয়েছে। তবে সেটি হবে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ঐকমত্য, নাকি নির্দিষ্ট কিছু সংস্কার ইস্যুতে সীমিত সমঝোতা, তা নির্ভর করছে আলোচনার টেবিলে দুই পক্ষ কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত তার ওপর।

